
একটি নয়, পাশাপাশি তিনটি কফিন। একটিতে বাবা, একটিতে মা, আরেকটিতে ছোট বোন। সেই তিন কফিনের সঙ্গে ইতালি থেকে বাংলাদেশে ফিরলেন আমির হোসেন অয়ন। প্রায় দুইমাস আগে রোমের একটি অ্যাপার্টমেন্টে যে পরিবারটিতে ছিলেন চারজন, এখন সেই পরিবারের একমাত্র জীবিত সন্তান তিনি। সেদিন হামলাকারীর আঘাতে অয়নও প্রায় মৃত্যুর দুয়ারে পৌঁছে গিয়েছিলেন। মাথায় গুরুতর আঘাত নিয়ে অস্ত্রোপচারের পর বেঁচে ফিরেছেন। কিন্তু ফিরে এসে তাঁকেই দাঁড়াতে হয়েছে বাবা-মা আর বোনের তিনটি কফিনের সামনে।
গত ১৪ আগস্ট শুক্রবার সকাল আটটার দিকে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছায় কামাল উদ্দিন বাবুল, তাঁর স্ত্রী আরজু আক্তার এবং তাঁদের ছোট মেয়ে আরোয়া ইসলাম আরিশার মরদেহ। সঙ্গে দেশে ফেরেন ২০ বছর বয়সী অয়ন। বিমানবন্দর থেকে মরদেহ নেওয়া হয় নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার চরকাঁকড়া ইউনিয়নের গ্রামের বাড়িতে। বিকেলে তিনটি কফিন বাড়ির আঙিনায় পৌঁছালে স্বজন ও প্রতিবেশীদের কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ। ওই দিন বাদ মাগরিব স্থানীয় বিদ্যালয় মাঠে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে পাশাপাশি দাফন করা হয় তিনজনকে।
এর আগে ‘ইতালিতে বাংলাদেশি পরিবারের তিন সদস্যকে হত্যা’ শিরোনামে ‘দেশে বিদেশে’-তে এ হত্যাকাণ্ডের প্রাথমিক ঘটনা তুলে ধরা হয়েছিল। এরপর প্রায় দেড় মাসে তদন্তে এসেছে নতুন অনেক তথ্য। হাসপাতাল থেকে ফিরে অয়ন নিজেই ইতালীয় সংবাদমাধ্যমের সামনে সেই রাতের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন। ময়নাতদন্তে উঠে এসেছে হত্যাকাণ্ডের নৃশংসতার বিস্তারিত। সন্দেহভাজন শাহাদাত হোসেনকে ধরতে ইতালিজুড়ে অভিযান চালিয়েছে পুলিশ। কিন্তু ঘটনার ৫১ দিন পরও তাঁকে গ্রেপ্তারের খবর পাওয়া যায়নি।
গত ২৬ জুন রাত। ঘটনাস্থল রোমের উত্তর-পশ্চিমের কাসালোত্তি এলাকার Via Montiglio 35 নম্বর ভবনের একটি অ্যাপার্টমেন্ট। সেদিন বাবা বাবুল ও ছেলে অয়ন দুজনই কর্মস্থলে ছিলেন। বাড়িতে ছিলেন মা আরজু ও ছোট মেয়ে আরোয়া। ইতালীয় সংবাদমাধ্যমে অয়ন জানিয়েছেন, কাজের মধ্যে প্রথমে বাড়িওয়ালার একটি ফোন পান তিনি। পরে বাবা তাঁকে জানান, বাড়িতে অস্বাভাবিক কিছু ঘটেছে বলে মনে হচ্ছে। বাবুলের কাজ আগে শেষ হওয়ায় তিনি প্রথমে বাড়িতে ফিরে যান। তদন্তকারীদের ধারণা, ততক্ষণে স্ত্রী ও মেয়ের ওপর হামলা হয়ে গিয়েছিল। বাড়িতে ঢোকার পর বাবুলও হত্যাকারীর হামলার শিকার হন।
অয়ন কাজ শেষ করে রাতের দিকে বাড়ি ফেরেন। দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে দেখেন ঘর অন্ধকার। কিছু একটা যে ভয়ংকরভাবে অস্বাভাবিক, তা বুঝতে সময় লাগেনি। নিজের ঘরের কাছে গিয়ে তিনি পরিচিত এক ব্যক্তিকে দেখতে পান। অয়নের ভাষ্য অনুযায়ী, সেই ব্যক্তি ছিলেন শাহাদাত হোসেন। তাঁর হাতে ছিল ধারালো ভারী অস্ত্র। অয়নকে চুপ থাকতে ইঙ্গিত করে তিনি জানান, সবাই ঘুমাচ্ছে। মুহূর্তের মধ্যে অয়নের ওপরও হামলা হয়।
মাথায় প্রচণ্ড আঘাত পেয়েও অয়ন কোনোমতে হামলাকারীর হাত থেকে বেরিয়ে নিচে নেমে রাস্তায় পৌঁছান। পরে তাঁকে দ্রুত রোমের Policlinico Gemelli হাসপাতালে নেওয়া হয়। চিকিৎসকেরা তাঁর মাথার খুলিতে গুরুতর ফ্র্যাকচার ও হেমাটোমা শনাক্ত করেন। জরুরি নিউরোসার্জারি করতে হয়। প্রথম দিকে তাঁর অবস্থা এতটাই গুরুতর ছিল যে নিবিড় পরিচর্যায় রেখে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছিল। কয়েক দিনের মধ্যে অবস্থার উন্নতি হলে তিনি আইসিইউ থেকে বেরিয়ে আসেন।
ঘটনার পরদিনই রোমের প্রসিকিউটরের দপ্তরের নির্দেশে ইতালির পুলিশ শাহাদাত হোসেনের ছবি ও পরিচয় প্রকাশ করে সাধারণ মানুষের সহায়তা চায়। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে জন্ম নেওয়া শাহাদাতের বয়স ৪৩ বছর। তাঁকে খুঁজতে রোমসহ ইতালির বিভিন্ন এলাকায় পুলিশ অভিযান শুরু করে।
শাহাদাত আগে যুক্তরাজ্যে ছিলেন এবং তাঁর পরিবারের সদস্যদের সেখানে থাকার তথ্যের ভিত্তিতে সেই দিকটিও খতিয়ে দেখে পুলিশ। কেউ তাঁকে পালাতে বা আত্মগোপনে সহযোগিতা করেছে কি না, সেটিও তদন্তে গুরুত্ব পায়। প্রথম দিকে তিনি রোম কিংবা আশপাশে লুকিয়ে থাকতে পারেন, ইতালি ছেড়ে পালিয়ে যেতে পারেন, এমনকি তাঁর নিজের জীবন নিয়ে কোনো ঘটনা ঘটেছে কি না, বিভিন্ন সম্ভাবনা ধরে অনুসন্ধান চলে। কিন্তু কোনো পথেই তাঁর নিশ্চিত সন্ধান পাওয়া যায়নি।
শাহাদাত কেন পরিবারটির ওপর এমন হামলা চালিয়ে থাকতে পারেন, সে প্রশ্নেরও উত্তর খুঁজছে পুলিশ। তদন্তে উঠে এসেছে, তিনি পরিবারটির ঘনিষ্ঠ পরিচিত ছিলেন। ছোট্ট আরোয়ার জন্মদিনের অনুষ্ঠানেও তিনি উপস্থিত ছিলেন এবং অনুষ্ঠান আয়োজনে সহযোগিতা করেছিলেন বলে ইতালীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। অন্যদিকে অয়ন বলেছেন, হত্যাকাণ্ডের প্রায় এক সপ্তাহ আগে শাহাদাতের সঙ্গে তাঁর কথা কাটাকাটি হয়েছিল। তদন্তকারীরা বাবুলের স্ত্রীর সাথে শাহাদাতের ঘনিষ্ঠতা এবং এ নিয়ে পরিবারের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের অবনতির বিষয়টিও তদন্ত করেছেন।
মৃত্যুর প্রায় দেড় মাস পর ১১ আগস্ট কাসালোত্তির Piazza Ormea-তে বাবুল, তাঁর স্ত্রী ও মেয়েকে শেষ বিদায় জানাতে স্থানীয় বাসিন্দা ও বাংলাদেশি কমিউনিটির মানুষ জড়ো হন। এই একই জায়গা থেকে হত্যাকাণ্ডের পর পরিবারটির স্মরণে মোমবাতি মিছিল হয়েছিল। সেই আয়োজন শেষে মরদেহ বাংলাদেশে পাঠানোর প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। বাবা-মা ও বোনের মরদেহের সঙ্গে দেশে ফেরেন অয়নও।
অয়ন সংবাদমাধ্যমের সামনে এখন একটিই আবেদন জানিয়েছেন, তাঁর পরিবারকে হত্যার ঘটনায় অভিযুক্ত ব্যক্তিকে যেন দ্রুত খুঁজে বের করা হয়।
তথ্যসূত্র:
ANSA
Adnkronos









