হুতিদের সৌদি আরামকো স্থাপনায় হামলার দাবি, বিশ্ববাজারে বাড়ল তেলের দাম

সানা, ২৫ সেপ্টেম্বর- ইয়েমেনের হুতিরা নতুন করে সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় জ্বালানি কোম্পানি সৌদি আরামকোর স্থাপনায় হামলার দাবি করেছে। এই হামলার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হওয়ায়ামের প্রধান সূচক হিসেবে বিবেচিত ব্রেন্ট ক্রুডের নভেম্বরের ফিউচার বৃহস্পতিবার একপরিদের ছোড়া ছয়টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা হয়েছে। জোটের মুখপাত্র মেজর জেনারেল তুর্কি আল-মালিকি জানান, ক্ষেপণ বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৩ শতাংশের বেশি বেড়ে যায়।
বিশ্ববাজারে তেলের দামের প্রধান সূচক হিসেবে বিবেচিত ব্রেন্ট ক্রুডের নভেম্বরের ফিউচার বৃহস্পতিবার একপর্যায়ে ব্যারেলপ্রতি ১০৮ ডলারেরও বেশি উঠে যায়। দিন শেষে দাম ১০৬ দশমিক ৫০ ডলারের ওপরে ছিল। শুক্রবার সকালে এশিয়ার বাজারে কিছুটা কমলেও দাম ১০৫ ডলারের ওপরেই ছিল।
এর আগে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছিল। ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের চলমান যুদ্ধ এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বড় ধরনের বিঘ্নের পাশাপাশি সৌদি আরবের তেল অবকাঠামোও হামলার ঝুঁকিতে পড়েছে।
রিয়াদ ও আরামকো স্থাপনায় হামলার দাবি হুতিদের
বৃহস্পতিবার হুতিরা দাবি করে, তারা সৌদি রাজধানী রিয়াদে একটি ‘সংবেদনশীল লক্ষ্যবস্তু’ এবং লোহিত সাগরের তীরবর্তী ইয়ানবু শহরে সৌদি আরামকোর একটি স্থাপনা লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে।
হুতিদের নিয়ন্ত্রিত ইয়েমেন নিউজ এজেন্সিতে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে বলা হয়, দুটি অভিযানই ‘সফলভাবে লক্ষ্য অর্জন করেছে’।
তবে এসব হামলায় কোনো ক্ষয়ক্ষতি বা হতাহতের ঘটনা ঘটেছে কি না, তা সৌদি কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেনি। সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট অবশ্য জানিয়েছে, হুতিদের ছোড়া ছয়টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা হয়েছে। জোটের মুখপাত্র মেজর জেনারেল তুর্কি আল-মালিকি জানান, ক্ষেপণাস্ত্রগুলো তাইফ ও ইয়ানবুর দিকে ছোড়া হয়েছিল।
ইয়ানবু সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ তেল অবকাঠামোর কেন্দ্র। হরমুজ প্রণালিতে জটিলতা তৈরি হওয়ার পর সৌদি আরবের তেল রফতানির বিকল্প পথ হিসেবেও এই বন্দরটির গুরুত্ব বেড়েছে।
আরামকো ঘিরে বাড়ছে উদ্বেগ
সৌদি আরামকো বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি কোম্পানি। ফলে প্রতিষ্ঠানটির তেল উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ বা রফতানি অবকাঠামোয় বড় ধরনের হামলা হলে বিশ্ববাজারে সরবরাহ সংকট আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে সৌদি আরবের জ্বালানি অবকাঠামো ইতোমধ্যেই একাধিক হামলার মুখে পড়েছে। সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি ড্রোন হামলার পর সৌদির ইস্ট-ওয়েস্ট তেল পাইপলাইনের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। এই পাইপলাইন দেশের পূর্বাঞ্চলের তেলক্ষেত্রগুলোকে ইয়ানবু বন্দরের সঙ্গে যুক্ত করে এবং হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে তেল পরিবহনের সুযোগ দেয়।
রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, এরপর সৌদি আরব পূর্বাঞ্চলীয় উপসাগরীয় বন্দরগুলো দিয়ে রফতানি বাড়ানোর চেষ্টা করেছে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে সৌদি তেল পরিবহনের পরিমাণও আগের তুলনায় বেড়েছে।
কূটনৈতিক তৎপরতার মধ্যেই নতুন উত্তেজনা
বিশ্ববাজারে তেলের দাম এমন সময়ে বাড়ল, যখন জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কূটনৈতিক তৎপরতা চলছে। সাত মাস ধরে চলা সংঘাতের অবসানে সম্ভাব্য সমাধান খুঁজতে দুই পক্ষের মধ্যে যোগাযোগের চেষ্টা চলছে।
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বৃহস্পতিবার আশা প্রকাশ করেছেন, নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগেই ওয়াশিংটন যুদ্ধ বন্ধের বিষয়ে আগে হওয়া সমঝোতার স্মারকে ফিরে আসবে। তবে ওই সমঝোতা আগস্টের মাঝামাঝি কোনো শান্তিচুক্তি ছাড়াই কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়ে।
বাজার বিশ্লেষকেরা বলছেন, কূটনৈতিক উদ্যোগ তেলের দাম বৃদ্ধির চাপ কিছুটা কমাতে পারে। কিন্তু জ্বালানি সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ পথ ও অবকাঠামো যতক্ষণ ঝুঁকির মধ্যে থাকবে, ততক্ষণ বাজারে বাড়তি ঝুঁকির প্রিমিয়াম বজায় থাকতে পারে।
অস্ট্রেলিয়ার সিডনিভিত্তিক কেসিএম ট্রেডের প্রধান বাজার বিশ্লেষক টিম ওয়াটারার আল-জাজিরাকে বলেন, যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ের তুলনায় তেলের দাম এখনও বেশ উঁচু। এর পেছনে গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহপথ ও স্থাপনাগুলো এখনও ঝুঁকিপূর্ণ থাকার বাস্তবতা কাজ করছে।
তিনি বলেন, জাতিসংঘ অধিবেশনের ফাঁকে কূটনৈতিক তৎপরতা বাজারে কিছুটা ভারসাম্য আনছে। তবে দীর্ঘস্থায়ী উত্তেজনা কমার স্পষ্ট প্রমাণ না পাওয়া পর্যন্ত তেলের দামের ঊর্ধ্বমুখী চাপ বজায় থাকতে পারে।
যুদ্ধ চললে ১০০ ডলারের ওপরে থাকতে পারে তেল
সিঙ্গাপুরভিত্তিক স্পার্টা কমোডিটিজের জ্যেষ্ঠ তেলবাজার বিশ্লেষক জুন গোহের মতে, ইরান যুদ্ধ অব্যাহত থাকলে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরেই থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।
তিনি বলেন, সংঘাতের সুস্পষ্ট সমাধান না হওয়ায় বিশ্বজুড়ে তেলের মজুদের ঘাটতি আরও বাড়ছে।
এর আগে সৌদি আরবের ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনে হামলা এবং ইয়ানবু দিয়ে তেল রফতানিতে বিঘ্নের কারণে বিশ্ববাজারে সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছিল। যদিও সৌদি আরব বিকল্প রফতানি পথ ব্যবহার করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে, হরমুজ ও বাব আল-মানদেব—এই দুটি গুরুত্বপূর্ণ নৌপথই এখন আঞ্চলিক সংঘাতের প্রভাবে রয়েছে।
ফলে হুতিদের সর্বশেষ হামলার দাবি শুধু সৌদি আরবের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকেই নতুন করে আলোচনায় আনেনি; বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহের স্থিতিশীলতা নিয়েও উদ্বেগ বাড়িয়েছে। আর সেই উদ্বেগের তাৎক্ষণিক প্রভাব দেখা গেছে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামে।
এস এম/ ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬







