
কথিত আছে, মোগল সম্রাট জাহাঙ্গীর একবার বঙ্গদেশে এসেছিলেন। তাঁর আগমন উপলক্ষে সুবা বাংলার শাসক ঢাকাজুড়ে এক বিরাট আয়োজন করেছিলেন। সম্রাটকে স্বাগত জানাতে সাজানো হয়েছিল নগর, বন্দর, প্রাসাদ ও গুরুত্বপূর্ণ পথ। সে সময় বৈদ্যুতিক বাতির যুগ আসেনি। তবু সন্ধ্যা নামতেই প্রদীপ, মশাল এবং রঙিন কাচে ঢাকা তেলের বাতির আলোয় বদলে গিয়েছিল ঢাকার চেহারা। শহরের সেই আলোকসজ্জা এসে মিশেছিল বুড়িগঙ্গার জলে। নদীর কালো পানিতে হাজারো আলো প্রতিফলিত হয়ে এমন এক দৃশ্যের সৃষ্টি করেছিল, যেন পুরো নগরী তার সমস্ত সৌন্দর্য নিয়ে অপেক্ষা করছে মোগল সাম্রাজ্যের অধিপতির জন্য।
রাতের বুড়িগঙ্গায় এসে নোঙর করল সম্রাট জাহাঙ্গীরের রাজকীয় নৌবহর। বহরের মাঝখানে বিশাল রাজকীয় বজরা, তাকে ঘিরে ছোট-বড় অসংখ্য নৌকা। কোনো নৌকায় পাইক-পেয়াদা ও সশস্ত্র প্রহরী, কোনো নৌকায় রাজকর্মচারী ও দরবারের লোকজন, আবার কোথাও সম্রাটের দীর্ঘ সফরের প্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী ও অন্যান্য আয়োজন। রাজকীয় বজরাটিও সাজানো হয়েছিল সম্রাটের মর্যাদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে। চারদিকে বাতি ও মশালের আলো, নদীর দুই তীরে উৎসবের সাজ, তার মাঝখানে বিশাল নৌবহর। সেদিন রাতের বুড়িগঙ্গা যেন শুধু একটি নদী ছিল না, হয়ে উঠেছিল সম্রাটকে বরণ করে নেওয়ার এক বিশাল মঞ্চ।
সম্রাট জাহাঙ্গীর মুগ্ধ হয়ে চারদিকে তাকিয়ে রইলেন। সাম্রাজ্যের কত শহরই তো তিনি দেখেছেন। আগ্রা দেখেছেন, লাহোর দেখেছেন, কাশ্মীরের সৌন্দর্যও তাঁকে মুগ্ধ করেছে। কিন্তু নদীকে ঘিরে এমন আয়োজন হয়তো তাঁর কাছে ছিল নতুন। সুবা বাংলার শাসকের অভ্যর্থনা, ঢাকার আলোকসজ্জা, নদীর হাওয়া, সংগীত আর মানুষের উল্লাসে রাতটি যেন উৎসবের রূপ নিয়েছিল। বুড়িগঙ্গায় তখন পূর্ণ জোয়ার। নদীর দুই তীরের বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে ভরা। যত দূর চোখ যায়, অন্ধকারের মধ্যে শুধু পানি আর সেই পানির ওপর আলোয় সজ্জিত নৌকার সারি। গভীর পানিতে নিশ্চিন্তে নোঙর করা রাজকীয় বজরায় দীর্ঘ সফরের ক্লান্তি শেষে সম্রাট বিশ্রাম নিতে গেলেন।
রাত কেটে গেল। সম্রাট যখন ঘুমিয়ে ছিলেন, তখন নিঃশব্দে বদলে যাচ্ছিল তাঁর চারপাশের দৃশ্য। বঙ্গদেশের নদীর চিরাচরিত নিয়মে জোয়ারের পানি ধীরে ধীরে নেমে গেল। পানির সঙ্গে সঙ্গে রাজকীয় বজরার বহরও নিচে নেমে এলো। রাতের যে বিস্তীর্ণ জলরাশি আর আলোকসজ্জা দেখে সম্রাট মুগ্ধ হয়েছিলেন, ভোর হতে হতে সেই দৃশ্য সম্পূর্ণ বদলে গেল।
সকালে ঘুম থেকে উঠে সম্রাট বজরার বাইরে এসে চারদিকে তাকিয়ে বিস্মিত হয়ে গেলেন। রাতে যে দৃশ্য দেখে তিনি ঘুমাতে গিয়েছিলেন, সকালের দৃশ্য তার সম্পূর্ণ বিপরীত। ডানে তাকিয়ে দেখলেন মাটি, বাঁয়ে তাকিয়েও মাটি। রাতের সেই বিস্তীর্ণ নদী যেন কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তার চেহারা বদলে ফেলেছে। ভাটার টানে সরে গেছে পানি, জেগে উঠেছে দুই পাড়ের মাটি।
সম্রাট প্রথমে বুঝতে পারলেন না, রাতে তাঁর নৌবহর অন্য কোথাও নিয়ে যাওয়া হয়েছে কি না। তিনি উজিরকে ডেকে জানতে চাইলেন, বহর কি আগের জায়গাতেই আছে, নাকি রাতে স্থান পরিবর্তন করা হয়েছে? উজির জানালেন, ‘বাদশাহ নামদার, আমরা আগের জায়গাতেই আছি।’ জাহাঙ্গীর বিস্মিত হয়ে জানতে চাইলেন, তাহলে চারদিকে এত মাটি এলো কোথা থেকে?
উজির তখন বঙ্গদেশের নদ-নদীর জোয়ার-ভাটার স্বভাব সম্রাটকে বুঝিয়ে বললেন। তিনি জানালেন, রাতে যখন রাজকীয় বহর এখানে এসে নোঙর করেছিল, তখন ছিল জোয়ার। নদীতে পানি ছিল অনেক ওপরে। আর এখন ভাটা চলছে। পানি নেমে যাওয়ায় দুই পাড়ের মাটি দৃশ্যমান হয়েছে।
সম্রাট জাহাঙ্গীর বিস্ময় ও কৌতূহল নিয়ে উজিরের কথা শুনলেন। কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে একই জায়গার এমন বিপরীত চেহারা তাঁর কাছে ছিল এক অচেনা অভিজ্ঞতা। রাতে যেখানে অথই পানি, সকালে সেই নদী সঙ্কুচিত হয়ে আসে। মানুষের ক্ষমতার বাইরে প্রকৃতি এখানে নিজের নিয়মে প্রতিদিন ভূমি আর পানির সীমানা বদলে দেয়।
সব শুনে সম্রাট কিছুক্ষণ নীরব হয়ে রইলেন। তারপর উজিরকে বললেন, ‘যে দেশের মাটির ওপর প্রকৃতির এমন প্রভাব, সে দেশের মানুষের ওপর প্রকৃতির না জানি কেমন প্রভাব, আমি আর জানতে চাই না।’ এরপর তিনি নির্দেশ দিলেন, ‘উজির, বজরা ঘোরাও।’
এই কাহিনির সঙ্গে আরও একটি ঘটনা জড়িয়ে আছে। বলা হয়, সেদিন ঢাকার নাম পরিবর্তন করে সম্রাটের নামে ‘জাহাঙ্গীরনগর’ করার আয়োজনও ছিল। কিন্তু সম্রাট তীরে না নামায় এবং বঙ্গদেশের মাটি স্পর্শ না করেই ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় সেই নামকরণের আনুষ্ঠানিকতা আর হয়নি।
তবে ইতিহাসের নথিতে ‘জাহাঙ্গীরনগর’ নামটি হারিয়ে যায়নি। ১৬১০ সালে সুবা বাংলার রাজধানী রাজমহল থেকে ঢাকায় স্থানান্তরের পর সুবাদার ইসলাম খান চিশতি সম্রাট জাহাঙ্গীরের সম্মানে ঢাকার নাম রাখেন ‘জাহাঙ্গীরনগর’। নামটি অবশ্য স্থায়িত্ব লাভ করেনি। কয়েক শতাব্দী পর সেই ঐতিহাসিক নামটি ফিরে আসে সাভারে প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচয়ে। ১৯৭০ সালে যাত্রা শুরু করা প্রতিষ্ঠানটির নাম ছিল ‘জাহাঙ্গীরনগর মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়’; স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালে ‘মুসলিম’ শব্দটি বাদ দিয়ে নাম হয় ‘জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়’।
এ কাহিনিটির তাৎপর্য শুধু নামকরণের ইতিহাসে আটকে নেই। সম্রাট জাহাঙ্গীরের সেই সফরের কাহিনিতে বঙ্গদেশের প্রকৃতি এবং সেই প্রকৃতির প্রভাবে বাংলার মানুষের চরিত্রের যে ইঙ্গিত পাওয়া যায়, ইতিহাসের দিকে তাকালে তাকে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। সময়ের সঙ্গে বাঙালির মন ও মানসিকতার বদল আমরা বারবার দেখেছি। নদীর জোয়ার-ভাটার মতোই আমাদের মনও বদলায়। সকালে যে বিশ্বাসে আমরা অটল থাকি, বিকেলেই তার বিপরীত অবস্থানে গিয়ে দাঁড়াই।
দ্রষ্টব্য: গল্পটি ঐতিহাসিক জনশ্রুতি ও বিভিন্ন ঐতিহাসিক বিবরণ অবলম্বনে।
এনএন/ ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬







