চীনা স্যাটেলাইট তথ্যের সহায়তায় ইরানের হামলার সক্ষমতা বেড়েছে, দাবি মার্কিন কর্মকর্তাদের

ওয়াশিংটন, ২৫ সেপ্টেম্বর- চীনের বিভিন্ন গোষ্ঠীর সরবরাহ করা স্যাটেলাইট ছবি ও গোয়েন্দা তথ্য ইরানের সামরিক সক্ষমতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে বলে দাবি করেছেন মার্কিন কর্মকর্তারা।
তাদের ভাষ্য, এসব তথ্য ব্যবহার করে ইরান একদিকে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ শনাক্ত করে সেগুলোকে হুমকির মুখে ফেলতে পারছে, অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে আরও নির্ভুল হামলা চালানোর সক্ষমতা অর্জন করেছে।
সাম্প্রতিক কয়েক মাসে ইরানের লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণের সক্ষমতায় বড় ধরনের উন্নতি হয়েছে। এ বিষয়ে একাধিক মার্কিন গোয়েন্দা মূল্যায়নের তথ্য চারটি সূত্রের মাধ্যমে জানতে পেরেছে সিএনএন।
সূত্রগুলোর দাবি, চীনা স্যাটেলাইট থেকে পাওয়া ছবি ও ভৌগোলিক তথ্যের সহায়তায় গত জুলাইয়ে জর্ডানের একটি মার্কিন ঘাঁটিতে ইরান এমন নির্ভুল হামলা চালাতে সক্ষম হয়, যা এ ধরনের সহায়তা ছাড়া ইরানের পক্ষে করা কঠিন ছিল বলে মনে করেন মার্কিন কর্মকর্তারা। ওই হামলায় তিন মার্কিন সেনা নিহত হন।
এ ছাড়া চীনা ভূ-স্থানিক তথ্যের সহায়তায় হরমুজ প্রণালির মধ্য দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলোর ওপর নজরদারির ইরানি সক্ষমতাও বেড়েছে বলে জানিয়েছেন এক মার্কিন কর্মকর্তা। এর ফলে ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার সম্ভাবনাও বেড়েছে।
স্যাটেলাইট তথ্য কাজে লাগিয়ে ড্রোন হামলা
দুই মার্কিন সূত্রের ভাষ্য, চীনা তথ্যের সহায়তায় ইরান তুলনামূলক সহজ প্রযুক্তির তাপ-অনুসরণকারী ড্রোনও আরও কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে পারছে। এসব ড্রোন মাঝ আকাশে সহজে নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। তবে কোনো জাহাজ কখন নির্দিষ্ট অবস্থানে পৌঁছাবে, তা আগে থেকে হিসাব করে হামলার সময় নির্ধারণ করা সম্ভব হওয়ায় এসব ড্রোন জাহাজের বিরুদ্ধে কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যাচ্ছে।
মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, হরমুজ প্রণালিতে ইরানের কৌশল মূলত একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক ড্রোন উৎক্ষেপণ করা এবং সেগুলোকে জাহাজের তাপ-স্বাক্ষর অনুসরণ করে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করার সুযোগ দেওয়া।
এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সম্প্রতি একটি মার্কিন নৌ-এসকর্ট অভিযানের সময় মার্কিন বাহিনী এক ডজনের বেশি ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করে এবং প্রায় ২০টি ড্রোন ভূপাতিত করে। একই সময়ে প্রণালির আশপাশে প্রায় ৬০টি লক্ষ্যবস্তুতে পাল্টা হামলাও চালানো হয়।
মার্কিন কর্মকর্তারা মনে করছেন, চীনের গোয়েন্দা সহায়তার পাশাপাশি রাশিয়ার সহযোগিতা এবং দীর্ঘদিন ধরে চলা সংঘাতে ইরানি বাহিনীর অর্জিত যুদ্ধ-অভিজ্ঞতাও তাদের সামরিক সক্ষমতা বাড়াতে ভূমিকা রাখছে।
চীনের সহায়তার পরিমাণ নিয়ে অনিশ্চয়তা
তবে চীন ঠিক কতটা সহায়তা করছে, তা নির্দিষ্ট করে বলা কঠিন বলে জানিয়েছেন মার্কিন কর্মকর্তারা। তাদের মতে, চীনা সরকার সরাসরি এই সহায়তার নির্দেশ দিয়েছে কি না, নাকি চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোকে এ ধরনের সহায়তা দেওয়ার ক্ষেত্রে নীরব সম্মতি দেওয়া হয়েছে, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
এ বিষয়ে মার্কিন কর্মকর্তাদের মধ্যেও মতপার্থক্য রয়েছে। একজন মার্কিন গোয়েন্দা-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক কিছু তথ্য থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যায়, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়া এবং এর কারণে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়ে যাওয়াকে চীন বরং বন্ধ করতে চায়।
তবে মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, চীনা গোয়েন্দা সহায়তা এরই মধ্যে ইরানের যুদ্ধকৌশলে প্রভাব ফেলেছে।
মার্কিন কর্মকর্তা ও বাইরের বিশ্লেষকেরা মনে করেন, হরমুজ প্রণালি ইরানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত চাপ প্রয়োগের জায়গাগুলোর একটি। সেখানে মার্কিন সামরিক এসকর্ট ও বাণিজ্যিক জাহাজকে লক্ষ্য করে ইরান নিয়মিত হামলার চেষ্টা চালাচ্ছে।
ক্ষেপণাস্ত্র-ড্রোনের সক্ষমতায়ও উন্নতি
চীন ও রাশিয়ার কারিগরি সহায়তায় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের গাইডেন্স বা দিকনির্দেশনা ব্যবস্থাতেও উন্নতি হয়েছে বলে দাবি করেছেন মার্কিন কর্মকর্তারা।
এক মার্কিন কর্মকর্তার ভাষ্য, যুদ্ধক্ষেত্রে নিয়মিত অভিজ্ঞতা অর্জনের কারণে ইরানের সক্ষমতা বেড়েছে। তবে এর পাশাপাশি বাইরের সহায়তাও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
এদিকে চীনা বাণিজ্যিক স্যাটেলাইট কোম্পানিগুলোর মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যের ছবি ইরানের হাতে যাওয়ার বিষয়টি ঠেকাতেও ওয়াশিংটন পদক্ষেপ নিয়েছে। গত মে মাসে মার্কিন প্রশাসন তিনটি চীনা স্যাটেলাইট কোম্পানির ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়। ওয়াশিংটনের অভিযোগ ছিল, এসব কোম্পানির সরবরাহ করা স্যাটেলাইট ছবি মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন বাহিনীর বিরুদ্ধে ইরানের সামরিক হামলায় সক্ষমতা বাড়াচ্ছে।
মার্কিন ঘাঁটিগুলো আরও ঝুঁকির মুখে
যুদ্ধ সপ্তম মাসে প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গে ইরান যুদ্ধক্ষেত্রে নিজেদের কৌশলও বদলাচ্ছে বলে জানিয়েছেন মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তারা। এর লক্ষ্য হলো মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক স্থাপনা ও সম্পদকে হুমকির মধ্যে রাখা এবং ওয়াশিংটন ও তার মিত্রদের ওপর চাপ অব্যাহত রাখা।
এক গোয়েন্দা-সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, ইরান এখন নিয়মিত মার্কিন এমকিউ-৯ রিপার ড্রোন ভূপাতিত করছে। পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যে ইরানি ড্রোন তৎপরতা নিয়েও নিয়মিত সতর্কতা জারি হচ্ছে।
আরেক মার্কিন সূত্র বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে যুদ্ধ চলার কারণে ইরানকে নিজেদের কৌশল ও সক্ষমতা উন্নত করার সুযোগও দেওয়া হয়েছে।
ওই সূত্রের দাবি, চীনের কাছ থেকে ইরান বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও পেয়েছে।
মার্কিন কর্মকর্তাদের আরেকটি বড় উদ্বেগ হলো ইরানের কম ও মাঝারি উচ্চতায় উড্ডয়নকারী ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন মোকাবিলার বিষয়টি। যুক্তরাষ্ট্র উচ্চ-উচ্চতায় আসা ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকাতে অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও জটিল আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তৈরি করলেও তুলনামূলক নিচু উচ্চতায় আসা ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকাতে নতুন করে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হচ্ছে।
এর কারণে মধ্যপ্রাচ্যের কিছু মার্কিন সামরিক ও কূটনৈতিক স্থাপনায় অতিরিক্ত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোতায়েন করতে হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট এক সূত্র জানিয়েছেন।
জর্ডানে হামলায় চীনা তথ্যের ভূমিকা
২০২০ সালেও মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা চালানোর সক্ষমতা দেখিয়েছিল ইরান। সে সময় তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশে ইরানের শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা কাসেম সোলেইমানিকে হত্যার পর ইরাকের একটি মার্কিন ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় তেহরান।
তবে একাধিক মার্কিন কর্মকর্তার দাবি, এরপর থেকে নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার ক্ষেত্রে ইরানের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
পেন্টাগনের ইন্সপেক্টর জেনারেলের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনের বরাতে বলা হয়েছে, যুদ্ধের প্রথম কয়েক মাসে ইরানের হামলায় কুয়েত, বাহরাইন, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, ইরাক, ওমান ও জর্ডানে মার্কিন ঘাঁটির শত শত ভবন ও স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। ইরান ও তাদের মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর হামলার মুখে ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ড বা সেন্টকম জনবল, সামরিক সরঞ্জাম ও মজুত স্থাপনার অবস্থান পরিবর্তন করেছে বলেও ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
জুলাইয়ে জর্ডানের একটি মার্কিন ঘাঁটিতে প্রাণঘাতী হামলার ক্ষেত্রে চীনের সরবরাহ করা গোয়েন্দা তথ্যকে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন কিছু মার্কিন কর্মকর্তা। এর আগে ওয়াল স্ট্রিট জার্নালও ওই হামলার সঙ্গে চীনা স্যাটেলাইট ছবির যোগসূত্রের কথা জানিয়েছিল।
চীনা-ইরানি সম্পর্ক নিয়ে ওয়াশিংটনের সতর্কতা
চীনের কাছ থেকে ইরানের সামরিক ও গোয়েন্দা সহায়তা পাওয়ার অভিযোগের বিষয়ে বেইজিং সরাসরি কোনো অনিয়মের কথা স্বীকার করেনি। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গুয়ো জিয়াকুন এর আগে বলেছিলেন, চীন সব সময় আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা মেনে চলে এবং সংঘাতকে ব্যবহার করে চীনের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলার বিরোধিতা করে।
ইরানকে লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণে চীন সহায়তা করছে কি না, এমন প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দিতে এর আগে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। তিনি বলেছিলেন, ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাতের গতিপথে চীনের কর্মকাণ্ড কোনো পরিবর্তন আনেনি। বরং কিছু ক্ষেত্রে চীন সহযোগিতামূলক ভূমিকা নিয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বৈঠকে বিষয়টি আলোচনায় আসতে পারে বলে জানিয়েছেন এক মার্কিন কর্মকর্তা।
দ্বৈত-ব্যবহারযোগ্য যন্ত্রাংশ নিয়েও উদ্বেগ
ইরানের সামরিক সক্ষমতা পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে চীন থেকে আমদানি করা ‘ডুয়াল-ইউজ’ বা বেসামরিক ও সামরিক—দুই ধরনের কাজে ব্যবহারযোগ্য যন্ত্রাংশ নিয়েও যুক্তরাষ্ট্র উদ্বিগ্ন।
এক মার্কিন কর্মকর্তা দাবি করেছেন, চীনা যন্ত্রাংশের সরবরাহ না থাকলে ইরানের পক্ষে দীর্ঘ সময় একই মাত্রায় যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া কঠিন হতো।
তবে আরেক মার্কিন কর্মকর্তা বলেছেন, ইরান যেভাবে নিজেদের সামরিক মজুত পুনর্গঠন করছে, তা যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর আগের মূল্যায়নের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ। একই সঙ্গে যুদ্ধের সব লক্ষ্যবস্তুতে হামলা শেষ করার আগেই ট্রাম্প প্রশাসন পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। তার মতে, ইরানের সামরিক সক্ষমতা পুনর্গঠনের এটিও একটি কারণ।
চীনা স্যাটেলাইট তথ্য, রুশ সহায়তা, ইরানের নিজস্ব প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং দীর্ঘ সংঘাত থেকে অর্জিত যুদ্ধ-অভিজ্ঞতা—সব মিলিয়ে ইরানের হামলার নির্ভুলতা ও কৌশলগত সক্ষমতা বাড়ছে বলে মার্কিন গোয়েন্দা মূল্যায়নে উঠে এসেছে। তবে চীনা সরকারের সরাসরি নির্দেশে এসব সহায়তা দেওয়া হচ্ছে কি না, সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত কোনো প্রমাণ প্রকাশ্যে আসেনি।
এস এম/ ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬







