রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান মিয়ানমারেই, নিরাপদ প্রত্যাবাসনে সহযোগিতা চান তারেক রহমান

ঢাকা, ২৫ সেপ্টেম্বর- রোহিঙ্গা সংকটের উৎস মিয়ানমারে, তাই এর সমাধানও সেখানেই নিহিত বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে দেওয়া ভাষণে তিনি রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কার্যকর সহযোগিতা কামনা করেন।
বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) নিউইয়র্কের স্থানীয় সময় অনুযায়ী জাতিসংঘ সদর দপ্তরে বিশ্বনেতাদের সামনে দেওয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘ ৯ বছরের বেশি সময় ধরে ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেওয়ায় বাংলাদেশের ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘রোহিঙ্গা সংকটের উৎস ও উৎপত্তি মিয়ানমারে; তাই এর সমাধানও সেখানেই নিহিত। বাস্তুচ্যুত এই জনগোষ্ঠীকে মাতৃভূমি মিয়ানমারে নিরাপদে ফিরিয়ে নেওয়াই এই সমস্যার একমাত্র সমাধান।’
রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান এবং তাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসন না হওয়া পর্যন্ত জীবন রক্ষাকারী সহায়তা অব্যাহত রাখতে জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কার্যকর সমর্থন চান প্রধানমন্ত্রী।
ভাষণের শুরুতে জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান ও মহান মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে তাঁর বাবা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে স্মরণ করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘ দেড় দশকের বেশি সময়ের ফ্যাসিবাদী শাসন-শোষণের অবসান ঘটিয়ে ২০২৪ সালে বাংলাদেশ ফ্যাসিবাদমুক্ত হয়েছে। গুম, খুন, দুর্নীতি ও অর্থপাচারের অভিশাপ থেকে মুক্ত হয়ে দেশ আবার গণতন্ত্রের পথে যাত্রা শুরু করেছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনে জনগণ বিএনপিকে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। ফ্যাসিবাদী শাসনে ক্ষতবিক্ষত রাষ্ট্র মেরামতে সরকার ‘রিকভারি, রেস্টোরেশন এবং রিকনস্ট্রাকশন’ বা থ্রি-আর কৌশল অনুসরণ করছে বলেও জানান তিনি।
তরুণদের দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর, ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বাংলাদেশকে ‘ম্যানুফ্যাকচারিং হাব’ হিসেবে গড়ে তুলতে সরকারের পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তরুণ উদ্যোক্তাদের স্টার্টআপের জন্য চলতি বাজেটে ৫০ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দ রাখা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলায় বাংলাদেশের ঝুঁকির কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী কপ-৩১ সম্মেলনে জলবায়ু অর্থায়ন ও অভিযোজন সহায়তায় আরও জোরালো বৈশ্বিক পদক্ষেপের দাবি জানান।
পরিবেশ সুরক্ষায় আগামী পাঁচ বছরে সারাদেশে ২৫ কোটি গাছ লাগানো এবং ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের পরিকল্পনার কথা জানান তিনি। সুন্দরবনে মিঠা পানির প্রবাহ বাড়াতে তিস্তা মহাপরিকল্পনা এবং ‘পদ্মা ব্যারেজ’ প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ শুরুর কথাও উল্লেখ করেন।
শুধু ভোটের গণতন্ত্র নয়, সরকার অর্থনীতির গণতন্ত্রায়নও নিশ্চিত করতে চায় বলে জানান তারেক রহমান। নারী শিক্ষা ও উদ্যোক্তা তৈরিতে নগদ অর্থায়নের সুযোগ বাড়ানো এবং স্নাতক পর্যন্ত বিনা বেতনে শিক্ষার সুযোগ দেওয়ার কথা বলেন তিনি।
পিছিয়ে পড়া মানুষের জন্য ‘ফ্যামিলি কার্ড’, ‘ফার্মার্স কার্ড’, ‘স্পোর্টস কার্ড’ ও ‘ই-হেলথ কার্ড’ চালুর কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী জানান, ভবিষ্যতে এসব কার্ড সমন্বয় করে একটি ‘ইউনিভার্সাল কার্ড’ চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
শিক্ষা খাতে সর্বোচ্চ বাজেট বরাদ্দের কথা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে পর্যায়ক্রমে শিক্ষা খাতে জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে বর্তমানের ডিজিটাল বিভাজন যেন ভবিষ্যতের বৈষম্যের কারণ না হয়, সে বিষয়ে প্রযুক্তি হস্তান্তর ও সাশ্রয়ী প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি।
বিশ্বশান্তির প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সংঘাতের সমাধান মারণাস্ত্র নয়, বরং আলোচনা ও কূটনীতির মাধ্যমে হওয়া উচিত। স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের ন্যায্য দাবির প্রতি বাংলাদেশের অবিচল সমর্থনও পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি।
দেশে স্থিতিশীল বিনিয়োগ পরিবেশের কথা তুলে ধরে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশে বিনিয়োগের আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘আমরা এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চাই, যেখানে তরুণরা নির্ভয়ে তাদের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করবে, নারীরা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে চলবে। এজন্যই আমরা বলি—সবার আগে বাংলাদেশ: সবার জন্য বাংলাদেশ।’
এস এম/ ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬







