
রাতের আকাশের দিকে তাকিয়ে আমরা সবাই কখনো না কখনো বিস্মিত হয়েছি। অসংখ্য তারা, দূরের ছায়াপথ আর অজানা মহাবিশ্ব আমাদের কৌতূহলী করে তোলে। কিন্তু পৃথিবীতে এমন মানুষ খুব কমই আছেন, যাঁরা শুধু আকাশের দিকে তাকিয়ে স্বপ্ন দেখেন না; সেই রহস্যের উত্তর খুঁজতেও বেরিয়ে পড়েন। বাংলাদেশের মেয়ে ড. লামিয়া মওলা সেই বিরল মানুষদের একজন।
লামিয়া যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েলেসলি কলেজের সহকারী অধ্যাপক ও Whitin Observatory-র জ্যোতির্বিজ্ঞানী। বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী মহাকাশ দূরবীক্ষণ যন্ত্র জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপের (James Webb Space Telescope) গবেষণা দলের সদস্য হিসেবে তিনি ইতিমধ্যেই আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান অঙ্গনে নিজের অবস্থান তৈরি করেছেন। এখন তিনি যুক্ত হয়েছেন নাসার আরেকটি বড় মহাকাশ অভিযানে। ন্যান্সি গ্রেস রোমান স্পেস টেলিস্কোপ (Nancy Grace Roman Space Telescope) ঘিরে পরিচালিত একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক গবেষণা দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন তিনি।
মহাবিশ্বের ইতিহাস বোঝার চেষ্টা মানুষের বহু শতাব্দীর। গ্যালিলিওর ছোট্ট দূরবীক্ষণ যন্ত্র থেকে শুরু করে হাবল, তারপর জেমস ওয়েব। প্রতিটি প্রজন্মই আগের চেয়ে আরও দূরে তাকিয়েছে। কিন্তু যত দূরে দেখা গেছে, ততই নতুন প্রশ্ন সামনে এসেছে। প্রথম গ্যালাক্সি কীভাবে তৈরি হয়েছিল? তারার জন্ম কোথায়? ডার্ক এনার্জি আসলে কী? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই কাজ করছেন ড. লামিয়া মওলা।
তাঁর গবেষণার মূল ক্ষেত্র মহাবিশ্বের একেবারে শুরুর সময়, যাকে বিজ্ঞানীরা Cosmic Dawn বলেন। তখনই প্রথম নক্ষত্র ও প্রথম গ্যালাক্সিগুলোর জন্ম শুরু হয়েছিল। কোটি কোটি আলোকবর্ষ দূরের সেই আলো বিশ্লেষণ করে তিনি ও তাঁর সহকর্মীরা জানার চেষ্টা করেন, আজকের মহাবিশ্বের সূচনা কীভাবে হয়েছিল।
এই পথ অবশ্য একদিনে তৈরি হয়নি। ঢাকায় বেড়ে ওঠা লামিয়া মওলার বিজ্ঞানপ্রেম তাঁকে নিয়ে যায় যুক্তরাষ্ট্রের ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখান থেকে জ্যোতির্বিজ্ঞানে পিএইচডি সম্পন্ন করার পর তিনি কানাডার টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের Dunlap Institute-এ পোস্টডক্টরাল গবেষক হিসেবে কাজ করেন। পরে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েলেসলি কলেজে শিক্ষকতা ও গবেষণায় যোগ দেন। অল্প সময়ের মধ্যেই তাঁর গবেষণা আন্তর্জাতিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পগুলোর নজর কাড়ে।
২০২১ সালের ২৫ ডিসেম্বর মহাকাশে উৎক্ষেপণ করা হয় জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপকে। প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে নির্মিত এই দূরবীক্ষণ যন্ত্রকে আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের সবচেয়ে শক্তিশালী দূরবীক্ষণ যন্ত্র বলা হয়। এর লক্ষ্য ছিল এমন সব গ্যালাক্সি দেখা, যেগুলোর আলো প্রায় ১৩ বিলিয়ন বছর ভ্রমণ করে আজ পৃথিবীতে পৌঁছেছে। অর্থাৎ, আমরা যত দূরের আলো দেখি, ততটাই অতীতের মহাবিশ্বকে দেখি।
এই বিশাল প্রকল্পের গবেষণা দলে ছিলেন ড. লামিয়া মওলা। জেমস ওয়েবের পাঠানো প্রথম দিকের তথ্য বিশ্লেষণ করে তিনি ও তাঁর সহকর্মীরা এমন একটি দূরবর্তী গ্যালাক্সি শনাক্ত করেন, যা Sparkler Galaxy নামে পরিচিত। এই গ্যালাক্সির চারপাশে তাঁরা অত্যন্ত প্রাচীন তারকাগুচ্ছের কয়েকটি সম্ভাব্য নিদর্শন খুঁজে পান। এই আবিষ্কার বিজ্ঞানীদের সামনে নতুন প্রশ্ন তোলে, গ্যালাক্সি ও তারকাগুচ্ছের জন্ম কি আমাদের ধারণার চেয়েও আগে শুরু হয়েছিল?
এরপর ড. লামিয়ার সহ-নেতৃত্বে আরেক গবেষণায় Firefly Sparkle নামে মহাবিশ্বের একেবারে শুরুর সময়ের একটি ক্ষুদ্র গ্যালাক্সির গঠন বিশ্লেষণ করা হয়। সেই গবেষণার ফল ২০২৪ সালে আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী Nature-এ প্রকাশিত হয়, যা তাঁর গবেষণাজীবনের একটি উল্লেখযোগ্য অর্জন।
Firefly Sparkle নিয়ে এই গবেষণা মহাবিশ্বের প্রথম দিককার গ্যালাক্সির গঠন ও বিবর্তন সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের নতুন তথ্য দেয়। ফলে মহাবিশ্বের শুরুর সময় সম্পর্কে প্রচলিত কিছু ধারণা নতুন করে মূল্যায়নের সুযোগ তৈরি হয়।
এরই ধারাবাহিকতায় এখন শুরু হতে যাচ্ছে নাসার আরেকটি বড় অভিযান Nancy Grace Roman Space Telescope। যদি জেমস ওয়েবকে মহাবিশ্বের গভীরে তাকানো একটি শক্তিশালী দূরবীক্ষণ যন্ত্র বলা হয়, তাহলে রোমান টেলিস্কোপকে বলা যায় মহাকাশের বিশাল মানচিত্র তৈরির বিশেষজ্ঞ। এটি একসঙ্গে হাবল টেলিস্কোপের তুলনায় প্রায় ১০০ গুণ বড় এলাকা পর্যবেক্ষণ করতে পারবে। কোটি কোটি গ্যালাক্সির ছবি সংগ্রহ করে বিজ্ঞানীদের সামনে মহাবিশ্বের এমন একটি চিত্র তুলে ধরবে, যা আগে কখনো দেখা সম্ভব হয়নি।
রোমান স্পেস টেলিস্কোপের অন্যতম লক্ষ্য হলো মহাবিশ্বের সবচেয়ে রহস্যময় শক্তি, ডার্ক এনার্জি সম্পর্কে নতুন তথ্য সংগ্রহ করা। বিজ্ঞানীদের ধারণা, এই অদৃশ্য শক্তির কারণেই মহাবিশ্ব ক্রমাগত দ্রুত প্রসারিত হচ্ছে। একই সঙ্গে এটি হাজার হাজার নতুন এক্সোপ্ল্যানেট খুঁজবে, মহাবিশ্বের বৃহৎ কাঠামোর মানচিত্র তৈরি করবে এবং গ্যালাক্সিগুলোর বিবর্তন আরও ভালোভাবে বুঝতে সহায়তা করবে।
এই মহাযজ্ঞেই গুরুত্বপূর্ণ একটি বৈজ্ঞানিক গবেষণা দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন ড. লামিয়া মওলা। আন্তর্জাতিক জ্যোতির্বিজ্ঞানে এটিও অত্যন্ত সম্মানজনক দায়িত্ব। কারণ নাসার এ ধরনের গবেষণা দলে নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ পান বিশ্বের হাতে গোনা কয়েকজন বিজ্ঞানী, যাঁদের গবেষণা, দক্ষতা ও অবদানের ওপর আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানসমাজের আস্থা রয়েছে।
ড. লামিয়ার গবেষণার বিশেষত্ব হলো, তিনি শুধু দূরের গ্যালাক্সির ছবি দেখেন না; সেই ছবির ভেতরে লুকিয়ে থাকা ইতিহাসও পড়ার চেষ্টা করেন। কোটি কোটি বছর আগে যে আলো একটি গ্যালাক্সি থেকে যাত্রা শুরু করেছিল, সেই আলো আজ তাঁর কম্পিউটারের পর্দায় এসে পৌঁছেছে। সেই আলোর উজ্জ্বলতা, রং, বর্ণালি এবং গঠন বিশ্লেষণ করে তিনি বোঝার চেষ্টা করেন, সেই সময় গ্যালাক্সিটির বয়স কত ছিল, সেখানে কত দ্রুত নতুন তারা জন্ম নিচ্ছিল, আর সেই গ্যালাক্সি কীভাবে সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়েছে। যেন মহাবিশ্বের কোটি কোটি বছর আগের একটি ছবি হাতে নিয়ে একজন ইতিহাসবিদ অতীতের গল্প পড়ছেন।
তাঁর এই গবেষণা শুধু আন্তর্জাতিক গবেষণাগারেই সীমাবদ্ধ নয়। দেশের প্রতিও রয়েছে তাঁর গভীর টান। বাংলাদেশে জ্যোতির্বিজ্ঞানকে জনপ্রিয় করে তুলতে তিনি বিভিন্ন উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত। তিনি Independent University, Bangladesh (IUB)-এর Center for Astronomy, Space Science and Astrophysics-এর সঙ্গেও সম্পৃক্ত। পাশাপাশি “দূরবীন (Doorbin)” নামে একটি উদ্যোগের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের জন্য টেলিস্কোপ দিয়ে আকাশ দেখার আয়োজন করা হয়েছে। তাঁর বিশ্বাস, বড় বিজ্ঞানী হওয়ার আগে বড় স্বপ্ন দেখতে শেখা প্রয়োজন। আর সেই স্বপ্নের শুরু হতে পারে রাতের আকাশের দিকে একটি কৌতূহলী দৃষ্টিতেই।
ড. লামিয়া মওলার এই সাফল্য বাংলাদেশের তরুণদের জন্যও একটি শক্তিশালী বার্তা বহন করে। দীর্ঘদিন ধরে দেশের মেধাবী শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশ চিকিৎসক, প্রকৌশলী কিংবা তথ্যপ্রযুক্তি পেশায় আগ্রহী হলেও মহাকাশবিজ্ঞান বা জ্যোতির্বিজ্ঞানে বাংলাদেশিদের উপস্থিতি ছিল তুলনামূলকভাবে সীমিত। তাঁর এই সাফল্য নতুন প্রজন্মকে মহাকাশবিজ্ঞান নিয়েও বড় স্বপ্ন দেখতে উৎসাহিত করবে।
আজ যখন বিশ্বের বড় বড় দেশ চাঁদ, মঙ্গল কিংবা আরও দূরের মহাকাশে নতুন অভিযান পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন সেই বৈজ্ঞানিক অভিযানের একটি অংশে বাংলাদেশের একজন গবেষকের নেতৃত্ব নিঃসন্দেহে গর্বের বিষয়। জাতীয় পতাকা হয়তো কোনো মহাকাশযানের গায়ে আঁকা নেই, কিন্তু একজন বাংলাদেশি বিজ্ঞানীর মেধা, শ্রম ও গবেষণা সেই অভিযানের ভেতরে জায়গা করে নিয়েছে। অনেক সময় এটিও একটি দেশের সবচেয়ে বড় পরিচয় হয়ে ওঠে।
বিজ্ঞান মানুষের জ্ঞানকে সমৃদ্ধ করে। আর বিজ্ঞানীদের এমন গল্প একটি জাতিকে নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শেখায়। ড. লামিয়া মওলার পথচলা তাই শুধু একজন জ্যোতির্বিজ্ঞানীর সাফল্যের গল্প নয়; এটি এমন এক প্রজন্মের গল্প, যারা বিশ্বাস করে, স্বপ্নের কোনো ভৌগোলিক সীমানা নেই।
তথ্যসূত্র:
NASA. Nancy Grace Roman Space Telescope
Wellesley College Magazine. Eyes on the Sky









