সম্পাদকের পাতা

মৃত্যুদণ্ডের রায় মাথায় নিয়ে ৩৫ বছর ধরে আমেরিকার জেলে সৈয়দ রব্বানী

নজরুল মিন্টো

টেক্সাসের ডিকিনসনের একটি কারা চিকিৎসাকেন্দ্র। সেখানে একটি বিছানায় পড়ে আছেন ষাটোর্ধ্ব বাংলাদেশি সৈয়দ মোহাম্মদ রব্বানী। ২৩ বছর বয়সে উচ্চশিক্ষার জন্য বাংলাদেশ থেকে আমেরিকায় এসেছিলেন তিনি। এরপর তাঁর জীবনের প্রায় চার দশক কেটে গেছে কারাগারের চার দেয়ালের ভেতর।

গল্পটি শুরু ১৯৮৭ সালে হিউস্টনে। Quick-n-Easy নামের একটি কনভেনিয়েন্স স্টোরে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন ২৮ বছর বয়সী বাংলাদেশি অভিবাসী মোহাম্মদ জাকির হাসান। হত্যার অভিযোগ ওঠে তাঁরই স্বদেশি সৈয়দ রব্বানীর বিরুদ্ধে। পরের বছর হ্যারিস কাউন্টির একটি জুরি তাঁকে ক্যাপিটাল মার্ডার বা মৃত্যুদণ্ডযোগ্য হত্যার দায়ে দোষী সাব্যস্ত করে। মাত্র ২৩ বছর বয়সে তাঁর বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় হয়। ১৯৯২ সালে টেক্সাস কোর্ট অব ক্রিমিনাল আপিলসে প্রথম আপিলেও সেই দণ্ড বহাল থাকে। ১৯৯৩ সালে তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের তারিখও নির্ধারণ করা হয়েছিল।

এরপর শুরু হয় জীবন বাঁচানোর আইনি লড়াই। ১৯৯৪ সালে রব্বানীর আইনজীবী তাঁর মৃত্যুদণ্ডের সাংবিধানিক বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে রিট আবেদন করেন। কয়েক মাসের মধ্যেই মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা তাঁকে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের জন্য মানসিকভাবে অযোগ্য বলে মত দেন। কিন্তু আবেদনটি আর এগোয়নি। প্রতিরক্ষা আইনজীবী, রাষ্ট্রপক্ষ ও আদালতের বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যর্থতায় সেটি প্রায় ২৮ বছর অমীমাংসিত পড়ে থাকে।

অবশেষে ২০২২ সালে রব্বানীর আবেদনটি আবার সামনে আসে এবং পাঠানো হয় টেক্সাস কোর্ট অব ক্রিমিনাল আপিলসে। কিন্তু তত দিনে ২৩ বছরের সেই তরুণের শরীর ভেঙে পড়েছে। চোখে ছানি পড়ে তিনি প্রায় দৃষ্টিহীন হয়ে গিয়েছিলেন। ২০২২ সালের স্ট্রোকের পর তাঁর চলাফেরা ও যোগাযোগের ক্ষমতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, মস্তিষ্কেও স্থায়ী ক্ষতি হয়। এর সঙ্গে ছিল গুরুতর মানসিক রোগ।

২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে আসে বহু প্রতীক্ষিত সিদ্ধান্ত। টেক্সাসের সর্বোচ্চ ফৌজদারি আদালত রব্বানীর মৃত্যুদণ্ড বাতিল করে দেয়। তবে হত্যার মামলায় তাঁর দোষী সাব্যস্ত হওয়ার রায় বাতিল হয়নি। দোষী সাব্যস্ত হওয়ার রায় বহাল থাকে, বাতিল হয় কেবল মৃত্যুদণ্ডের সাজা। এরপর ১৪ নভেম্বর তাঁর সাজা পরিবর্তন করে প্যারোলের সুযোগসহ যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

ঠিক এই সময়েই প্রায় তিন দশক বিচ্ছিন্ন থাকা পরিবারের সঙ্গে আবার যোগাযোগ তৈরি হয় রব্বানীর। ১৯৯৫ সালে বাবার মৃত্যুর পর বাংলাদেশের পরিবারের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। ২০২৩ সালে ছোট ভাই সৈয়দ ফাসাইনি ইন্টারনেটে বড় ভাইয়ের খোঁজ করতে গিয়ে রব্বানীর মামলা নিয়ে প্রকাশিত একটি সংবাদ প্রতিবেদন পান। সেখান থেকেই পরিবার জানতে পারে, তিনি এখনও বেঁচে আছেন। পরে পিরোজপুর জেলার পশ্চিম শিকারপুর থেকে বিচারকের কাছে চিঠি লিখে ফাসাইনি জানান, ভাইকে মুক্তি দেওয়া হলে পরিবার তাঁকে গ্রহণ করবে এবং তাঁর দেখাশোনা করবে। প্রায় তিন দশকের বিচ্ছেদের পর পরিবারের চাওয়া ছিল একটাই, জীবনের শেষ সময়ে মানুষটিকে নিজেদের কাছে ফিরিয়ে নেওয়া।

কিন্তু সেই আশা পূরণ হয়নি। ২০২৬ সালের জুনে হিউস্টন ক্রনিকল জানায়, রব্বানীর প্যারোল আবেদন প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। তাঁর আইনজীবী বেন উলফের ভাষ্য অনুযায়ী, অভিবাসনগত অবস্থানের কারণে বিশেষ চিকিৎসাজনিত মুক্তির সুযোগও তাঁর নেই। বর্তমানে ডিকিনসনের ক্যারল ইয়াং ইউনিটে (Carole Young Unit) বন্দি রব্বানী হসপিস সেবা পাচ্ছেন।

মৃত্যুদণ্ডের রায় তাঁর মাথার ওপর আর নেই, কিন্তু কারাগারের দরজাও খোলেনি। একটি আপিলের নিষ্পত্তি হতে লেগেছে প্রায় ২৮ বছর। তত দিনে হারিয়ে গেছে একজন মানুষের যৌবন, ভেঙে পড়েছে শরীর। সেই হারিয়ে যাওয়া সময়ের দায় কে নেবে?

তথ্যসূত্র:
The Texas Tribune
Houston Chronicle


Back to top button
🌐 Read in Your Language