
বিশ্বকাপের মাঠে গোল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে স্টেডিয়াম গর্জে ওঠে। ক্যামেরা ছুটে যায় গোলদাতার মুখের দিকে। সংবাদমাধ্যমে উঠে আসে তাঁর নাম, শটের গতি, কোচের কৌশল কিংবা ম্যাচের নাটকীয়তা। অথচ গোলের ঠিক আগের মুহূর্তে বলটিকে শেষবার স্পর্শ করা বস্তুটির কথা খুব কমই বলা হয়। সেটি ফুটবলারের পায়ে থাকা একজোড়া বুট।
এবারের বিশ্বকাপে সেই বুটকে অবশ্য উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। সবুজ মাঠের ওপর বারবার চোখে পড়ছে উজ্জ্বল পিংক বা গোলাপি রঙের বুট। কিলিয়ান এমবাপ্পে, এরলিং হালান্ড, ভিনিসিয়ুস জুনিয়রসহ বহু তারকার পায়ে কাছাকাছি রঙের বুট দেখা গেছে। নাইকি, অ্যাডিডাস ও পুমার মতো প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠান প্রায় একই সময়ে পিংক বুট বাজারে এনেছে। ফলে এই রং যেন এবারের বিশ্বকাপের অঘোষিত পরিচয় হয়ে উঠেছে।
আজকের এই রঙিন, হালকা বুটের গল্প শুরু হয়েছিল একেবারেই অন্যভাবে। ফুটবল বুটের সবচেয়ে পুরোনো লিখিত উল্লেখ পাওয়া যায় ১৫২৬ সালে। ইংল্যান্ডের রাজা অষ্টম হেনরির পোশাকের হিসাবখাতায় ফুটবল খেলার জন্য একজোড়া চামড়ার বুট তৈরির কথা লেখা ছিল। ইতিহাসের পাতায় এটিই ফুটবল বুটের সবচেয়ে প্রাচীন লিখিত দলিল হিসেবে বিবেচিত হয়।
উনিশ শতকে ইংল্যান্ডের শ্রমিকেরা খেলতে নামতেন নিজেদের কাজের ভারী জুতা পরে। মোটা চামড়া, শক্ত সামনের অংশ আর উঁচু গোড়ালির সেই জুতা দিয়ে বল নিয়ন্ত্রণ করা ছিল বেশ কঠিন। তবু সেখান থেকেই শুরু হয় বিবর্তনের পথ। ধীরে ধীরে সেই কাজের জুতাই রূপ নেয় আজকের আধুনিক ফুটবল বুটে।
বুট নিয়ে বিশ্বকাপের সবচেয়ে আলোচিত গল্পগুলোর একটি ভারতের। ভারত ১৯৫০ সালে ব্রাজিল বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ পেয়েছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত দল পাঠায়নি। বলা হয়, ভারতীয় ফুটবলাররা খালি পায়ে খেলতে চেয়েছিলেন এবং ফিফা বুট ছাড়া খেলতে না দেওয়ায় দেশটি বিশ্বকাপ থেকে সরে যায়। সত্য-মিথ্যার বিতর্ক থাকলেও এই ঘটনাটি আজও বিশ্বকাপের সবচেয়ে আলোচিত কিংবদন্তিগুলোর একটি।
এর আগে, ১৯৪৮ সালের লন্ডন অলিম্পিকে ফ্রান্সের বিপক্ষে ভারতীয় দলের অধিকাংশ খেলোয়াড় খালি পায়ে বা পায়ে কাপড় বেঁধে খেলেছিলেন। তাঁরা ম্যাচটি ২–১ গোলে হারলেও তাঁদের সাহসী উপস্থিতি সেদিন পুরো ফুটবল বিশ্বকে বিস্মিত করেছিল।
বুট যে খেলার সরঞ্জাম থেকে বিরাট ব্যবসায় পরিণত হয়েছে, তার সবচেয়ে মজার উদাহরণ ফুটবলের রাজা পেলে। ১৯৭০ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপে ব্রাজিল ও পেরুর কোয়ার্টার ফাইনাল শুরুর আগে পেলে হঠাৎ নিচু হয়ে জুতার ফিতা বাঁধতে শুরু করেন। খেলা শুরুর আগে ক্যামেরা তাঁর পায়ের দিকে ঘুরে আসে এবং টেলিভিশনের পর্দায় স্পষ্ট দেখা যায় পুমার বুট।
ঘটনাটি আকস্মিক ছিল না। পেলে যেন ক্যামেরার সামনে বুটের ফিতা বাঁধেন, সে জন্য পুমা কোম্পানির সঙ্গে তাঁর বিশেষ চুক্তি হয়েছিল বলে পরবর্তী সময়ে জানা যায়। কয়েক সেকেন্ডের সেই দৃশ্য কোটি দর্শকের সামনে পুমার নাম পৌঁছে দেয়। আধুনিক ক্রীড়া বিপণনের ইতিহাসে এটি সবচেয়ে চতুর বিজ্ঞাপনী কৌশলগুলোর একটি হয়ে আছে। পেলে সেদিন শুধু ফিতা বাঁধেননি, ফুটবলার ও বুট কোম্পানির সম্পর্কের নতুন যুগও খুলে দিয়েছিলেন।
বুটের রঙের চেয়েও খেলোয়াড়ের কাছে গুরুত্বপূর্ণ তাঁর ব্যক্তিগত স্মৃতি। অনেকেই বুটে সন্তানের নাম, জন্মতারিখ, দেশের পতাকা কিংবা পরিবারের কোনো প্রিয় মানুষের নাম লিখে রাখেন। কারও বুটে থাকে নিজের শহরের ডাকসংকেত, কারওটিতে শৈশবের স্মৃতি। দোকানে একই রকম দেখতে বুট পাওয়া গেলেও তারকারা সাধারণত নিজের পায়ের মাপ ও পছন্দ অনুযায়ী বদলে নেওয়া সংস্করণ ব্যবহার করেন। বাইরে থেকে সব বুট একই রকম দেখালেও ভেতরে সেটি অনেক সময় একজন খেলোয়াড়ের জন্য আলাদাভাবে তৈরি করা হয়।
কুসংস্কারের গল্পও কম নেই। যে বুট পরে গোল এসেছে, অনেক খেলোয়াড় সেটি সহজে ছাড়তে চান না। সামান্য ছিঁড়ে গেলে নতুন বুট নেওয়ার বদলে পুরোনোটিই মেরামত করান। কেউ ডান পায়ের বুট আগে পরেন, কেউ মাঠে নামার আগে বুট ছুঁয়ে প্রার্থনা করেন। বিজ্ঞান এতটা এগিয়ে যাওয়ার পরও অনেক ফুটবলারের মনে এমন কিছু পুরোনো বিশ্বাস রয়ে গেছে, যার ব্যাখ্যা গবেষণাগারে পাওয়া যায় না।
বিশ্বকাপ ঘিরে বুটের বাজারও বিশাল। এই আসরকে সামনে রেখে বড় বড় বুট কোম্পানিগুলো বিপণন এবং তারকা খেলোয়াড়দের সঙ্গে চুক্তিতে বিপুল অর্থ ব্যয় করে। অ্যাডিডাস, নাইকি ও পুমার পাশাপাশি অন্য প্রতিষ্ঠানগুলো তারকা খেলোয়াড়দের সঙ্গে চুক্তি করে বিশ্বমঞ্চে জায়গা পাওয়ার চেষ্টা করে। একটি স্মরণীয় গোলের রিপ্লেতে কয়েক সেকেন্ডের জন্য বুটের লোগো দেখা যাওয়াও মূল্যবান বিজ্ঞাপন। তরুণ সমর্থকেরা প্রিয় খেলোয়াড়ের মতো একই বুট পরতে চান। ফলে গোলটি মাঠে একটি দলের জয় এনে দেয়, আবার মাঠের বাইরে একটি বুটের বিক্রিও বাড়িয়ে দিতে পারে।
তবে পৃথিবীর সবচেয়ে দামি কিংবা আধুনিক বুট কাউকে রাতারাতি বড় ফুটবলার বানায় না। বুট গতি দেয় না, তবে খেলোয়াড়কে স্বচ্ছন্দে দৌড়াতে সাহায্য করে। বুট প্রতিভা তৈরি করে না, তবে সেই প্রতিভাকে বাধাহীনভাবে প্রকাশের সুযোগ দেয়। গোলের আসল কারিগর খেলোয়াড়ই। তবে সেই মুহূর্তের বিশ্বস্ত সহযোদ্ধা হয়ে তাঁর পায়ের সঙ্গে থাকে একজোড়া বুট।
তথ্যসুত্র:
Financial Times
PUMA History
National Football Museum, UK









