সম্পাদকের পাতা

সব হার পরাজয় নয়

নজরুল মিন্টো

নির্বাচনে একজন জিতবেন, অন্যরা হারবেন। এটাই নিয়ম। কিন্তু নির্বাচনে হারলেই কি সব সময় পরাজয় হয়? আমার মনে হয় না। অনেক সময় একটি নির্বাচনে হেরেও একজন প্রার্থী নতুন পরিচিতি পান, মানুষের আস্থা অর্জন করেন এবং ভবিষ্যতের জন্য আরও বড় সুযোগ তৈরি করেন। আবার কোনো কোনো পরাজয় পুরো একটি কমিউনিটির সামনে নতুন সম্ভাবনার পথও খুলে দেয়।

স্কারবরো সাউথওয়েস্টের উপনির্বাচনকে আমি ঠিক সেভাবেই দেখতে চাই। এ নির্বাচনে এনডিপির ফাতিমা শাবান ৮ হাজার ৯১৪ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন। লিবারেলের বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত আহসানুল হাফিজ পেয়েছেন ৬ হাজার ৬৭৪ ভোট এবং প্রগ্রেসিভ কনজারভেটিভ পার্টির ডা. নুর তরুন পেয়েছেন ৫ হাজার ১৪৮ ভোট। নির্বাচনী হিসাবে দুজনই হেরেছেন।

নির্বাচনে হার কোনো অস্বাভাবিক ঘটনা নয়। কানাডার রাজনীতিতেই তার বড় উদাহরণ আছে। ১৯৯৩ সালে প্রধানমন্ত্রী Kim Campbell নিজের আসনেই হেরে গিয়েছিলেন, তাঁর দলও ১৬৯ আসন থেকে নেমে এসেছিল মাত্র দুই আসনে। Ontario PC Party-এর নেতা John Tory-ও পরপর দুবার নির্বাচনে হেরেছিলেন। অথচ কয়েক বছর পর তিনিই টরন্টোর মেয়র হন। অর্থাৎ নির্বাচনী হার কোনো রাজনীতিকের ভবিষ্যতের শেষ কথা নয়।

সদ্য সমাপ্ত নির্বাচনটি ঘিরে কমিউনিটিতে এখন নানান কথা, নানান বিশ্লেষণ। কার ভুল ছিল, কে কাকে সমর্থন করলেন না, কার প্রচারণা দুর্বল ছিল, এমনকি ফেডারেল এমপি ডলি বেগমকেও অনেকে এই প্রাদেশিক নির্বাচনের হিসাবের মধ্যে টেনে আনছেন। আলোচনা হতেই পারে। কিন্তু আমার কাছে মনে হয়েছে, আমরা এখনো পুরো ঘটনাটিকে একটি ছোট বাক্সের মধ্যে রেখে বিচার করছি। সেই বাক্সটির নাম বাংলাদেশি কমিউনিটি।

আমাদের আলোচনা শুনলে অনেক সময় মনে হয়, এটি বুঝি স্কারবরো সাউথওয়েস্টের নির্বাচন ছিল না, ছিল বাংলাদেশি কোনো সংগঠনের নির্বাচন। কে সিলেটি, কে বরিশালের, কে আওয়ামী লীগ করতেন, কে বিএনপি করেন, এসব নিয়েই যেন নির্বাচনের ভাগ্য নির্ধারিত হওয়ার কথা। কিন্তু কানাডার মূলধারার রাজনীতি এভাবে চলে না।

একটি সংখ্যা আমাদের বাস্তবতায় ফিরিয়ে আনতে পারে। এবারের উপনির্বাচনে নিবন্ধিত ভোটার ছিলেন ৮৩ হাজারের বেশি, ভোট দিয়েছেন মাত্র ২২ হাজার ভোটার। এ আসনে বাংলাভাষী মানুষের সংখ্যা ৯ হাজারেরও কম, এবং তাঁদের সবাই ভোটারও নন। অর্থাৎ বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটার বাংলাভাষী নন।

ধর্মীয় হিসাবেও দেখা যায়, মুসলিম প্রায় ২০ হাজার, হিন্দু ৯ হাজারের কিছু বেশি। বাকি বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ খ্রিস্টানসহ অন্যান্য ধর্ম ও বিশ্বাসের। অর্থাৎ মুসলিম ও হিন্দু মিলিয়েও এই এলাকার মোট জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশের কম।

মসজিদে যেতে হবে, অবশ্যই যেতে হবে। মন্দিরেও যেতে হবে। গির্জায় যেতে হবে। কিন্তু শুধু ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ঘুরলেই একটি বহুজাতিক এলাকার নির্বাচনী প্রচারণা শেষ হয়ে যায় না। ভাড়াটে পরিবারটির কাছে যেতে হবে, ছোট ব্যবসায়ীর কাছে যেতে হবে, এমন মানুষটির কাছেও যেতে হবে যার বাংলাদেশের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই এবং ধর্ম নিয়েও কোনো আগ্রহ নেই। কারণ ভোটের দিন ব্যালটে কারও নামের পাশে লেখা থাকে না তিনি কোন জেলার, কোন ধর্মের কিংবা কোন কমিউনিটির মানুষ। সেখানে থাকে রাজনৈতিক দলের নাম এবং একজন প্রার্থীর নাম।

আরেকটি বিষয়ও আমার চোখে পড়েছে। ইংরেজিতে একটি পুরোনো প্রবাদ আছে, “A man is known by the company he keeps.” অর্থাৎ, “মানুষকে অনেক সময় তার সঙ্গীদের দিয়েও চেনা হয়।”

আমাদের দুই প্রার্থীর প্রচারণায় কিছু পরিচিত বাংলাদেশি মুখ তাঁদের ঘিরে থাকতে দেখা গেছে। অফিসে, সভা-সমাবেশে, হাঁটতে চলতে সবসময়। বাংলাদেশের রাজনীতিতে এটি খুব পরিচিত দৃশ্য। একজন প্রার্থী দাঁড়ালেই কয়েক ডজন মানুষ এমনভাবে তাঁকে ঘিরে রাখেন। কিন্তু কানাডার মূলধারার রাজনীতিতে এই দৃশ্য বিপজ্জনক। বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিভাজন আমরা স্যুটকেসে করে কানাডায়ও নিয়ে এসেছি। ধর্মীয় ও সাম্প্রদায়িক দূরত্বও পুরোপুরি যায়নি। আমাদের মধ্যে আঞ্চলিক বিদ্বেষ এখনো আছে। ব্যক্তিগত বিরোধ, সংগঠনের বিরোধ এসব তো আছেই। ফলে একজনের কাছে যিনি গ্রহণযোগ্য, অন্য অংশের কাছে তিনিই হয়তো অগ্রহণযোগ্য। তিনি প্রার্থীর খুব কাছে থাকলে তাঁর বিরোধীদের দূরে সরে যাওয়া স্বাভাবিক।

ভবিষ্যতে যারা মূলধারার রাজনীতিতে আসবেন, তাঁদের এই বিষয়টি খুব গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হবে। নিজের কমিউনিটির মানুষ অবশ্যই পাশে থাকবেন। কর্মী লাগবে, স্বেচ্ছাসেবক লাগবে, বন্ধু লাগবে। কিন্তু প্রচারণার চেহারা যেন কোনোভাবেই একটি গোষ্ঠী বা কয়েকটি পরিচিত মুখের দখলে চলে না যায়। যারা প্রার্থীকে খুব বেশি ‘আপন লোক’ বলে জাহির করতে চান, তাঁরা অনেক সময় একটু দূরে থেকে ভালোবাসলেই প্রার্থীর বেশি উপকার হবে।

সাম্প্রতিক একটি উদাহরণ তানভীর শাহনেওয়াজ। টরন্টোর Beaches-East York-এর উপনির্বাচনে তিনি ৫৫.৮ শতাংশ ভোট পেয়ে এমপি হয়েছেন। তিনি বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত, সেটি আমাদের গর্বের বিষয়। কিন্তু তাঁর প্রচারণা কিংবা অফিসকে বাংলাদেশি কিছু চেনামুখের আড্ডাখানায় পরিণত হতে দেখিনি। ভোটারদের কাছে তাঁর বড় পরিচয় ছিল দীর্ঘদিন ধরে এলাকার মানুষের সঙ্গে কাজ করা একজন পরিচিত মানুষ হিসেবে। এটাই মূলধারার রাজনীতি।

ফাতিমা শাবানের অফিসের চিত্রও ছিল অনেকটা এরকম। তিনি আরব বংশোদ্ভূত বলে সেখানে আরবরা, কিংবা তাঁর স্বামী আফগানিস্তানের বলে আফগানরা গিয়ে অফিস দখল করে বসে থাকেননি। সব কমিউনিটির মানুষ অবাধে গেছেন, কথা বলেছেন, কাজ সেরে চলে এসেছেন। মূলধারার রাজনীতির সৌন্দর্য এখানেই।

এই নির্বাচন আমাদের কমিউনিটিকে মূলধারার রাজনীতি সম্পর্কে অনেক কিছু শিখিয়েছে। ফেডারেল ও প্রাদেশিক দলের কাঠামো এক নয়, মনোনয়ন কীভাবে হয়, আসনভিত্তিক সংগঠন কীভাবে কাজ করে, জরিপ আর পর্যবেক্ষণ এক জিনিস নয়, আর কমিউনিটির ভেতরের জনপ্রিয়তা মানেই পুরো নির্বাচনী এলাকায় জনপ্রিয়তা নয়। এই শিক্ষাগুলোও এ নির্বাচনের অর্জন।

প্রার্থীদের পরিচিতি নিয়েও কথা আছে। আমাদের কমিউনিটির কতজন আহসানুল হাফিজকে সত্যিকার অর্থে চিনতেন, জানি না। আমি অন্তত তাঁর সম্পর্কে এত কিছু জানতাম না। এই নির্বাচন আমাদের একজন আহসানুল হাফিজকে আবিষ্কার করার সুযোগ দিয়েছে।

২০০২ সালে আন্তর্জাতিক ছাত্র হিসেবে কানাডায় আসা এক তরুণ ইউনিভার্সিটি অব উইন্ডসরে পড়ার সময় Domino’s Pizza-তে ডেলিভারির কাজ শুরু করেছিলেন। সেই তরুণ আজ অন্টারিওজুড়ে ৩০টি Domino’s Pizza স্টোর পরিচালনা করেন। এতগুলো প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করেছেন। নিজের ব্যবসার পাশাপাশি স্কুল, যুব কার্যক্রম, খেলাধুলা, দাতব্য প্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন কমিউনিটি কার্যক্রমেও সহযোগিতা করেছেন।

তারপর রাজনীতিতে এসে তিনি যে কাজটি করেছেন, সেটিও কম বড় নয়। অন্টারিও লিবারেল পার্টির মনোনয়ন লড়াইয়ে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন ফেডারেল এমপি Nate Erskine-Smith। এমন একজন প্রতিষ্ঠিত রাজনীতিককে হারিয়ে আহসানুল দলের মনোনয়ন জিতেছেন।

মূল নির্বাচনে আহসানুল ৬ হাজার ৬৭৪ ভোট পেয়েছেন। তিনি আসন জিততে পারেননি, কিন্তু আগের প্রাদেশিক নির্বাচনের তুলনায় তিনি লিবারেলদের ভোট প্রায় সাত শতাংশ পয়েন্ট বাড়িয়ে দলকে তৃতীয় স্থান থেকে দ্বিতীয় স্থানে এনেছেন। রাজনৈতিক দল শুধু কে জিতল তা দেখে না; কে নতুন ভোট আনল, কে কঠিন আসনে দলের অবস্থান শক্ত করল, সেটিও দেখে।

তাই আহসানুল হাফিজকে আমি এই নির্বাচনের একজন পরাজিত মানুষ হিসেবে দেখতে রাজি নই। তাঁর সামনে এখন রাজনীতির একটি নতুন দরজা খুলেছে। আমাদের তরুণদের জন্যও তাঁর গল্পটি অনুপ্রেরণার।

ডা. নুর তরুনের গল্পটিও গর্বের। তিনি টরন্টোতে ছয়টি মেডিকেল ক্লিনিক ও একটি বিশেষায়িত চিকিৎসাকেন্দ্র পরিচালনা করেন এবং তাঁর প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে প্রতিদিন শত শত মানুষ চিকিৎসাসেবা পান। রাজনীতির মাঠও তাঁর জন্য একেবারে নতুন নয়। ২০২৫ সালের ফেডারেল নির্বাচনে এ আসন থেকেই কনজারভেটিভ পার্টির প্রার্থী হয়ে তিনি ১৬ হাজার ৬৫২ ভোট পেয়েছিলেন। এবার একই আসনের প্রাদেশিক উপনির্বাচনে অন্টারিও পিসি পার্টির মনোনয়ন পেয়ে তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন।

তাঁর পক্ষে মাঠে নেমে এলেন অন্টারিওর সবচেয়ে ক্ষমতাবান ব্যক্তি প্রিমিয়ার ডাগ ফোর্ড। এলেন মন্ত্রিসভার সদস্যরা, এমপিপিরা, দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা। একজন প্রার্থী তাঁর দলের কাছে কতটা গুরুত্ব পেলে প্রিমিয়ার নিজে তাঁর সঙ্গে বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোট চাইতে পারেন, সেটি আমরা চোখের সামনে দেখলাম।

ডাগ ফোর্ডের সঙ্গে ডা. তরুন যখন ডোর নকিংয়ে হেঁটেছেন, অনেক ছবিতে তাঁদের দেখে আমার মনে হয়েছে দুই ঘনিষ্ঠ বন্ধু, কখনো যেন দুই ভাই। তরুন তাঁকে মসজিদে মসজিদে নিয়ে গেছেন, মন্দিরে মন্দিরে নিয়ে গেছেন। পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন এলাকার বিভিন্ন মানুষের সঙ্গে। বোঝানোর চেষ্টা করেছেন এই বহুজাতিক কমিউনিটির স্পন্দন।

নির্বাচনের ফল অবশ্যই তাঁর প্রত্যাশামতো হয়নি। বরং ২০২৫ সালে পিসি পার্টি এই আসনে যে ৩০.৬৫ শতাংশ ভোট পেয়েছিল, এবার তরুন পেয়েছেন ২৩.৩৭ শতাংশ। এত বড় সরকারি শক্তি পাশে থাকার পরও কেন ভোট কমেছে, সেটি তাঁর দলকে অবশ্যই গভীরভাবে বিশ্লেষণ করতে হবে।

কিন্তু এখানেই যদি তরুনের গল্প শেষ করে দিই, তাহলে তাঁর অর্জনের বড় অংশটি বাদ পড়ে যাবে। আমার চোখে ডা. তরুন এখন এমন একটি জায়গায় পৌঁছে গেছেন, যেখানে Queen’s Park-এ যেতে তাঁর আর MPP-র টিকিটের প্রয়োজন হবে না। দরজাটি তাঁর জন্য এখন খোলা।

আমার বিশ্বাস, এই এলাকার এমন অনেক বিষয় সামনে আসতে পারে, যেগুলো নিয়ে এমপিপি ফাতিমা শাবানকে বিরোধী দলের বেঞ্চ থেকে চিঠি লিখতে হবে, অপেক্ষা করতে হবে। একই বিষয় হয়তো ডা. তরুন একটি ফোনকলেই প্রিমিয়ারের দপ্তর কিংবা সংশ্লিষ্ট কোনো মন্ত্রীর টেবিলে পৌঁছে দিতে পারবেন। নির্বাচনে জয়ী না হয়েও তিনি যে রাজনৈতিক যোগাযোগ ও পুঁজি তৈরি করেছেন, সেটি আমার চোখে বিশাল অর্জন। তাই তাঁর হারকেও আমি শুধু হার হিসেবে দেখি না।

তবে এই অগ্রগতি দেখে আমাদের আত্মতুষ্ট হওয়ার সুযোগ নেই। বরং এই নির্বাচন আমাদের দুর্বলতাগুলোও দেখিয়েছে। আমরা এখনো নিজেদের ছোট ছোট বৃত্তের মধ্যে বেশি ঘুরি। প্রার্থীকে ঘিরে সর্বক্ষণ বসে থাকতে ভালোবাসি। বাংলাদেশের আঞ্চলিকতা, দলাদলি এবং ধর্মীয় বিভাজনকেও কানাডার নির্বাচনী মাঠে টেনে আনি। অথচ একজন প্রার্থীর প্রথম পরিচয় হতে হবে তাঁর নির্বাচনী এলাকা, দ্বিতীয় পরিচয় তাঁর রাজনৈতিক দল, তারপর অন্য সব পরিচয়। এটি যত দ্রুত আমরা বুঝব, তত দ্রুত মূলধারার রাজনীতিতে জায়গা করে নিতে পারব।

সব হার পরাজয় নয়। কখনো কখনো পরাজয়ের মধ্যেই পরবর্তী বিজয়ের পথ তৈরি হয়। আজ আহসানুল হাফিজ এবং ডা. নুর তরুন Queen’s Park-এ যেতে পারেননি। কিন্তু তাঁরা দুজনই এমন একটি পথের ওপর দাঁড়িয়ে আছেন, যেখান থেকে আবার শুরু করা যায়। ভুল থেকে শেখা যায়, পরিচিত বলয় ভাঙা যায়, আরও বড় জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছানো যায়। তাঁদের এই পথচলা হয়তো আগামী দিনের আরও অনেককে সাহস দেবে রাজনীতির বৃহত্তর পরিসরে পা বাড়াতে।

এনএন/ ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

Back to top button