ইরানি ফ্লাইটে সেবা বন্ধ করলে প্রতিবেশী দেশগুলোকে প্রতিশোধের হুঁশিয়ারি তেহরানের

তেহরান,২৫ সেপ্টেম্বর- যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ইরানি এয়ারলাইন্সগুলোকে পরিষেবা না দিলে প্রতিবেশী দেশগুলোর বিরুদ্ধে প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে তেহরান। যুক্তরাষ্ট্রের নতুন বিমান নিষেধাজ্ঞার কারণে প্রায় সাত মাস ধরে চলা সংঘাতের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্য ও আশপাশের অঞ্চলের বিমান চলাচলে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব মহসেন রেজাই দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আমি সব প্রতিবেশী দেশকে যুক্তরাষ্ট্রের এই দুঃসাহসিক অভিযানে শামিল না হওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি। এই প্রক্রিয়া খুব শিগগিরই ব্যর্থতায় শেষ হবে।’
মূলত, যেসব বিমানবন্দর ও এভিয়েশন সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান ইরানি ফ্লাইটকে পরিষেবা দেওয়া অব্যাহত রাখবে, তাদের ওপর ‘গৌণ নিষেধাজ্ঞা’ বা ‘সেকেন্ডারি স্যাংশন’ আরোপের হুঁশিয়ারি দিয়েছে ওয়াশিংটন। এর পরপরই বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক রুটে ফ্লাইট বাতিল করতে বাধ্য হয়েছে ইরানি ক্যারিয়ারগুলো।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে ইরানের সব ফ্লাইট বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এছাড়া আজারবাইজান ও জর্জিয়া ইরানি ফ্লাইট স্থগিত করার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। বাগদাদ ও মাস্কাটের ফ্লাইট সার্ভিসও পুরোপুরি থমকে গেছে। অন্যদিকে, তুরস্ক ও চীনের সঙ্গে কিছু ফ্লাইট চালু থাকলেও অধিকাংশ শিডিউলই বাতিল করা হয়েছে।
ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ইরান তাদের এই হুমকি কতটা বাস্তবে রূপ দিতে পারবে, তা নিয়ে ধোঁয়াশা থাকলেও এই টানাপোড়েনে পুরো অঞ্চলের পর্যটন ও আকাশপথ ভ্রমণস্ক, পাকিস্তান ও চীন ইরানের সঙ্গে বিমান যোগাযোগ বন্ধ করবে বলে তিনি মনে করেন না। এ ছাড়া অন্য দেশের বিমান সংস্থাগুলোও ইরানে ফ্লাইট পরিচালনা করছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার শিল্প বড় সংকটের মুখে পড়তে যাচ্ছে।
ইরান কি সত্যিই প্রতিবেশী দেশের বিমানবন্দর অচল করতে পারবে?
ইরানের হুমকির ধরন এখনো স্পষ্ট নয়। তেহরান স্পষ্ট করে জানায়নি, তারা কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক নাকি সামরিক পদক্ষেপের কথা বলছে।
অন্য দেশের সার্বভৌম ভূখণ্ডে থাকা বিমানবন্দর ইরান আইনগতভাবে বন্ধ করে দিতে পারে না। একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রও সরাসরি অন্য দেশের বিমানবন্দর বা আকাশসীমা বন্ধ করার ক্ষমতা রাখে না। তবে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার কারণে স্থানীয় জ্বালানি সরবরাহকারী, গ্রাউন্ড হ্যান্ডলার ও টিকিট বিক্রয়কারী প্রতিষ্ঠানগুলো ইরানি বিমানকে সেবা দিতে আর্থিক ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক এবং অস্ট্রিয়ার সাবেক প্রতিরক্ষা অ্যাটাশে উলফগ্যাং পুস্তাই মনে করেন, এবার ইরান আঞ্চলিক বিমানবন্দরগুলোতে হামলা চালাবে—এমন সম্ভাবনা খুবই কম।
তিনি বলেন, তুরস্ক, পাকিস্তান ও চীন ইরানের সঙ্গে বিমান যোগাযোগ বন্ধ করবে বলে তিনি মনে করেন না। এ ছাড়া অন্য দেশের বিমান সংস্থাগুলোও ইরানে ফ্লাইট পরিচালনা করছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার বাস্তব প্রভাব কিছুটা সীমিত থাকতে পারে।
তবে ইরানের জন্য এর মানসিক প্রভাব বড় হতে পারে বলে মনে করেন পুস্তাই। আন্তর্জাতিক ফ্লাইট একের পর এক বন্ধ হয়ে গেলে সাধারণ ইরানিরা দেশটির ক্রমবর্ধমান আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা সরাসরি অনুভব করবেন।
ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চলমান সংঘাতের শুরুতেও মধ্যপ্রাচ্যের বিমান চলাচলে বড় ধরনের বিপর্যয় দেখা দিয়েছিল। ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ইরান কাতার, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, বাহরাইন, ওমান ও জর্ডানে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানোর পর এসব দেশের আকাশসীমা আংশিক বা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।
পরে ধীরে ধীরে সীমিত পরিসরে ফ্লাইট চালু হয়। তবে স্বাভাবিক সূচিতে ফিরতে উপসাগরীয় দেশগুলোর বিমান সংস্থাগুলোর কয়েক মাস লেগেছে।
আন্তর্জাতিক বিমান পরিবহন সংস্থা (আইএটিএ) বলছে, ২০২৬ সালে মধ্যপ্রাচ্যের বিমান সংস্থাগুলোর সম্মিলিত ক্ষতি ৪৩০ কোটি ডলারে পৌঁছাতে পারে।
বিশ্ব ভ্রমণ ও পর্যটন কাউন্সিলের হিসাবে, সংঘাতের কারণে মার্চে মধ্যপ্রাচ্যে আন্তর্জাতিক পর্যটকদের ব্যয় প্রতিদিন প্রায় ৬০ কোটি ডলার কমে গিয়েছিল। একই সময়ে ট্যুরিজম ইকোনমিকসের পূর্বাভাস ছিল, যুদ্ধের কারণে ২০২৬ সালে উপসাগরীয় দেশগুলোতে আন্তর্জাতিক ভ্রমণ ২৫ শতাংশ কমতে পারে।
এস এম/ ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬







