সৌদি-পাকিস্তানের সঙ্গে মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি অনুমোদন করল তুরস্কের পার্লামেন্ট

আঙ্কারা,০৬ নভেম্বর-সৌদি আরব ও পাকিস্তানের সঙ্গে তুরস্কের স্বাক্ষরিত মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি অনুমোদন করেছে দেশটির পার্লামেন্ট। এই চুক্তিতে যৌথ প্রতিরক্ষার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এর আওতায় কোনো সদস্যদেশ আক্রান্ত হলে দেশটিকে সহায়তা দিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকবে ন্যাটোর দ্বিতীয় বৃহত্তম সামরিক শক্তি তুরস্ক।
শুক্রবার (৬ নভেম্বর) আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) তুরস্কের পার্লামেন্টে চুক্তিটি অনুমোদন পায়। ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতিদের হামলার মধ্যেই চুক্তিটি অনুমোদন করা হলো। এর আগে গত আগস্টে মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে প্রথম স্বাক্ষর করে তুরস্ক।
এরপর গত মাসে অনুমোদনের জন্য চুক্তিটি পার্লামেন্টে পাঠানো হয়। গত বুধবার চুক্তি অনুমোদনের প্রস্তাবের প্রথম অনুচ্ছেদ গ্রহণ করে তুরস্কের পার্লামেন্ট। তবে এরপর ডেপুটি স্পিকার জেলাল আদান অধিবেশন মুলতবি করে বৃহস্পতিবার বিকেল পর্যন্ত স্থগিত করেন।
বৃহস্পতিবার অধিবেশন আবার শুরু হলে চুক্তির বাকি অনুচ্ছেদগুলো নিয়ে আলোচনা করেন তুরস্কের আইনপ্রণেতারা। শেষ পর্যন্ত ২৭৯ ভোটে চুক্তিটি অনুমোদিত হয়। বিপক্ষে ভোট দেন ১১৯ জন। পার্লামেন্টের ৫৯২ সদস্যের মধ্যে ভোটে অংশ নেন ৩৯৮ জন।
তুরস্কের পার্লামেন্টে জমা দেওয়া চুক্তির নথি অনুযায়ী, এতে মোট ১৬টি অনুচ্ছেদ রয়েছে। চুক্তির প্রথম অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, সদস্যদেশগুলোর কোনো একটির ভৌগোলিক অখণ্ডতার জন্য হুমকি তৈরি হয়, এমন পরিস্থিতি মোকাবিলায় দেশগুলো ‘সব ধরনের প্রয়োজনীয় উপায়’ ব্যবহার করবে। কোনো সদস্যদেশ আক্রান্ত হলে এই অনুচ্ছেদ কার্যকর করা যাবে।
প্রথম অনুচ্ছেদ কার্যকর হওয়ার পর কী পদক্ষেপ নেওয়া হবে, তা-ও চুক্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে। দ্বিতীয় অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘অন্য কোনো দেশ বা দেশগুলোর জোটের সশস্ত্র হামলা কিংবা সামরিক আগ্রাসনের শিকার হলে চুক্তির অন্য পক্ষগুলো তাদের হাতে থাকা পারস্পরিক সহায়তার সব উপায় কাজে লাগিয়ে আক্রান্ত দেশকে অবিলম্বে সহায়তা দেবে।’
চুক্তির এই গুরুত্বপূর্ণ ধারা নর্থ আটলান্টিক ট্রিটি বা উত্তর আটলান্টিক চুক্তির ৫ নম্বর অনুচ্ছেদের (আর্টিকেল ফাইভ) সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এই চুক্তির মাধ্যমেই ন্যাটো সামরিক জোট প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। ন্যাটোর ৫ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, জোটের কোনো একটি সদস্যের ওপর হামলাকে সব সদস্যের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
এদিকে, তুরস্ক একই সঙ্গে ন্যাটো ও মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির সদস্য হওয়ায় দেশটির সামরিক সম্পদ ব্যবহারের ক্ষেত্রে স্বার্থের সংঘাত তৈরি হতে পারে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সমালোচকেরা। তবে তুরস্কের কর্মকর্তারা এ ধরনের আশঙ্কাকে ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছেন।
মক্কা চুক্তির অন্য অনুচ্ছেদগুলোতে প্রতিরক্ষা শিল্পে পারস্পরিক সহযোগিতা এবং সামরিক সমন্বয় বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। এর উদ্দেশ্য হলো সম্ভাব্য হুমকি মোকাবিলায় প্রতিপক্ষকে আগেই নিরুৎসাহিত করা।
এসব অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সদস্যদেশগুলো যৌথ সামরিক প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন এবং রসদ ও গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়ে অঙ্গীকারবদ্ধ থাকবে। তুরস্কের আইনপ্রণেতাদের অনুমোদিত খসড়া অনুযায়ী, সদস্যদেশগুলো ১০ বছর এই চুক্তির আওতায় থাকবে। এরপর কোনো দেশ চাইলে চুক্তি থেকে বেরিয়ে যেতে পারবে।
চুক্তিতে অন্য দেশগুলোর যোগ দেওয়ার সুযোগও রাখা হয়েছে। তবে এ ক্ষেত্রে বর্তমান সদস্যদেশগুলোর অনুমোদন নিতে হবে। ইতোমধ্যে সিরিয়ার সরকার এই চুক্তিতে যোগ দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
এদিকে, বৃহস্পতিবার পার্লামেন্টে চুক্তিটি অনুমোদিত হলেও হুতিদের হামলার মধ্যে সৌদি আরবে তুরস্কের সেনা মোতায়েন করা হবে কি না, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। বিশেষজ্ঞদের মতে, তুরস্কের সেনা পাঠাতে হলে আরও কিছু আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে।
তুরস্কের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়াসার গুলের গত অক্টোবরে বলেছিলেন, চুক্তি অনুমোদনের পর সৌদি আরবকে কী ধরনের সহায়তা দেওয়া হতে পারে, তা নির্ধারণ করা হবে।
তুরস্কের গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, গুলের বলেছেন, হুতিদের সঙ্গে কোনো সংঘাতে জড়ানোর বিষয়টি তারা একেবারেই বিবেচনা করছেন না। বরং তুরস্কের সহায়তার লক্ষ্য হবে ‘প্রতিরোধ ক্ষমতা আরও শক্তিশালী করা’।
প্রসঙ্গত, ২০১৫ সাল থেকে ইরান-সমর্থিত হুতিদের সঙ্গে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের সংঘাত চলছে। ২০২২ সালে যুদ্ধবিরতির পর এই সংঘাতের উত্তেজনা কিছুটা কমে এসেছিল। তবে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে দুই পক্ষের মধ্যে আবারও উত্তেজনা বেড়েছে। এর মধ্যে রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে কয়েক দফা প্রাণঘাতী হামলাও চালিয়েছে গোষ্ঠীটি।
এদিকে, ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধের কারণে পুরো অঞ্চলে উত্তেজনা বিরাজ করছে। এই সংঘাতও সীমান্তের দুই পাশের উত্তেজনা বাড়িয়েছে।
এস এম/ ০৬ নভেম্বর ২০২৬







