ইউরোপ

ফ্রান্সে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে বিক্ষোভে ৫ লাখ ৭৫ হাজার মানুষ

বিক্ষোভে ৫ লাখ ৭৫ হাজার মানুষ

প্যারিস,০৬ নভেম্বর- অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি থমকে যাওয়া এবং জীবনযাত্রার ব্যয় অনেক বেড়ে যাওয়ার কারণে ফ্রান্সে গত কয়েক বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় প্রতিবাদ বিক্ষোভ ও ধর্মঘট অনুষ্ঠিত হয়েছে। দেশজুড়ে চলা ধর্মঘটের সঙ্গে মিল রেখে আয়োজিত এই বিক্ষোভে বৃহস্পতিবার সরকারের হিসাব অনুযায়ী প্রায় ৫ লাখ ৭৫ হাজার মানুষ অংশ নেন।

গত ১৭ অক্টোবরের বিক্ষোভে যে মাত্রায় সহিংসতা ছড়িয়ে পড়েছিল, বৃহস্পতিবারের পরিস্থিতি তার তুলনায় কিছুটা শান্ত ছিল। তবে কয়েকটি বড় শহরে বিক্ষোভকারী ও পুলিশের মধ্যে বিচ্ছিন্ন সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেছে। ধর্মঘটের কারণে দেশটির স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয়, রেল পরিষেবা এবং কিছু হাসপাতালের কার্যক্রম ব্যাহত হয়। এসব প্রতিষ্ঠানে কর্মীর উপস্থিতিও কমে যায়।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভালো পরিবেশের দাবিতে আন্দোলন করা শিক্ষার্থী, বিভিন্ন শ্রমিক ইউনিয়ন এবং ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলনকারীরা একসঙ্গে বিক্ষোভে যোগ দেওয়ায় আন্দোলনের ব্যাপকতা অনেক বেড়ে যায়। প্রতিটি গোষ্ঠীর আলাদা কিছু দাবি থাকলেও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, সরকারের নিষ্ক্রিয়তা, ধনী-দরিদ্রের ব্যবধান বাড়তে থাকা এবং দেশে বড় ধরনের সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা তাদের সবাইকে এক জায়গায় নিয়ে এসেছে।

শিক্ষার্থী, শিক্ষক, ডাকসেবা কর্মী, চিকিৎসক, ফার্মাসিস্ট ও পরিবহন কর্মীদের প্রতিনিধিত্বকারী ফ্রান্সের বৃহত্তম শ্রমিক ইউনিয়নগুলো বৃহস্পতিবার দেশজুড়ে ধর্মঘটের ডাক দেয়। সরকারের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর এক-তৃতীয়াংশ এই ধর্মঘটের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দেশের প্রায় ১৩ শতাংশ বিদ্যালয়ের কর্মীও ধর্মঘটে অংশ নিয়েছেন। তবে ইউনিয়নগুলোর দাবি, ধর্মঘটে অংশ নেওয়া কর্মীর সংখ্যা আরও অনেক বেশি।

রেল পরিষেবাতেও কর্মীদের কর্মবিরতির কারণে সময়সূচিতে ব্যাপক বিপর্যয় ঘটে। তবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সরকারি হাসপাতালের মাত্র ৫ শতাংশ কর্মী ধর্মঘটে অংশ নেওয়ায় স্বাস্থ্যসেবা খাতে বড় ধরনের কোনো সমস্যা হয়নি।

প্রায় তিন সপ্তাহ আগে বিক্ষোভে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ার পর থেকে ফ্রান্সের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও ব্যবসায়ীরা প্রতিটি বিক্ষোভের বিষয়ে সতর্ক অবস্থানে ছিলেন। রেন, নান্টেস, লিঁও ও মার্সেই শহরে চরমপন্থী ও অতি-বামপন্থী গোষ্ঠীর সঙ্গে পুলিশের ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া এবং টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে। তবে দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সার্বিকভাবে বড় কোনো অঘটন ছাড়াই দিনটি পার হয়েছে। এসব সহিংসতা ও সংঘর্ষের ঘটনায় সারা দেশে মোট ৪৪৮ জনকে আটক করেছে পুলিশ।

লিঁও শহরে মুখোশধারী বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ ও লাঠিচার্জ করে। অন্যদিকে রেন শহরে কয়েক ডজন বিশৃঙ্খলাকারী একটি হোটেলে ভাঙচুর চালায়, পুলিশকে লক্ষ্য করে ইট-পাটকেল ছোড়ে এবং শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ জানানো শ্রমিক ইউনিয়নের সদস্যদের ওপর হামলা করে। শিক্ষামন্ত্রী এদুয়াঁদ গেফ্রে জানিয়েছেন, তুলুজের কাছে একটি বিদ্যালয়ে আগুন লাগার ঘটনা ঘটেছে। এটি পরিকল্পিতভাবে আগুন দেওয়ার ঘটনা বলে ধারণা করা হচ্ছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্রে জানা গেছে, সারা দেশে ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা অন্তত ৮৬টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় সাড়া দিয়েছেন।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকার পক্ষে অবস্থান নিয়ে দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরেন্ট নুনেজ বলেন, “সহিংসতার নানা চেষ্টার মধ্যেও পুলিশ সদস্যরা সাহস ও দৃঢ়তার পরিচয় দিয়েছেন। এর ফলে নাগরিকরা শান্তিতে ও নিরাপদে নিজেদের প্রতিবাদ জানানোর অধিকার চর্চা করতে পেরেছেন।”

আন্দোলনে অংশ নেওয়া বিভিন্ন পক্ষের দাবিও আলাদা। ধর্মঘটের ডাক দেওয়া প্রধান শ্রমিক ইউনিয়নগুলো বেতন ও পেনশন বাড়ানোর দাবি জানিয়েছে। বিশেষ করে ফ্রান্সের প্রভাবশালী শ্রমিক ইউনিয়ন সিজিটি অবিলম্বে ন্যূনতম মজুরি ১০ শতাংশ বাড়ানোর দাবি তুলেছে। অন্যদিকে সিএফডিটি তাদের কর্মীদের মাসিক সর্বনিম্ন বেতন ১০০ ইউরো বা প্রায় ৭ শতাংশ বাড়ানোর দাবি জানিয়েছে।

শিক্ষার্থী সংগঠনগুলো শিক্ষা খাতে বাজেটে অতিরিক্ত ১০ বিলিয়ন ডলার বরাদ্দ, বিদ্যালয়ের অবকাঠামো উন্নয়নে ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে আরও ২ লাখ ৫০ হাজার আসন তৈরির দাবি জানিয়েছে।

অন্যদিকে, আট বছর আগে শুরু হওয়া চরমপন্থী আন্দোলন ‘ইয়েলো ভেস্ট’ সরাসরি ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ ও তাঁর সরকারের পদত্যাগ এবং নতুন সাংবিধানিক প্রক্রিয়া শুরুর এক দফা দাবি তুলেছে।

দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন বিক্ষোভকারীরা। আগামী বড়দিন, এমনকি আগামী বসন্তে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন পর্যন্ত এই অসন্তোষ ও রাজপথের আন্দোলন ছড়িয়ে পড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সামনের দিনগুলোতেও ধারাবাহিক বিক্ষোভের কর্মসূচি হাতে নিয়েছে ইয়েলো ভেস্ট আন্দোলনকারীরা। ফ্রান্সে শুরু হওয়া এই আন্দোলনের প্রভাব ইউরোপের অন্য দেশগুলোতেও ছড়িয়ে পড়ছে। স্পেন, ইতালি, পর্তুগাল ও বেলজিয়ামেও চলতি মাসের শেষ দিকে একই ধরনের বড় ধর্মঘটের পরিকল্পনা রয়েছে।

গত ১৭ অক্টোবরের আকস্মিক সহিংসতার পর এবার ফরাসি কর্তৃপক্ষ সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী রাস্তায় কঠোর পাহারা দিয়ে সহিংসতা কিছুটা নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারলেও জনগণের যৌক্তিক দাবিগুলো সামাল দিতে ব্যর্থ হওয়ায় তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছেন প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁ।

ফরাসি সাংবাদিক ও ইউটিউবার উগোদেক্রিপ্টকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁ বলেন, ছুটির পর সব হাইস্কুল খুলুক, সেটাই তিনি চান। কারণ তরুণদের ভবিষ্যতের সঙ্গে বিষয়টি জড়িত এবং তাদের আবার শ্রেণিকক্ষে ফিরে আসা প্রয়োজন। তিনি বলেন, তরুণদের দাবিগুলো সরকার ইতোমধ্যে শুনেছে। তাই বিক্ষোভ চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি অন্তত হাইস্কুলগুলো যেন স্বাভাবিকভাবে চালু রাখা যায়, সে জন্য শান্ত থাকার আহ্বান জানান তিনি।

এস এম/ ০৬ নভেম্বর ২০২৬

Back to top button
🌐 Read in Your Language