সম্পাদকের পাতা

সৌদি আরবের সাথে কানাডার কূটনীতির নতুন অধ্যায়

নজরুল মিন্টো

কানাডা এখন বিশ্ববাণিজ্যের নতুন মানচিত্রে নিজের অবস্থান শক্ত করতে চাইছে। দীর্ঘদিনের প্রধান বাজার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শুল্ক ও বাণিজ্য নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়ায় প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি ইউরোপ, এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের বড় অর্থনীতিগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক বিস্তারে নেমেছেন। সেই উদ্যোগের সর্বশেষ ও সবচেয়ে আলোচিত পদক্ষেপ তাঁর সৌদি আরব সফর। মধ্যপ্রাচ্যে কানাডার দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার সৌদি আরবের সঙ্গে ১৩টি বাণিজ্যিক চুক্তি ও সমঝোতা হয়েছে, যার মোট ঘোষিত মূল্য এক বিলিয়ন কানাডীয় ডলারের বেশি। কার্নির লক্ষ্য শুধু নতুন বাজার খোঁজা নয়; তিনি কানাডার অর্থনীতিকে আরও স্বনির্ভর, বহুমুখী এবং বৈশ্বিক ঝুঁকি মোকাবিলায় সক্ষম করে তুলতে চান।

গত ৮ থেকে ১০ জুলাইয়ের সৌদি আরব সফরে কার্নি যুবরাজ ও প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে বৈঠক করেন। জেদ্দায় দুই নেতার করমর্দন শুধু একটি সৌজন্য সাক্ষাৎ ছিল না। এর পেছনে ছিল মানবাধিকারের প্রশ্নে ২০১৮ সালে গভীর সংকটে পড়া দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারের ওপর কানাডার অতিরিক্ত নির্ভরতা এবং তেলের বাইরে নতুন অর্থনীতি গড়ে তুলতে সৌদি আরবের বিপুল বিনিয়োগ পরিকল্পনা। ২০২৩ সালে পূর্ণ কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হলেও সর্বোচ্চ রাজনৈতিক পর্যায়ে যোগাযোগের ঘাটতি ছিল। ২৬ বছরের মধ্যে এটিই ছিল কোনো কানাডীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রথম সৌদি সফর।

সফরের পর কার্নি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বলেছেন, সৌদি আরবের সঙ্গে কানাডার সম্পর্কের সম্ভাবনার সামান্য অংশই এখন পর্যন্ত কাজে লাগানো হয়েছে। খনিজসম্পদ, পরিচ্ছন্ন প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, কৃষি ও অবকাঠামোতে দুই দেশের একসঙ্গে কাজ করার বড় সুযোগ রয়েছে। সৌদি আরবের অর্থনীতির আকার প্রায় ১ দশমিক ৮ ট্রিলিয়ন ডলার। দেশটির ভিশন ২০৩০ কর্মসূচির আওতায় নতুন শহর, রেলপথ, স্বাস্থ্যসেবা, প্রযুক্তি, পর্যটন ও শিল্প খাতে বিপুল অর্থ ব্যয় হচ্ছে। কানাডা সেই বাজারে তার প্রযুক্তি, প্রকৌশল দক্ষতা, শিক্ষা ও প্রাকৃতিক সম্পদ নিয়ে প্রবেশ করতে চায়।

কানাডীয় ও সৌদি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে হওয়া ১৩টি চুক্তি ও সমঝোতায় স্বাস্থ্যপ্রযুক্তি, খনি, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ, অবকাঠামো ও প্রতিরক্ষা খাত অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। কানাডীয় কোম্পানিগুলো সৌদি আরবের সড়ক, রেলপথ ও বড় নির্মাণ প্রকল্পে কাজ করার সুযোগ পেতে পারে। স্বাস্থ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো রোগী পর্যবেক্ষণ, চিকিৎসকদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা এবং অস্ত্রোপচারে ব্যবহৃত প্রযুক্তি সরবরাহ করবে। কানাডার কলেজ ও প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানগুলো নির্মাণ, কারিগরি পেশা, চিকিৎসা ও প্রযুক্তি খাতের জন্য সৌদি কর্মীদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিকল্পনাতেও যুক্ত হচ্ছে।

সৌদি আরবের খনি অনুসন্ধান, উত্তোলন ও প্রক্রিয়াজাতকরণে কানাডার অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে। দেশটির খনি অনুসন্ধান লাইসেন্সের সবচেয়ে বড় অংশ ইতিমধ্যে কানাডীয় প্রতিষ্ঠানগুলো পেয়েছে। একই সঙ্গে কানাডার তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, হাইড্রোজেন এবং কার্বন ধরে রাখা ও সংরক্ষণ প্রযুক্তিতে সৌদি বিনিয়োগ আনার চেষ্টা চলছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় কানাডার কোহিয়ার ও সৌদি প্রতিষ্ঠান হিউমেইনের সহযোগিতা দুই দেশের প্রযুক্তি ও বিনিয়োগ সম্পর্ককে নতুন পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারে।

দুই দেশের বিমান যোগাযোগেও নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে। সাউদিয়া বর্তমানে টরন্টো ও জেদ্দার মধ্যে সপ্তাহে পাঁচটি সরাসরি ফ্লাইট পরিচালনা করছে। সম্প্রসারিত বিমান চলাচল চুক্তি অনুযায়ী, দুই দেশের এয়ারলাইনগুলো দেশপ্রতি সম্মিলিতভাবে সপ্তাহে সর্বোচ্চ ১৪টি যাত্রীবাহী এবং সীমাহীন কার্গো ফ্লাইট পরিচালনা করতে পারবে। বিমান সংস্থাগুলো চাইলে এই সুবিধা এখনই ব্যবহার করতে পারে।

সফরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক অর্জন কানাডা ও সৌদি আরব সমন্বয় পরিষদ গঠনের সিদ্ধান্ত। দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের নেতৃত্বে এই পরিষদ বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রতিরক্ষা, শিক্ষা, বিজ্ঞান, সংস্কৃতি ও কনস্যুলার বিষয় নিয়ে নিয়মিত কাজ করবে। এর ফলে ভবিষ্যতে সম্পর্কটি কেবল বিচ্ছিন্ন সফর বা তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে না।

বিনিয়োগকারীদের আইনি সুরক্ষা দিতে একটি চুক্তির আলোচনা ২০২৭ সালের শুরুর মধ্যে শেষ করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। একই আয়ের ওপর দুই দেশে কর দিতে না হয়, সে জন্য নতুন করচুক্তির আলোচনাও শুরু হয়েছে। এসব ব্যবস্থা কার্যকর হলে কানাডীয় ও সৌদি প্রতিষ্ঠানের পারস্পরিক বিনিয়োগ সহজ হবে। সেপ্টেম্বরে টরন্টোয় অনুষ্ঠেয় বৈশ্বিক বিনিয়োগ সম্মেলনে সৌদি বিনিয়োগকারীদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। কার্নির মতে, কানাডার নিজস্ব পুঁজি থাকলেও বড় অবকাঠামো, জ্বালানি ও প্রযুক্তি প্রকল্প দ্রুত এগিয়ে নিতে বিদেশি বিনিয়োগের সঙ্গে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা, প্রযুক্তি ও ব্যবসায়িক যোগাযোগ প্রয়োজন। প্রয়োজন হলে সরকার প্রাথমিক ঝুঁকির অংশ নেবে, যাতে পরে বেসরকারি পুঁজি এগিয়ে আসে।

মার্ক কার্নির সৌদি সফর তাই কয়েকটি ব্যবসায়িক চুক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি কানাডাকে আরও স্বনির্ভর ও কৌশলগতভাবে শক্তিশালী করার বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ। তবে এই উদ্যোগের প্রকৃত মূল্য বোঝা যাবে তখনই, যখন ঘোষিত সমঝোতাগুলো বাস্তব প্রকল্প, রপ্তানি, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে রূপ নেবে।

তথ্যসূত্র:
Prime Minister Mark Carney (July 10, 2026)
Toronto Pearson International Airport (July 11, 2026)
Reuters (July 9, 2026)


Back to top button
🌐 Read in Your Language