সম্পাদকের পাতা

কনজারভেটিভ নেতা পয়লিয়েভেকে ঘিরে দলের ভেতরে অস্বস্তি

নজরুল মিন্টো

দেড় বছর আগেও অটোয়ার রাজনৈতিক আলোচনায় প্রশ্ন ছিল, পিয়েরে পয়লিয়েভ কত বড় ব্যবধানে জিতবেন। জনমত জরিপে তাঁর কনজারভেটিভ পার্টি তখন লিবারেলদের অনেক পেছনে ফেলেছিল। জাস্টিন ট্রুডোর দীর্ঘ শাসন, জীবনযাত্রার ব্যয়, আবাসন সংকট আর মূল্যস্ফীতি মিলিয়ে ক্ষমতার পালাবদল অনেকের কাছেই সময়ের ব্যাপার বলে মনে হচ্ছিল। এখন হিসাবটি উল্টো। কনজারভেটিভদের ভেতরেই প্রশ্ন উঠছে, পরবর্তী নির্বাচনে কতজন এমপি নিজের আসন ধরে রাখতে পারবেন।

সেই উদ্বেগ এখন ককাসের ভেতরেও স্পষ্ট। CTV News পরিচয় গোপন রাখার শর্তে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ১৭ জন কনজারভেটিভ এমপির সঙ্গে কথা বলেছে। তাঁদের অধিকাংশই দলের বর্তমান অবস্থান নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন। কয়েকজন নিজেদের আসন হারানোর আশঙ্কা করছেন, আবার কেউ কেউ সন্দেহ প্রকাশ করেছেন, পরবর্তী ফেডারেল নির্বাচন পর্যন্ত পয়লিয়েভ দলের নেতৃত্বে থাকবেন কি না।

সবচেয়ে বড় বিপদটি ধরা পড়ছে জনমত জরিপের দীর্ঘমেয়াদি চিত্রে। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে Abacus-এর জরিপে কনজারভেটিভরা ৪৭ শতাংশ, লিবারেলরা মাত্র ২০ শতাংশে ছিল। ব্যবধান ছিল ২৭ পয়েন্ট। এখন একই সংস্থার আগস্টের জরিপে লিবারেলরা ৪২ শতাংশ, কনজারভেটিভরা ৩৫ শতাংশ। অর্থাৎ ২৭ পয়েন্টের এগিয়ে থাকা দলটি এখন ৭ পয়েন্ট পিছিয়ে, ব্যবধানের হিসাবে প্রায় ৩৪ পয়েন্টের উল্টো যাত্রা। Abacus-এর হিসাবে ২০২৫ সালের মার্চের শেষ দিকে দুই দল একে অন্যকে অতিক্রম করে এবং এরপর প্রতিটি জরিপেই লিবারেলরা এগিয়ে রয়েছে।

অন্য জরিপেও একই সমস্যার ছাপ। ১১ আগস্টের Nanos Research জরিপে লিবারেলদের সমর্থন ৪৫.৬ শতাংশ, কনজারভেটিভদের ২৯.১ শতাংশ। আরও বড় ব্যবধান নেতৃত্বের প্রশ্নে। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে পছন্দের তালিকায় মার্ক কার্নি ৫৩.৬ শতাংশ, পয়লিয়েভ মাত্র ১৮ শতাংশ। Abacus-এর সর্বশেষ জরিপেও পয়লিয়েভ সম্পর্কে ইতিবাচক মত ৩৫ শতাংশের, নেতিবাচক ৪৬ শতাংশের। কার্নির ক্ষেত্রে ইতিবাচক মত ৫১ শতাংশ এবং নেতিবাচক ৩১ শতাংশ।

এই উলটপালট আরও তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ পয়লিয়েভ একসময় প্রায় নিশ্চিত বিজয়ের অবস্থানে ছিলেন। তখন তাঁকে কানাডার সম্ভাব্য পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবেও দেখতে শুরু করেছিলেন অনেকে। কিন্তু জাস্টিন ট্রুডোর বিদায়, মার্ক কার্নির নেতৃত্বে আসা এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্ক ও কানাডাকে ‘৫১তম অঙ্গরাজ্য’ করার হুমকির পর রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্র বদলে যায়। ট্রুডোবিরোধী ক্ষোভকে সামনে রেখে পয়লিয়েভ যে নির্বাচনী লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিয়েছিলেন, সেই সুবিধা আর ধরে রাখতে পারেননি। ২০২৫ সালের নির্বাচনে কনজারভেটিভরা সরকার গঠন করতে ব্যর্থ হয়, পয়লিয়েভ নিজের দীর্ঘদিনের আসনও হারান। পরে আলবার্টার ব্যাটল রিভার-ক্রোফুট উপনির্বাচনে জিতে তিনি হাউস অব কমন্সে ফেরেন।

পয়লিয়েভের সমস্যাটি এখানেই জটিল। দলের সদস্যদের মধ্যে তাঁর ভিত্তি এখনো শক্ত, জানুয়ারির বাধ্যতামূলক নেতৃত্ব পর্যালোচনায় তিনি ৮৭.৪ শতাংশ সমর্থন পেয়েছিলেন। অথচ বৃহত্তর ভোটারদের মধ্যে তাঁর অবস্থান তার ধারেকাছেও নয়। আবার নেতৃত্ব বদলালেই যে কনজারভেটিভদের সমস্যা মিটবে, তেমন কোনো নামও সামনে নেই। আগস্টের CTV/Nanos জরিপে কার্নিকে হারানোর মতো কনজারভেটিভ শিবিরে কোনো সুস্পষ্ট বিকল্প পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ দলটির সামনে এখন দুই দিকের সংকট: বর্তমান নেতাকে নিয়ে নির্বাচনী সংশয়, আবার তাঁর জায়গায় শক্তিশালী বিকল্পেরও অভাব।

এর মধ্যে ককাসও ছোট হয়েছে। গত নির্বাচনের পর ক্রিস ডি’অঁত্রেমোঁ, মাইকেল মা, ম্যাট জেনেরু ও মেরিলিন গ্লাডু কনজারভেটিভ ছেড়ে লিবারেল দলে যোগ দিয়েছেন। ক্যাথি ওয়াগান্টল ৩১ আগস্ট পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন, আর রিচার্ড মার্টেল হাউস অব কমন্স ছেড়ে সিনেটে গেছেন। বর্তমানে হাউসে লিবারেল এমপি ১৭১ জন, কনজারভেটিভ ১৩৯, ব্লক কেবেকোয়া ২১, এনডিপি ৫, গ্রিন ১ এবং একজন স্বতন্ত্র এমপি রয়েছেন। পাঁচটি আসন শূন্য।

ককাস ছোটো হওয়ার পাশাপাশি সম্প্রতি দলের অভ্যন্তরীণ বিরোধও প্রকাশ্যে এসেছে। ক্যালগারি স্ট্যাম্পিডে ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার কনজারভেটিভ নেতৃত্ব নির্বাচনে ক্যারোলিন এলিয়টের প্রচার দলকে ইঙ্গিত করে পয়লিয়েভ ‘পূর্বাঞ্চলের লিবারেল লবিস্টদের’ প্রসঙ্গ তোলেন। অল্প ব্যবধানে হেরে যাওয়া এলিয়ট পরে প্রকাশ্যেই তাঁর সমালোচনা করে পয়লিয়েভকে বিভাজনের বদলে দলকে ঐক্যবদ্ধ করার আহ্বান জানান। টরন্টো স্টারের সঙ্গে কথা বলা কনজারভেটিভদের কেউ কেউ দলের মনোবল কমে যাওয়া এবং ভবিষ্যৎ কৌশল পরিষ্কার না থাকার কথাও বলেছেন।

নির্বাচনী মানচিত্রও পয়লিয়েভের জন্য কঠিন। Abacus-এর সর্বশেষ জরিপে অন্টারিওতে লিবারেল ৪৮ শতাংশ, কনজারভেটিভ ৩৭ শতাংশ। ব্রিটিশ কলাম্বিয়ায় লিবারেল ৪২, কনজারভেটিভ ৩৬ শতাংশ। কুইবেকে পরিস্থিতি আরও দুর্বল, সেখানে কনজারভেটিভরা ১৮ শতাংশে। আলবার্টায় দলটির শক্ত অবস্থান থাকলেও জাতীয়ভাবে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় অন্টারিও, কুইবেক ও ব্রিটিশ কলাম্বিয়ায় এই দুর্বলতা বড় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

সামনে ৩১ আগস্টের তিন উপনির্বাচন এই চাপ আরও বাড়াতে পারে। ভোট হবে কুইবেকের শিকুতিমি-লে ফিয়র্ড, অন্টারিওর বিচেস-ইস্ট ইয়র্ক এবং ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার নর্থ ভ্যাঙ্কুভার-ক্যাপিলানো আসনে। সবচেয়ে বেশি নজর থাকবে শিকুতিমি-লে ফিয়র্ডে। গত নির্বাচনে সেখানে কনজারভেটিভরা ৩৪.১ শতাংশ, ব্লক কেবেকোয়া ৩১.২ এবং লিবারেলরা ৩১.১ শতাংশ ভোট পেয়েছিল। ব্যবধান এতটাই কম ছিল যে আসনটি হাতছাড়া হলে সেটি পয়লিয়েভের জন্য নতুন চাপ তৈরি করবে। নর্থ ভ্যাঙ্কুভার-ক্যাপিলানোর কনজারভেটিভ প্রার্থীও প্রচারে ভোটারদের কাছ থেকে পয়লিয়েভকে নিয়ে সমালোচনা শোনার কথা স্বীকার করেছেন।

কনজারভেটিভদের সংকট তাই শুধু জরিপের ফলাফল, কয়েকজন এমপির দলত্যাগ কিংবা সাম্প্রতিক বিরোধের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ২৭ পয়েন্টের ব্যবধান নিয়ে এগিয়ে থাকা অবস্থান হারানো, নির্বাচনে পরাজয়, নেতার নিজের আসন হারানো, চার এমপির লিবারেলে চলে যাওয়া এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রদেশগুলোতে পিছিয়ে পড়া, সব মিলিয়ে দেড় বছরে দলটির অবস্থান অনেকটাই বদলে গেছে। এর সঙ্গে রয়েছে আরও কঠিন একটি প্রশ্ন: পয়লিয়েভকে নিয়ে সংশয় বাড়লেও তাঁর জায়গায় কাকে সামনে আনা হবে, সেই উত্তরও কনজারভেটিভদের কাছে এখনো পরিষ্কার নয়।

তথ্যসূত্র
Nanos Research
CTV News
Abacus Data
Reuters


Back to top button
🌐 Read in Your Language