সম্পাদকের পাতা

তিন দিনের শুল্ক বিরতিতে যুক্তরাষ্ট্র-কানাডার প্রাথমিক বাণিজ্য সমঝোতা

নজরুল মিন্টো

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নতুন শুল্ক তিন দিনের জন্য স্থগিত করেছেন। আজ থেকে কানাডার প্রায় ২৮ বিলিয়ন কানাডীয় ডলারের পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নতুন ৫০ শতাংশ শুল্ক কার্যকর হওয়ার কথা ছিল। সীমান্তের দুই পাশে ব্যবসায়ী ও রপ্তানিকারকেরা যখন অতিরিক্ত খরচ এবং নতুন অনিশ্চয়তা সামাল দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, ঠিক সেই মুহূর্তে মঙ্গলবার রাত ১০টা ১৫ মিনিটে ট্রাম্প স্থগিতাদেশের ঘোষণা দেন। কারণ তাঁর ভাষায়, কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্র একটি ‘DEAL’-এ পৌঁছেছে।

তবে এই সাময়িক বিরতি বাণিজ্যযুদ্ধের অবসান নয়। বরং আরও কঠিন দর-কষাকষির জন্য পাওয়া কিছুটা সময়। ট্রাম্প নিজেই বলেছেন, প্রয়োজনীয় নথিপত্র এখনো চূড়ান্ত হয়নি। প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির বক্তব্যও অনেক বেশি সতর্ক। তাঁর ভাষায়, “উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে”, তবে গুরুত্বপূর্ণ কাজ এখনো বাকি। অর্থাৎ ট্রাম্প যেখানে চুক্তি হয়ে গেছে বলে ঘোষণা দিচ্ছেন, অটোয়া সেখানে এখনো বিষয়টিকে চলমান আলোচনা হিসেবেই দেখছে।

এর মধ্যেই কানাডার ওপর বিদ্যমান শুল্কের চাপও বহাল রয়েছে। নতুন ৫০ শতাংশ শুল্ক ইলেকট্রনিক সামগ্রী, দুগ্ধজাত পণ্য, অ্যালকোহলসহ বহু কানাডীয় পণ্যের ওপর পড়ার কথা ছিল। এর বাইরে কানাডীয় গাড়ির ওপর ২৫ শতাংশ, ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়ামের ওপর ৫০ শতাংশ এবং বিভিন্ন বনজ পণ্যের ওপর ১০ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত মার্কিন শুল্ক আগে থেকেই কার্যকর রয়েছে।

এবারের নতুন শুল্ক আরোপের উদ্যোগে ট্রাম্প প্রশাসন প্রায় শতবর্ষ পুরোনো Tariff Act-এর Section 338 ব্যবহার করেছে। এই বিধানটি এর আগে কখনো এভাবে প্রয়োগ করা হয়নি। কানাডার বিরুদ্ধে শুল্কের চাপ বাড়াতে ওয়াশিংটনের এই পদক্ষেপ দুই দেশের দীর্ঘদিনের বাণিজ্য সম্পর্ককে এমন এক জায়গায় নিয়ে গেছে, যেখানে প্রতিটি নতুন সিদ্ধান্তের প্রভাব সীমান্তের দুই পাশেই পড়ছে।

সবচেয়ে বেশি চাপের মধ্যে রয়েছে অন্টারিও। কানাডার গাড়ি ও ইস্পাত শিল্পের বড় অংশ এই প্রদেশে কেন্দ্রীভূত। মার্কিন বাজারনির্ভর কারখানা, যন্ত্রাংশ সরবরাহকারী এবং ছোট-মাঝারি প্রতিষ্ঠানগুলো কয়েক মাস ধরেই অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে। ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো বলছে, তিন দিনের বিরতি কিছুটা স্বস্তি দিলেও স্থায়ী সমাধান ছাড়া বিনিয়োগ, উৎপাদন ও কর্মসংস্থান নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন। শুল্ক কার্যকর হওয়ার আগেই কিছু কানাডীয় সরবরাহকারী মার্কিন ক্রেতার অর্ডার কমে যাওয়ার প্রভাব দেখতে শুরু করেছে।

তবে এই নতুন ৫০ শতাংশ শুল্কের আওতায় পড়া পণ্য যুক্তরাষ্ট্রে কানাডার মোট রপ্তানির প্রায় ৫ শতাংশ। নির্দিষ্ট শিল্প ও প্রতিষ্ঠানের জন্য আঘাত গুরুতর হলেও শুধু এই শুল্ক দিয়েই কানাডার অর্থনীতিকে অচল করে দেওয়া সম্ভব নয়। কানাডার অর্থনীতির আকার, প্রাকৃতিক সম্পদ, জ্বালানি সরবরাহ, বহুমুখী শিল্পভিত্তি এবং বিকল্প বাজার তৈরির সুযোগ দেশটিকে এই চাপ সামাল দেওয়ার শক্তি দেয়।

আর শুল্কযুদ্ধে ক্ষতি একতরফা হওয়ারও সুযোগ নেই। কানাডা যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য অংশীদারদের একটি এবং মার্কিন পণ্যের অন্যতম বৃহৎ বাজার। শুধু ২০২৫ সালেই যুক্তরাষ্ট্র কানাডায় ৩৩৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি পণ্য রপ্তানি করেছে। গাড়ি, কৃষি, জ্বালানি, অ্যালুমিনিয়াম এবং উৎপাদনশিল্পে দুই দেশের সরবরাহব্যবস্থা এতটাই পরস্পরনির্ভর যে সীমান্তে শুল্কের দেয়াল তুললে তার খরচ শেষ পর্যন্ত মার্কিন কোম্পানি ও ভোক্তাকেও বহন করতে হয়।

খোদ মার্কিন ব্যবসায়ী মহল থেকেও এ নিয়ে সতর্কবার্তা এসেছে। U.S. Chamber of Commerce বলেছে, কানাডার ওপর আরও শুল্ক দুই দেশের অর্থনীতিরই ক্ষতি করবে, মার্কিন পরিবারের খরচ বাড়াবে এবং গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটাবে। কানাডা ও মেক্সিকোর সঙ্গে বাণিজ্যের ওপর লাখ লাখ মার্কিন চাকরি নির্ভরশীল। বিশেষ করে কানাডীয় অ্যালুমিনিয়ামের বিকল্প উৎপাদন যুক্তরাষ্ট্রে দ্রুত গড়ে তোলা সম্ভব নয়। অর্থাৎ কানাডাকে অর্থনৈতিকভাবে চাপে ফেলার প্রতিটি পদক্ষেপের মূল্য যুক্তরাষ্ট্রকে দিতে হবে।

অথচ শুল্ক কমানো বা প্রত্যাহারের বিনিময়ে ওয়াশিংটন কানাডার কাছে যে শর্তগুলো তুলেছে, সেগুলোর পরিধি অনেক বড়। যুক্তরাষ্ট্র চায় কানাডা মার্কিন গাড়ির ওপর পাল্টা শুল্ক প্রত্যাহার করুক, দুগ্ধখাতের supply-management ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনুক, প্রদেশগুলো মার্কিন অ্যালকোহল আবার দোকানে ফিরিয়ে আনুক এবং সরকারি ক্রয়ে ‘Buy Canadian’ নীতি বন্ধ করুক। কানাডীয় ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়ামের ওপর শুল্কের পাশাপাশি রপ্তানি কোটা আরোপের দাবিও আলোচনায় রয়েছে।

ওয়াশিংটনের দাবি শুধু বাণিজ্যেই থেমে নেই। F-35 যুদ্ধবিমান কেনা সম্পন্ন করা, গুরুত্বপূর্ণ খনিজসম্পদের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রকে অগ্রাধিকার দেওয়া এবং Golden Dome ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অংশ হিসেবে আমেরিকায় তৈরি রাডার বিমান কেনার বিষয়ও আলোচনায় তোলা হয়েছে। ফলে একটি শুল্কবিরোধ মেটানোর আলোচনার সঙ্গে কানাডার প্রতিরক্ষা কেনাকাটা, প্রাকৃতিক সম্পদ এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত সিদ্ধান্তও জুড়ে দেওয়া হয়েছে।

এখানেই কানাডার আপত্তির মূল জায়গা। শুল্ক আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র, আবার সেই শুল্ক কমানোর বিনিময়ে কানাডার অভ্যন্তরীণ বাজারব্যবস্থা, প্রাদেশিক নীতি, প্রতিরক্ষা ক্রয় এবং প্রাকৃতিক সম্পদ নিয়েও ছাড় চাওয়া হচ্ছে। কানাডীয়দের বড় একটি অংশ এই ধরনের চাপকে স্বাভাবিক বাণিজ্যিক দর-কষাকষি হিসেবে দেখছে না।

সাম্প্রতিক Leger জরিপেও তার প্রতিফলন দেখা গেছে। ৫৬ শতাংশ কানাডীয় বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রকে আর কোনো ছাড় দেওয়া উচিত নয়। নমনীয় হয়ে আরও ছাড় দেওয়ার পক্ষে রয়েছেন প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। কুইবেকে কঠোর অবস্থানের সমর্থন আরও বেশি। অর্থাৎ অধিকাংশ কানাডীয় একটি সমঝোতা চান ঠিকই, কিন্তু ট্রাম্পের হুমকির মুখে একের পর এক দাবি মেনে নিয়ে নয়।

এই মনোভাব শুধু জনমতেই নয়, রাজনীতিতেও দেখা যাচ্ছে। অন্টারিওর প্রিমিয়ার ডাগ ফোর্ড বারবার ‘Team Canada’ অবস্থানের কথা বলেছেন। প্রয়োজনে কানাডার হাতে থাকা পাল্টা ব্যবস্থাগুলো ব্যবহারের পক্ষেও তিনি।

কুইবেকেও একই ধরনের প্রতিরোধের সুর রয়েছে। প্রাদেশিক নেতৃত্ব মার্কিন শুল্ককে অন্যায্য বলে আখ্যা দিয়েছে এবং বিশেষ করে কানাডার দুগ্ধখাতের supply-management ব্যবস্থা নিয়ে ছাড় না দেওয়ার কথা বলেছে। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও ওয়াশিংটনের চাপের মুখে কানাডার স্বার্থ রক্ষার প্রশ্নে একটি বিস্তৃত ঐক্যের আভাস মিলছে।

কানাডার হাতে পাল্টা চাপ তৈরির উপায়ও রয়েছে। পাল্টা শুল্ক, সরকারি ক্রয়ে মার্কিন পণ্য সীমিত করা, প্রদেশগুলোতে মার্কিন অ্যালকোহল বিক্রি বন্ধ রাখা কিংবা বিদ্যুৎ রপ্তানির ওপর অতিরিক্ত চার্জসহ নানা ব্যবস্থা আগেও আলোচনায় এসেছে। পাশাপাশি কার্নি সরকার যুক্তরাষ্ট্রের ওপর দীর্ঘদিনের অতিরিক্ত নির্ভরতা কমাতে ইউরোপ, এশিয়া এবং অন্যান্য বাজারে বাণিজ্য সম্প্রসারণের চেষ্টা করছে। দেশের অভ্যন্তরে আন্তঃপ্রাদেশিক বাণিজ্যের বাধা কমানো এবং নতুন অবকাঠামো গড়ে তোলার উদ্যোগও সেই বৃহত্তর কৌশলের অংশ।

সবচেয়ে কঠিন দর-কষাকষির একটি ক্ষেত্র গাড়ি শিল্প। ট্রাম্প চান গাড়ি সংযোজনের আরও কাজ যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে যাক। ওয়াশিংটন কানাডীয় গাড়ির শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে ১৫ শতাংশে নামাতে পারে, তবে গাড়িতে ব্যবহৃত শুধু মার্কিন উপাদানের মূল্য শুল্কমুক্ত রাখতে চায়। অটোয়ার দাবি, উত্তর আমেরিকায় তৈরি সব উপাদানই ছাড় পাবে। বনজ পণ্য নিয়েও বিরোধ রয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্র softwood lumber নিয়ে পৃথক পর্যালোচনা চালিয়ে যেতে চায়, আর কানাডা বিদ্যমান শুল্ক দ্রুত কমানোর দাবি করছে।

সব মিলিয়ে কার্নির সামনে চ্যালেঞ্জটি দ্বিমুখী। একদিকে কানাডার গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি খাতকে আরও বড় শুল্কের আঘাত থেকে রক্ষা করতে হবে, অন্যদিকে এমন কোনো ছাড় দেওয়া যাবে না, যা দেশের বাজার, কৃষি, প্রতিরক্ষা কিংবা প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নীতিগত নিয়ন্ত্রণ দুর্বল করে। একই সঙ্গে ওয়াশিংটনের জন্যও দীর্ঘ শুল্কযুদ্ধ ঝুঁকিমুক্ত নয়। দুই দেশের উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থা এতটাই পরস্পরের সঙ্গে জড়িত যে এর খরচ মার্কিন ব্যবসা, শ্রমিক ও ভোক্তার কাছেও পৌঁছাবে।

কানাডার জন্য স্বস্তির জায়গা হলো, দেশটির সামনে বিকল্প পথও রয়েছে। নতুন বাজার তৈরি, যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা কমানো, আন্তঃপ্রাদেশিক বাণিজ্য বাড়ানো এবং নিজেদের জ্বালানি ও প্রাকৃতিক সম্পদকে আরও কৌশলগতভাবে ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। সেই হিসাবে ট্রাম্পের চাপ স্বল্পমেয়াদে আঘাত হলেও নিজের অর্থনৈতিক শক্তিগুলো আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগানোর প্রয়োজনটি কানাডার সামনে নতুন করে এসেছে।

তিন দিনের শুল্ক স্থগিতাদেশ তাই স্বস্তির খবর, কিন্তু বিজয়ের ঘোষণা নয়। অন্তত তাৎক্ষণিকভাবে ৫০ শতাংশ নতুন শুল্কের আঘাত ঠেকেছে এবং আলোচনা শেষ হয়নি। এখন আসল প্রশ্ন, ট্রাম্পের ঘোষিত ‘DEAL’ শেষ পর্যন্ত কোন শর্তে চূড়ান্ত হয়। কারণ কানাডার জন্য ভালো চুক্তির মাপকাঠি শুধু শুল্ক এড়ানো নয়; নিজের বাজার, শিল্প, সম্পদ এবং নীতিনির্ধারণের স্বাধীনতা কতটা রক্ষা করা গেল, শেষ পর্যন্ত সেটিই হবে আসল হিসাব।

তথ্যসূত্র:
The Globe and Mail, August 19, 2026
Toronto Star, August 19, 2026


Back to top button
🌐 Read in Your Language