
রাজশাহী, ১৮ ডিসেম্বর- ভারতের সীমান্ত ঘেঁষা রাজশাহীর দুর্গম চরাঞ্চল খানপুর, খিদিরপুর, ছিলামপুর ও তারানগর। এক সময় খিদিরপুরে ছিল তিন তলাবিশিষ্ট স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। ছিল দোতলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বেসরকারি হাইস্কুল এবং মাদরাসা। পদ্মা নদীর ভাঙনে খিদিরপুর, ছিলামপুর এবং তারা নগরের অস্তিত্বই এখন বিলীন হওয়ার পথে। টিকে রয়েছে শুধু খানপুর।
স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, হাইস্কুল, মাদরাসা সবই চলে গেছে পদ্মার পেটে। উন্মত্ত পদ্মা গিলে খেয়েছে বাংলাদেশ-ভারত সীমানা পিলারও। প্রধান ও সাব-পিলার মিলে খানপুর এবং খিদিরপুর ঘিরে থাকা ১১টি পিলারের মধ্যে ছয়টিই চলে গেছে পদ্মার পেটে। পদ্মার কবলে এ অঞ্চলের প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষই বসতিহীন হয়েছেন।
চর খানপুর ও খিদিরপুরের স্থানীয় বাসিন্দা এবং বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বাংলাদেশ ও ভারতের সীমানা আলাদা করতে অঞ্চলটিতে ১৬০, ১৬১, ১৬২, ১৬৩ ও ১৬৪ নম্বর প্রধান পিলার রয়েছে। এর মধ্যে বর্তমানে ১৬২ ও ১৬৩ নম্বর পিলারের অস্তিত্ব থাকলেও ১৬০, ১৬১ ও ১৬৪ নম্বর প্রধান সীমানা পিলার ভেসে গেছে পদ্মায়।
এই তিন প্রধান সীমানা পিলারের পাশাপাশি পদ্মার পেটে চলে গেছে ১৬৪ নম্বর প্রধান পিলারের ১, ২ ও ৩ নম্বর সাব পিলার। অস্তিত্ব টিকে আছে ১৬২ ও ১৬৩ নম্বর প্রধান পিলারের। এর সঙ্গে ১৬২ নম্বর প্রধান পিলারের ১, ২ ও ৩ নম্বর সাব পিলার টিকে আছে। অবশ্য এই সীমানা পিলার আর কতদিন টিকে থাকবে তা নিয়েও সন্দেহ রয়েছে।
এ বিষয়ে বিজিবির রাজশাহী সেক্টর কমান্ডার কর্নেল তুহিন মোহাম্মদ মাসুদ বলেন, ‘নদীভাঙনের কারণে সীমানা পিলার বিলীন হতে পারে। সীমানা পিলার বিলীন হয়ে গেলে বর্ডারে দায়িত্ব পালন করা বিজিবির সদস্যরা সেটা চিহ্নিত করেন। বিএসএফের সঙ্গে পারস্পরিক সমঝোতার মাধ্যমে এটা করা হয়, এ নিয়ে কোনো সমস্যা হয় না। ভবিষ্যতে আবার যখন এখানে পিলার তোলার অবস্থা হবে, তখন পিলার তোলা হবে। বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে অবগত আছেন।’
উন্মত্ত পদ্মায় চর খানপুর ও খিদিরপুরের একের পর এক অংশ বিলীন হওয়ায় ভিটে ছাড়া হয়েছেন অঞ্চলটির সিংহভাগ বাসিন্দা। এক সময় এই চরে ২০ হাজারের মতো বাসিন্দা ছিল। সেই সংখ্যা কমতে কমতে এখন দুই হাজারের নিচে চলে এসেছে।
১৯৪৭ সাল থেকে চরটিতে বসবাস করা রজত আলী বলেন, চর খানপুর, খিদিরপুর, ছিলামপুর ও তারানগর মিলে এক সময় এখানে ২০ হাজারের মতো মানুষ বাস করতো। কিন্তু পদ্মার ভাঙনে চর খানপুর ছাড়া বাকিগুলোর অস্তিত্ব প্রায় বিলীন হয়ে গেছে। এখন ১ হাজার ৮০০’র মতো মানুষ বসবাস করে এই অঞ্চলে। বছর বছর যেভাবে ভাঙছে, তাতে ভবিষ্যতে চর খানপুর থাকবে কিনা তা নিয়েও সংশয় রয়েছে।
তিনি বলেন, আমাদের এখানে কোনো সরকারি চিকিৎসক নেই। কোন ভালো স্কুল নেই। শিক্ষা ও চিকিৎসার জন্য আমাদের রাজশাহী শহরের ওপর নির্ভর করতে হয়। কিন্তু রাজশাহী যাওয়াও সহজ না। দীর্ঘ নদীপথ পাড়ি দিয়ে যেতে হয়। গুরুতর অসুস্থ কাউকে এই নদীপথ পাড়ি দিয়ে রাজশাহী নিয়ে গিয়ে বাঁচানো কঠিন হয়ে পড়ে।
চরের মানুষের আয়-রোজগারের পথ কি? জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা এখানে কৃষিকাজ করি। ধান হয়, শাক-সবজি হয়। এর সঙ্গে গরু, মহিষ, ভেড়া পালন করি। আমার ২০টার মতো মহিষ আছে। অভাব হলে শহরে নিয়ে গিয়ে বিক্রি করি।
চর খানপুরের বয়োজ্যেষ্ঠ আরেক বাসিন্দা ছাত্তার। ৯০ বছরের এই বৃদ্ধ বলেন, স্বাধীনতার আগে এখানে পাকিস্তানের খানেরা থাকতেন। তাই এই জায়গার নাম খানপুর। আমাদের আশপাশে খিদিরপুর, ছিলামপুর ও তারা নগর রয়েছে। বছর পাঁচেক আগেও এখানে ২০ হাজারের বেশি মানুষ বসবাস করতো। এখন আছে দুই হাজারেও কম। নদীভাঙনের কারণে বাকিরা এলাকা ছেড়ে চলে গেছে।
পদ্মার তীর ঘেঁষে থাকা একটা স্কুল দেখিয়ে তিনি বলেন, এই স্কুলটা এক সময় নদী থেকে অনেক দূরে ছিল। আমাদের সন্তানরা এই স্কুলে পড়ে। নদী ভাঙতে ভাঙতে প্রায় স্কুলের কাছে চলে এসেছে। আগামী বছর হয়তো এই স্কুলও নদীর মধ্যে চলে যাবে।
আরও পড়ুন : ভারত-মিয়ানমার-থাইল্যান্ড ত্রিদেশীয় মহাসড়কে যুক্ত হতে আগ্রহী বাংলাদেশ
মরিয়ম নামে চরের আরেক বাসিন্দা বলেন, আমরা আগে খিদিরপুরে ছিলাম। ভাঙনের কারণে এখন খানপুরে বসবাস শুরু করেছি। কতদিন এখানে থাকতে পারব জানি না। নদী যদি ভাঙতে ভাঙতে এখানে চলে আসে, আমাদের আর যাওয়ার জায়গা থাকবে না। কারণ এর পরই ভারতের সীমানা।
চরের নিরাপত্তার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমাদের এখানে তেমন কোনো ঝামেলা হয় না। এখন যারা আছি, সবাই মিলেমিশে থাকি। তারপরও কোন বিষয়ে সমস্যা হলে বিজিবি ক্যাম্পে যায়। ওনারাই মিটমাট করে দেন। এখানে কখনো পুলিশ আসে না।
সূত্রঃ জাগো নিউজ
আডি/ ১৮ ডিসেম্বর









