
নিউইয়র্ক শহরের বুকের ভেতর একটি ছোট্ট বাংলাদেশ যেন খোদাই করা আছে ব্রঙ্কসে। এখানে হাজারো বাঙালির জীবনপ্রবাহ ছুটে চলে দিনরাত। ব্রঙ্কসের রাস্তা দিয়ে হাঁটলে মনে হবে, বাংলাদেশের কোনো একটি মফস্বলের ব্যস্ত বাজার। ছোট-বড় দোকান, বাংলাদেশি খাবারের রেস্তোরাঁ, মসজিদ সব মিলিয়ে জমজমাট একটি এলাকা।
এখানে সকাল থেকে রাত অবধি দেখা মিলবে কর্মব্যস্ত মানুষের। কেউ রেস্তোরাঁয় কর্মচারী, কেউ ট্যাক্সি চালক, কেউবা দোকানি, কেউবা বড় ব্যবসার মালিক। অন্যান্য বাঙালি অধ্যুষিত শহরগুলোর মতো এখানেও আয়োজন করা হয় বিভিন্ন অনুষ্ঠান। বলা চলে একের পর এক অনুষ্ঠান লেগেই থাকে। বাঙালিরা যে দেশে, যে শহরেই থাকুক না কেনো সকলেরই একটি লক্ষ্য স্থীর তাহলো প্রবাসে দেশীয় সংস্কৃতির চর্চা। আর নিউ ইয়র্কে বাংলা সংস্কৃতির এক পৃষ্ঠপোষকের নাম জাকির খান।
জাকির খান সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ থেকে এসে নিউইয়র্কে থিতু হয়েছিলেন নব্বইয়ের দশকের শুরুতে। ব্রঙ্কসের পার্কচেস্টারে তিনি একজন সুপরিচিত মুখ ছিলেন। তাঁর সহজ সরল স্বভাব, মানুষের বিপদে এগিয়ে যাওয়ার প্রবণতা এবং সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়ার অভ্যাস তাঁকে খুব দ্রুত কমিউনিটিতে জনপ্রিয় করে তুলেছিল। পেশায় রিয়েল এস্টেট ব্রোকার হলেও জাকিরের পরিচয় ছিল একজন সমাজসেবক হিসেবে। তিনি ব্যবসা পরিচালনার পাশাপাশি কমিউনিটির নানা সামাজিক কার্যক্রমে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতেন। দরিদ্র ও অসহায় পরিবারের পাশে দাঁড়ানো, বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন করা ও আর্থিক সহযোগিতা করা ছিল তাঁর নিয়মিত কাজ। তিনি বিবাহিত এবং তিন সন্তানের জনক ছিলেন। তার স্ত্রী ন্যান্সি খান ও তাদের তিন সন্তান রামিন, তাইবা ও একলেলকে নিয়ে তার সুখের সংসার।

ব্যবসায়িক মানুষের জীবন জোয়ার ভাটার মতো। আকস্মিক কোনো এক অজ্ঞাত কারণে জাকির খানের ব্যবসায়ও সাময়িক ভাটা পড়ে যে কারণে তিনি ভাড়া দিতে পারছিলেন না। বাড়িওয়ালা মিশরীয় বংশোদ্ভূত তাহা মাহরান দীর্ঘ নয় মাস ভাড়া না পেয়ে ক্রমশই ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেছিলেন।
২০১৭ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যার আকাশ যেন একটু বেশিই নীল ছিল। পশ্চিমের দিগন্তে লাল-কমলা রঙের আভা, যেন কেউ রঙের ক্যানভাসে শেষ আঁচড়গুলো টানছে। শীতের শেষের দিক, বাতাসে ছিল এক ধরনের শীতল মিষ্টতা। লোগান অ্যাভিনিউর বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন জাকির খান এবং তার এগারো বছর বয়সী ছেলে। দু’জনের মুখে ছিল হাসি, যেন একটি সুন্দর সন্ধ্যা কাটানোর প্রত্যাশায় গল্প করছিলেন বাবা-ছেলে।
হঠাৎ করেই শান্ত বাতাসে নেমে এল ভয়ানক এক ঝড়। বাড়ির মালিক তাহা মাহরান দ্রুত পায়ে হেঁটে এলেন, চোখে ছিল তীব্র ক্ষোভ। পরিস্থিতি বুঝে ওঠার আগেই তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে জাকিরের দিকে এগিয়ে গেলেন। মুহূর্তের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল জাকিরের চোখে, তিনি চেষ্টা করলেন নিজেকে রক্ষা করতে, কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। উপর্যপুরি ২৯ বার তার দেহে ছুরিকাঘাত করলো তাহা মাহরান। মুহূর্তেই রক্তে রঞ্জিত হয়ে গেল জাকির খানের শরীর। মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন তিনি।
প্রত্যক্ষদর্শীদের তথ্যমতে, জাকির মৃত্যুর আগে তার ছেলেকে চিৎকার করে বলছিলেন, ‘একলেল, ৯১১-এ ফোন করো!’ মাহরান তাঁর জ্যাকেট ধরে তাঁকে মাটিতে ফেলে দিয়ে মাথা, ঘাড় এবং শরীরে একের পর এক ছুরিকাঘাত করতে থাকেন। মাহরান একলেলের দিকে এগিয়ে গেলে, ছেলেটি আতঙ্কিত হয়ে মাকে ডাকতে ডাকতে বাড়ির ভেতরে দৌড়ে ঢুকে যায়।

ঘটনার অদুরে উপস্থিত মানুষজন হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। জাকিরের স্ত্রী ও পরিবারের সদস্যদের কান্নায় ভারি হয়ে ওঠে বাতাস। এম্বুলেন্স এসে তাকে দ্রুত স্থানীয় জ্যাকোবি মেডিকেল সেন্টারে নিয়ে যায়। চিকিৎসকরা দৌঁড়ে এলেন কিন্তু এরিমধ্যে জাকির খান (৪৪) শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। এই নৃশংস ঘটনার পর মাহরান নিজেই থানায় গিয়ে অপরাধ স্বীকার করেন। তার বিরুদ্ধে হত্যা ও বেআইনি অস্ত্র রাখার অভিযোগ আনা হয়।
খবরটি মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে পুরো ব্রঙ্কসে। শোকের ছায়া নেমে আসে বাংলাদেশি কমিউনিটিতে। যাঁরা জাকিরের ঘনিষ্ঠ ছিলেন, তাঁরা প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না। তাঁর মৃত্যু যেন সবার হৃদয়েই তৈরি করল এক গভীর শূন্যতা। বন্ধু, প্রতিবেশী, কমিউনিটির নেতারা এসে জড়ো হলেন হাসপাতালে কেউ কেউ জাকিরের বাড়িতে। সবার চোখেই জল, সবার হৃদয়েই একটাই প্রশ্ন— কেন এত নিষ্ঠুরভাবে চলে গেলেন জাকির?
যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী বাংলাদেশি নাগরিক ও নিউইয়র্ক শহরের ব্রঙ্কস সি কলেজের গণিতের শিক্ষক রাশিদুল বারী। জাকির খান ছিলেন তার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। জাকিরের মৃত্যুতে তিনি তার প্রতিক্রিয়া তুলে ধরেছেন বিখ্যাত পত্রিকা ‘হাফিংটন পোস্ট’ (https://www.huffpost.com/ -এ Tears For Zakir Khan (জাকির খানের জন্য কান্না) শিরোনামে তার লেখা একটি কলামে। (লেখাটি প্রকাশিত হয় ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৭)

‘
”২০১৭ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি। আমি নিউইয়র্ক শহরের ব্রঙ্কস কমিউনিটি কলেজে গণিত পড়াচ্ছিলাম। ক্লাসের মাঝপথে ফোনে আমার স্ত্রীর বার্তা পেলাম: “জাকির খানকে তাঁর বাড়িওয়ালা ছুরিকাঘাতে হত্যা করেছে।” ফোন বন্ধ করে চেষ্টা করলাম পলিনোমিয়াল গ্রাফ শেখাতে, কিন্তু বোর্ডে কিছুই লিখতে পারছিলাম না। একজন শিক্ষার্থী জিজ্ঞেস করল, “প্রফেসর, আপনি ঠিক আছেন?” আমি বললাম, “হ্যাঁ, সব ঠিক আছে।” কিন্তু আসলে কিছুই ঠিক ছিল না। আমি ক্লাসটি আগেভাগে শেষ করলাম, বললাম, “একটি পারিবারিক জরুরি পরিস্থিতি হয়েছে। বৃহস্পতিবার দেখা হবে।”
যখন সবাই চলে যায়, নিজেকে প্রশ্ন করি, ‘কেন পারিবারিক পরিস্থিতির কথা বললাম?’ জাকির খান তো আমার পরিবারের সদস্য নন। এমনকি তিনি আমার বন্ধুও নন। আসলে তার সঙ্গে আমার কখনো দেখাও হয়নি। তিনি আমার ফেসবুক বন্ধু ছিলেন মাত্র। আমার ৫ হাজার ফেসবুক বন্ধু আছে এবং আমি এদের অনেককেই চিনি না। সুতরাং খানের জন্য কেন আমার চোখের জল ফেলা উচিত?
গল্পটা শুরু হয় ফেব্রুয়ারি ২০০৯ সালে। তখন আমি কোনো প্রফেসর ছিলাম না—ছিলাম একজন সিকিউরিটি গার্ড। আমার স্ত্রী ও ছেলে আলবার্টকে নিয়ে থাকার জন্য জরুরিভিত্তিতে একটি রুম খুঁজছিলাম। তখন ছোট ছেলে আইজ্যাকের জন্ম হয়নি। রাতে নিরাপত্তার কাজ করতাম আর দিনে পড়াশোনা করতাম। ছোট একটি ঘর ভাড়া নেওয়ার জন্য অনেক চেষ্টা করলাম, কিন্তু সিকিউরিটি গার্ডের চাকুরির কথা শুনে কেউ ঘর দিতে রাজি হচ্ছিল না।

যাহোক প্রত্যেক বাড়িওয়ালা আমার আয় সম্পর্কে জানার পর আমাকে ফিরিয়ে দিতো। এছাড়া আমার টিউশন ফিও পরিশোধ করতে হতো। এজন্য আমার স্ত্রী ও ছেলেকে কিছুদিনের জন্য আত্মীয়-স্বজনদের বাসায় রেখেছিলাম। আমি অনেক মানুষের কাছে গিয়েছিলাম কিন্তু একজন দরিদ্র সিকিউরিটি গার্ডের জন্য কারো সময় ছিল না।
ঠিক তখনই মূলধারার এক পত্রিকায় পড়ি—“পার্কচেস্টার রিয়েল এস্টেট কিং জাকির খান আমেরিকান স্বপ্নকে সত্যি করে তুলেছেন। তাঁর একটি জমজমাট ব্যবসা, বাড়ি ও পরিবার রয়েছে।” আমি তৎক্ষণাৎ তাকে ফেসবুকে ফ্রেন্ড রিকুয়েস্ট পাঠাই। অবাক হয়ে দেখি, তিনি আমাকে গ্রহণ করেন।
আমি এক সপ্তাহ পরে তার কাছে ফেসবুকে আমাকে সহায়তার অনুরোধ জানাই। এটা ছিল ২০০৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাস। আশ্চর্যান্বিত হলাম, তিনি আমাকে জিজ্ঞাসা করেছেন আমি কতটুকু বহন করতে পারবো। আমি তাকে জানাই যে, আমি মাসে মাত্র ৪০০ ডলার পরিশোধ করতে পারবো। পরদিন সকালে তিনজন বাড়িওয়ালার কাছ থেকে তিনটি ফোন কল পাই; যাদের প্রত্যেকেই আমাকে একটি কক্ষ ভাড়া দিতে চান।
আমি একটি ঘর পছন্দ করি পার্কচেস্টার জামে মসজিদের পাশে গ্লিসন অ্যাভিনিউতে। তিন সপ্তাহ পর আমি আমার পরিবার নিয়ে এক ছাদের নিচে থাকার সুযোগ হয়। তখন থেকে, খানের সঙ্গে আমাদের পারিবারিক বন্ধন অনুভব করতে থাকি। আমরা ২০১০ সালে সে ঘর ছেড়ে আসি, কিন্তু সে ঘর ছিল আমাদের ভালোবাসার বাক্স।
পাঁচ বছর আগে তিনি আমাকে ফেসবুকে শেষবার মেসেজ করেছিলেন, একটি বাংলা বাক্য ইংরেজিতে অনুবাদ করতে বলেছিলেন। সেই বাক্যটি ছিল: “যে উৎসব আমরা উপভোগ করতে পারি, তা তাৎক্ষণিকভাবে আমাদের নিজেদের হয়ে যায়—ঈদ, বড়দিন, ইস্টার, সরস্বতী পূজা, তোরাহ—সবই আমার। আমি একজন মুসলিম হিসেবে গর্বিত যখন আমি অন্য ধর্মের উৎসবগুলোকে নিজের মতো করে গ্রহণ করতে পারি।” তাঁর এই বাক্য নজরুল ও রবীন্দ্রনাথের আদর্শের প্রতিধ্বনি।

আমি বিশ্বাস করতে পারি না যে, এ ধরনের একজন মানুষ ভাড়া না দেয়ার জন্য খুন হবেন। তিনি ছিলেন পার্কচেস্টারের রাজা। কখন তার রাজত্ব হারালেন? এটা কীভাবে ঘটলো? কম্পিউটার চালু করে গুগলে তার নাম লিখে সার্চ করলাম। টাইম টিভির একটি প্রতিবেদনে দৃষ্টি পড়লো। বাড়িওয়ালা ৫১ বছর বয়সী তাহা মাহরান ৪৪ বছরের জাকির খানকে ভাড়া বাকি থাকার কারণে ২০ বার ছুরিকাঘাত করেছেন। আমি দেখলাম একলেল হামলার প্রত্যক্ষদর্শী, সহায়হীন ভীতসন্ত্রস্ত্র ১২ বছর বয়সী একলেল কয়েক ফুট দূরে দাঁড়িয়ে ছিলো। এটি ছিল হৃদয়বিদারক।
আমি যখন দরিদ্র ছিলাম তখন জাকির খানের কাছে গিয়েছিলাম। কিন্তু তিনি যখন দরিদ্র হয়ে পড়েন তখন আমার কাছে আসেননি। তিনি একজন ভালো মানুষ ছিলেন। দারিদ্রতা ও পরোপকারীতা পরস্পর ভিন্ন। ভাড়া বাকি রেখে জাকির খান একটি ভুল করেছিলেন কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে, সবচেয়ে পাশবিক উপায়ে সন্তানের সামনে একজন বাবাকে খুন করবেন মাহরান। মাহরানের আচরণ আমাকে জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেটের আচরণ স্মরণ করিয়ে দেয়।

আমি ৮টা ৩০ মিনিটে কলেজ থেকে বাসার পথে রওনা হই, মনে মনে ভাবছিলাম—এই কষ্টদায়ক মৃত্যু ভুলে যাব। কিন্তু বাসায় যখন ফিরলাম, দরজা খুলে আলবার্ট আমাকে দেখে হাসে, ইসহাক আমার কোলে লাফিয়ে ওঠে—সেই মুহূর্তে মনে পড়ে যায় একলেল, রামিন আর তাইবার কথা। এখন কে তাদের লাইব্রেরিতে নিয়ে যাবে? আমি রাতের খাবার না খেয়ে জীবনে প্রথমবারের মতো ঘুমের ওষুধ খেয়ে শুয়ে পড়ি। কিন্তু সকালে আবারও একই পরিস্থিতির তৈরি হয় যখন আমার দুই বাচ্চাকে লাইব্রেরিতে রেখে আসি।

মারহানের হাতে খুন হওয়ার ঘণ্টা খানেক আগে জাকির খান তার বাচ্চাদের ওই লাইব্রেরি থেকে নিয়ে এসেছিলেন। এক মুহূর্তের জন্য, আমি জাকিরের জায়গায় নিজেকে কল্পনা করি। ভাবি- রামিন, তাইবা ও এককেলকে এখন কে লাইব্রেরিতে নিয়ে যাবে?”

দীর্ঘ বিচার প্রক্রিয়ার পর ২০১৯ সালে আদালত মাহরানকে ১০ বছরের কারাদণ্ড ও পাঁচ বছরের নজরদারির নির্দেশ দেন।
নিউ ইয়র্কের বাংলাদেশি কমিউনিটি আজও এই ঘটনাকে ভুলতে পারেনি। জাকির খানকে তারা মনে রেখেছে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায়। তাঁর ভালোবাসা ও অবদানের কথা আজও এ মহানগরীর বাতাসে কান পাতলেই শোনা যায়।









