উত্তর আমেরিকা

ট্রাম্পের ২৫০ ফুট উঁচু মেগা তোরণ নির্মাণ ১৫ দিনের জন্য স্থগিত করল আদালত

ট্রাম্পের ২৫০ ফুট উঁচু মেগা তোরণ

ওয়াশিংটন, ০৬ নভেম্বর-যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটনের চেহারা নিজের পছন্দমতো সাজাতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ২৫০ ফুট উঁচু বিশাল তোরণ নির্মাণের পরিকল্পনায় বড় ধরনের আইনি বাধা এসেছে। টানা আট ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে জনশুনানি এবং নাগরিকদের তীব্র আপত্তির পর গত বৃহস্পতিবার রাতে প্রকল্পটি চূড়ান্ত অনুমোদন পায়। কিন্তু অনুমোদনের মাত্র এক ঘণ্টার মধ্যেই মার্কিন জেলা আদালতের বিচারক তানিয়া চুটকান ১৫ দিনের জন্য তোরণটির সব ধরনের নির্মাণকাজ স্থগিত রাখার নির্দেশ দেন।

ওবামা প্রশাসনের সময় নিয়োগ পাওয়া এই বিচারক নির্দেশ দিয়েছেন, ট্রাম্প প্রশাসন বা মামলার আসামিপক্ষ প্রস্তাবিত নির্মাণস্থল ও এর আশপাশে কোনো ধরনের নির্মাণ-সংক্রান্ত কাজ শুরু বা চালু করতে পারবে না। পরে দেওয়া এক স্মারকে বিচারক চুটকান অর্থনৈতিক ক্ষতি এবং ভয়াবহ যানজটের আশঙ্কার কথা উল্লেখ করে এই আদেশের ব্যাখ্যা দেন।

বৃহস্পতিবার রাতে ওয়াশিংটনের স্থাপত্য ও নকশা পরিবর্তনের তদারককারী দুটি প্রধান ফেডারেল সংস্থার একটি ‘ন্যাশনাল ক্যাপিটাল প্ল্যানিং কমিশন’ (এনসিপিসি) ভার্চুয়াল বৈঠকে ৮-৪ ভোটে বিতর্কিত তোরণ নির্মাণের চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়। বৈঠকের আগে ১২০ জনের বেশি নাগরিক কমিশনের কাছে প্রকল্পটি স্থগিত রাখার আবেদন জানান। তাঁদের বড় একটি অংশ ছিলেন সাবেক সেনাসদস্য। আগামী জানুয়ারিতে ডেমোক্র্যাট-নিয়ন্ত্রিত কংগ্রেস দায়িত্ব নেওয়ার আগেই কাজ এগিয়ে নিতে চেয়েছিলেন ট্রাম্পের সমর্থক ও তাঁর মনোনীত সদস্যদের নিয়ে গঠিত কমিশনের সদস্যরা। তাই দ্রুত প্রকল্পটির চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়। ট্রাম্পের লক্ষ্য, বর্তমান মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই আগামী দুই বছরের মধ্যে বিশ্বের সবচেয়ে বড় তোরণ হিসেবে পরিকল্পিত এই স্থাপনার নির্মাণকাজ শেষ করা।

তবে শুরু থেকেই এই সময়সীমা আইনি চ্যালেঞ্জ ও বিতর্কের মুখে রয়েছে। যুদ্ধাহত সাবেক সেনাসদস্য এবং ঐতিহাসিক স্থাপনা সংরক্ষণে কাজ করা ব্যক্তিরা সিদ্ধান্তটির বিরুদ্ধে একটি আলোচিত মামলা করেছেন। তাঁদের দাবি, তোরণটির বিশাল আকার ও অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোর দৃশ্যপট নষ্ট করবে। বিশেষ করে লিঙ্কন মেমোরিয়াল, আর্লিংটন হাউস ও রবার্ট ই লি মেমোরিয়ালের মধ্যকার দৃষ্টিসীমা বাধাগ্রস্ত হবে। একই সঙ্গে আর্লিংটন জাতীয় সমাধিক্ষেত্রের শেষকৃত্যের গম্ভীর পরিবেশও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

বিরোধীদের প্রধান আইনি যুক্তি হলো, প্রকল্পটি বেআইনি। কারণ, এর জন্য কংগ্রেসের অনুমোদন নেওয়া হয়নি। ওয়াশিংটনে নতুন কোনো স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করতে হলে ‘কমেমোরেটিভ ওয়ার্কস অ্যাক্ট’ অনুযায়ী কংগ্রেসের অনুমতি নেওয়া বাধ্যতামূলক।

বৃহস্পতিবার দিনভর প্রস্তাবিত নির্মাণস্থলের আশপাশে বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ অনুষ্ঠিত হয়। আর্লিংটন জাতীয় সমাধিক্ষেত্র যে এলাকার অন্তর্ভুক্ত, সেই এলাকার ডেমোক্র্যাটিক প্রতিনিধি ডন বায়ার বিক্ষোভে অংশ নিয়ে বলেন, একজন ব্যক্তির অহংবোধ থেকে তৈরি এই বিশাল বিকৃতি সেখানে শায়িত প্রতিটি বীর সেনাসদস্যের প্রতি চরম অবমাননা। তবে বৈঠকের আগেই কমিশনের চেয়ারম্যান তোরণটিকে ট্রাম্পের একটি ‘ঐতিহাসিক প্রচেষ্টা’ হিসেবে উল্লেখ করে এর পক্ষে ভোট দেওয়ার কথা জানিয়েছিলেন।

হোয়াইট হাউসে ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে লিঙ্কন মেমোরিয়ালের রিফ্লেক্টিং পুল থেকে শুরু করে কেনেডি সেন্টার সংস্কার পর্যন্ত বেশ কয়েকটি বড় প্রকল্পের কাজ চলছে। সমালোচকদের মতে, এসব প্রকল্প প্রেসিডেন্টের নিজের অহংকার মেটানোর উদ্যোগ। গত অক্টোবরে ওভাল অফিসে প্রথমবারের মতো তোরণটির বিভিন্ন মাপের মডেল প্রদর্শন করেন ট্রাম্প। তখন এক সাংবাদিক তোরণটি কার উদ্দেশ্যে তৈরি করা হচ্ছে জানতে চাইলে নিজের দিকে আঙুল দেখিয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘আমার জন্য।’ তবে পরে তিনি দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০তম বার্ষিকী, আমেরিকানদের চেতনা, সামরিক শক্তি ও দক্ষতার স্মারক হিসেবে এটি নির্মাণ করা হচ্ছে।

সম্প্রতি ট্রাম্প নতুন একটি যুক্তি দিয়ে বলেন, পটোম্যাক নদীর কাছের ব্যস্ত ট্রাফিক সার্কেলে নির্মিত এই তোরণটি পর্যটনকেন্দ্রের পাশাপাশি ড্রোন ও গোলাবারুদ রাখার সামরিক স্থাপনা হিসেবেও ব্যবহার করা হবে। তবে বৃহস্পতিবার এনসিপিসির কাছে জমা দেওয়া চূড়ান্ত নথিতে কোনো সামরিক উপাদানের উল্লেখ ছিল না। যদিও প্রশাসনের কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, পরে বড় ধরনের কোনো পরিবর্তন ছাড়াই এসব উপাদান যুক্ত করা সম্ভব।

দ্রুত নির্মাণকাজ শেষ করতে প্রশাসনের পরিকল্পনা ছিল, দিনে ১০ ঘণ্টার দুটি শিফটে ২৪ ঘণ্টাই কাজ চালানো হবে। কিন্তু বৃহস্পতিবার জাতীয় পার্ক সেবা (এনপিএস) আদালতে স্বীকার করেছে, তাদের নিয়োগ করা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান অনুমতি ছাড়াই নির্মাণস্থলের চারপাশে দাগ কেটে প্রাথমিক কাজ শুরু করেছিল। তবে ভবিষ্যতে আর এ ধরনের কাজ করা হবে না বলে আদালতকে নিশ্চিত করেছে সংস্থাটি।

শুনানিতে মামলার প্রধান বাদী মাইকেল লেমন বলেন, পুরো পর্যালোচনা প্রক্রিয়াটি তাড়াহুড়ো করে একটি আগে থেকে ঠিক করা সিদ্ধান্তের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এতে ইচ্ছাকৃতভাবে কংগ্রেসকে বাদ দেওয়া হয়েছে এবং আর্লিংটনের ওপর প্রকল্পটির নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়নও উপেক্ষা করা হয়েছে।

এদিকে আগামী দিনে জাতীয় পার্ক সেবা তদারকির দায়িত্বে থাকা হাউস ন্যাচারাল রিসোর্সেস কমিটির সম্ভাব্য চেয়ারম্যান ডেমোক্র্যাট প্রতিনিধি জ্যারেড হাফম্যান বলেছেন, এই প্রকল্প আমেরিকার আদর্শ ও আইনের প্রতি অবমাননা। তাঁর মতে, ২৫০তম বার্ষিকীতে জনগণের রায়কে সম্মান না করে নিজেকে রাজা মনে করা কোনো প্রেসিডেন্টের ইচ্ছা পূরণ করা উচিত নয়।

গত আগস্টে ন্যাশনাল পার্ক সার্ভিসের (এনপিএস) প্রকাশিত এক পর্যালোচনায় প্রশাসন নিজেই স্বীকার করেছিল, প্রস্তাবিত তোরণটি প্রায় ৪২টি ঐতিহাসিক স্থানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। এর মধ্যে আর্লিংটন ন্যাশনাল সেমেট্রি ও লিঙ্কন মেমোরিয়ালসহ ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ স্থানের ওপর সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়বে। ক্যাপিটল হিল, জর্জটাউন ওয়াটারফ্রন্ট ও পেন্টাগন থেকেও তোরণটি দেখা যাবে। ফলে ওয়াশিংটনের ঐতিহাসিক দৃশ্যপটের ধারাবাহিকতা নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এনপিএস বিকল্প স্থান বিবেচনা করলেও শেষ পর্যন্ত পটোম্যাক নদীর তীরকেই একমাত্র উপযুক্ত জায়গা হিসেবে চিহ্নিত করে।

যুক্তরাষ্ট্রের ‘জাতীয় ঐতিহাসিক সংরক্ষণ আইন’-এর ১০৬ ধারা অনুযায়ী, এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে সংশ্লিষ্ট স্বাধীন ঐতিহাসিক সংরক্ষণ গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছানো প্রয়োজন। কিন্তু গত মাসে ট্রাম্প প্রশাসন ১০৬ ধারার অধীনে পরামর্শের প্রক্রিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ করে কোনো চুক্তি ছাড়াই প্রকল্প বাস্তবায়নের পথ বেছে নেয়। এনসিপিসি চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়ার আধা ঘণ্টার মধ্যেই স্বরাষ্ট্র বিভাগ প্রকল্পটি এগিয়ে নেওয়ার ঘোষণা দেয়। তবে আদালতের তাৎক্ষণিক স্থগিতাদেশে ট্রাম্পের তোরণ নির্মাণের দ্রুতগতির পরিকল্পনা আপাতত থেমে গেল।

সম্প্রতি অনুষ্ঠিত মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসের উভয় কক্ষ ডেমোক্র্যাটদের কাছে হারানোর পর এবার আদালতেও আইনি বাধার মুখে পড়লেন ট্রাম্প।

এস এম/ ০৬ নভেম্বর ২০২৬

Back to top button
🌐 Read in Your Language