
শিশুর ছবি আঁকা শেখার জায়গা হওয়ার কথা ছিল আনন্দ আর সৃজনশীলতার। রং, তুলি আর সাদা ক্যানভাসের মধ্যে নতুন কিছু শেখার কথা। কিন্তু পিকারিংয়ের একটি বাড়িতে ছবি আঁকার শিক্ষা দেওয়া এক ব্যক্তিকে ঘিরে এখন যে অভিযোগ সামনে এসেছে, তা উদ্বেগ ছড়িয়েছে অভিভাবকদের মধ্যে। পুলিশ বলছে, ওই ব্যক্তি শুধু দুই কন্যাশিশুকে একাধিকবার যৌন নিপীড়ন করেছেন এমন অভিযোগই নয়, তাঁর কাছে ছবি আঁকা শিখেছে এমন আরও শিশু ভুক্তভোগী হয়ে থাকতে পারে বলেও আশঙ্কা করছেন তদন্তকারীরা।
পিকারিং ও টরন্টোতে দুই কন্যাশিশুকে একাধিকবার যৌন নিপীড়নের অভিযোগে ৬৩ বছর বয়সী ফারুক দেওয়ানকে গ্রেপ্তার করেছে ডারহাম রিজিওনাল পুলিশ। তাঁর বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের ১১টি এবং ১৬ বছরের কম বয়সী শিশুর সঙ্গে যৌন হস্তক্ষেপের আরও ১১টি অভিযোগ আনা হয়েছে। অর্থাৎ দুই শিশুকে ঘিরেই তাঁর বিরুদ্ধে মোট ২২টি অভিযোগ দায়ের হয়েছে।
পুলিশ জানায়, ২০২৬ সালের জুলাইয়ে ডারহাম রিজিওনাল পুলিশের স্পেশাল ভিকটিমস ইউনিট এ বিষয়ে তদন্ত শুরু করে। অভিযোগ অনুযায়ী, ফারুক দেওয়ান দুই শিশুর পরিবারেরই পরিচিত ছিলেন। সেই পরিচয়ের সূত্র ধরে তিনি দুই পরিবারের বাড়িতে যাতায়াত করতেন। পুলিশের অভিযোগ, সেখানেই তিনি শিশুদের অনুপযুক্তভাবে স্পর্শ করেন।
বিস্তারিত তদন্তের পর পুলিশ জানতে পারে, ঘটনাগুলো একদিন বা দুদিনের নয়। ২০২৫ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত প্রায় নয় মাসের মধ্যে দুই শিশুকে বহুবার যৌন নিপীড়ন করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
তদন্তের একপর্যায়ে গত আগস্টে পুলিশ ফারুক দেওয়ানকে অ্যাজাক্সে খুঁজে পায় এবং তাঁকে গ্রেপ্তার করে। তাঁকে জামিন শুনানির জন্য আটক রাখা হয়। কিন্তু গ্রেপ্তারের পরই তদন্তকারীদের উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
ডারহাম পুলিশ জানিয়েছে, ফারুক দেওয়ান পিকারিংয়ের একটি বাড়িতে শিশুদের ছবি আঁকা শেখাতেন। ফলে তাঁর সংস্পর্শে আরও কত শিশু এসেছে, সেই প্রশ্ন এখন তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। পুলিশ প্রকাশ্যে তাঁর ছবি প্রকাশ করেছে এবং জানিয়েছে, আরও কেউ তাঁর হাতে যৌন নিপীড়নের শিকার হয়ে থাকলে কিংবা কারও কাছে এ বিষয়ে তথ্য থাকলে যেন পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করেন।
ফারুক দেওয়ানের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ আদালতে এখনো প্রমাণিত হয়নি। কিন্তু ঘটনাটি বৃহত্তর টরন্টোর বাংলাদেশি ও দক্ষিণ এশীয় কমিউনিটিতে শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে পুরোনো একটি প্রশ্ন আবার সামনে নিয়ে এসেছে। কারণ শিক্ষা, টিউশন কিংবা ধর্মীয় ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের সূত্র ধরে পরিবারের আস্থা অর্জনের পর শিশুদের যৌন নিপীড়নের ঘটনা এ অঞ্চলে এর আগেও সামনে এসেছে।
বাংলাদেশি কমিউনিটির বহুল আলোচিত তেমন একটি ঘটনা ইউসুফ আলী তালুকদারকে ঘিরে। স্কারবরোর ড্যানফোর্থ এলাকায় ঢাকা লার্নিং সেন্টারে শিক্ষকতা করা ইউসুফ আলী তালুকদার ২০১০ সালের ৩১ মে ১৪ বছরের কম বয়সী এক ছাত্রীকে যৌনভাবে স্পর্শ করার ঘটনায় অন্টারিও আদালতে দোষী সাব্যস্ত হন। আদালতের নথি অনুযায়ী, ভুক্তভোগী শিশুটির বয়স ছিল ১৩ বছর এবং সে তাঁর কাছে পড়াশোনা করত। আদালত দেখতে পান, প্রায় এক বছর ধরে ধাপে ধাপে শিশুটির সঙ্গে শারীরিক সীমারেখা ভাঙার চেষ্টা করেছিলেন তালুকদার।
সে মামলার বিবরণ আরও উদ্বেগজনক। আদালতের নথি অনুযায়ী, শিশুটির বাবা মারা যাওয়ার পর তার দুর্বল মানসিক অবস্থার সুযোগ নেওয়া হয়েছিল। শিক্ষক এবং কমিউনিটির পরিচিত ব্যক্তি হিসেবে তালুকদারের ওপর পরিবারের আস্থা ছিল। শ্রেণির শিশুরা তাঁকে ‘আঙ্কেল’ বলেও ডাকত। আদালত পরে তাঁর আচরণকে একজন শিক্ষক হিসেবে পাওয়া আস্থা ও অবস্থানের অপব্যবহার হিসেবে দেখেন।
২০০৭ সালের ২৪ নভেম্বরের ঘটনার পর শিশুটি বিষয়টি পরিবারকে জানায়। পরদিন পরিবার তালুকদারের মুখোমুখি হলে আদালতের নথি অনুযায়ী তিনি নিজের আচরণের জন্য ক্ষমা চান। বিষয়টি যেন পুলিশের কাছে না যায়, সে চেষ্টাও হয়েছিল। কিন্তু পরিবার শেষ পর্যন্ত পুলিশের কাছে যায়।
২০১০ সালে তালুকদারকে ছয় মাসের কারাদণ্ড এবং তিন বছরের প্রবেশন দেওয়া হয়। পরে ২০১৩ সালে Ontario College of Teachers তাঁর শিক্ষকতার সনদ বাতিল করে।
ফারুক দেওয়ানের বর্তমান মামলার সঙ্গে ইউসুফ তালুকদারের সেই পুরোনো ঘটনার বিচারিক বা ব্যক্তিগত কোনো যোগসূত্র নেই। তবে দুটি ঘটনায় একটি জায়গায় মিল রয়েছে। শিশুদের সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি হয়েছিল শিক্ষা ও পরিবারের পরিচয়ের সূত্র ধরে। শিক্ষক, টিউটর, প্রশিক্ষক, আত্মীয় কিংবা পারিবারিক বন্ধু স্বাভাবিকভাবেই শিশুর কাছে যাওয়ার সুযোগ পান। অপরিচিত কাউকে নিয়ে পরিবার সাধারণত সতর্ক থাকে, কিন্তু পরিচিত ও আস্থাভাজন কারও ক্ষেত্রে সেই সতর্কতার দেয়াল অনেকটাই নেমে যায়। সেই সুযোগের অপব্যবহার হলে অনেক সময় পরিবার দীর্ঘদিন কিছু বুঝতেই পারে না।
দুটি ঘটনার একটি সাধারণ দিক হচ্ছে, শিশুর চারপাশে থাকা বিশ্বাসের বৃত্ত। শিক্ষক, টিউটর কিংবা পরিবারের পরিচিত ব্যক্তি স্বাভাবিকভাবেই শিশুর কাছে যাওয়ার সুযোগ পান। সেই সুযোগের অপব্যবহার হলে অনেক সময় পরিবার দীর্ঘদিন কিছু বুঝতেই পারে না।
Ontario College of Teachers-ও শিক্ষকদের যৌন অসদাচরণ সম্পর্কিত নির্দেশিকায় সতর্ক করে বলেছে, বাইরে থেকে নিরীহ বলে মনে হওয়া কিছু আচরণও পরবর্তীতে যৌন নির্যাতনের আগে ধাপে ধাপে সীমারেখা ভাঙার প্রক্রিয়া বা ‘গ্রুমিং’ (grooming) হিসেবে চিহ্নিত হতে পারে।
অন্টারিওতে শিশু নির্যাতনের সন্দেহ হলে বিষয়টি শুধু পরিবারের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রদেশের আইন অনুযায়ী, কারও কাছে যুক্তিসঙ্গতভাবে মনে হলে কোনো শিশু নির্যাতিত হচ্ছে কিংবা সুরক্ষার প্রয়োজন রয়েছে, তাঁকে তা চিলড্রেনস এইড সোসাইটিকে (Children’s Aid Society) জানাতে হবে। শিক্ষক, চিকিৎসক, সমাজকর্মীসহ শিশুদের সঙ্গে পেশাগতভাবে কাজ করেন এমন ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও এই দায়িত্ব প্রযোজ্য।
ফারুক দেওয়ানের ঘটনায় সেই কারণেই পুলিশের আবেদনটি বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। তদন্তকারীরা শুধু দুই শিশুকে ঘিরে দায়ের হওয়া ২২টি অভিযোগের তদন্তেই থেমে নেই। ছবি আঁকার শিক্ষার্থী হিসেবে তাঁর সংস্পর্শে আসা অন্য শিশুদের মধ্যেও কেউ একই ধরনের ঘটনার শিকার হয়েছে কি না, সেটিও জানতে চাইছেন তাঁরা।
এ ঘটনা সম্পর্কে কারও কাছে কোনো তথ্য থাকলে ডারহাম রিজিওনাল পুলিশের স্পেশাল ভিকটিমস ইউনিটের ডিটেকটিভ কনস্টেবল গোমেজের সঙ্গে ১-৮৮৮-৫৭৯-১৫২০ নম্বরের ৫৩৯১ এক্সটেনশনে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে।
পরিচয় গোপন রেখে তথ্য দিতে চাইলে ডারহাম রিজিওনাল ক্রাইম স্টপার্সের ১-৮০০-২২২-TIPS (৮৪৭৭) নম্বরেও যোগাযোগ করা যাবে। তথ্যদাতা নগদ পুরস্কার পাওয়ার যোগ্য হতে পারেন।
ছবি ও তথ্যসূত্র:
ডারহাম রিজিওনাল পুলিশ







