সম্পাদকের পাতা

বৃটেনে বাংলাদেশি বংশদ্ভুতসহ ৯০ লাখ মুসলমানের নাগরিকত্ব ঝুঁকিতে

নজরুল মিন্টো

নাগরিকত্ব, নিরাপত্তা আর পরিচয়ের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে যুক্তরাজ্যের মুসলিম কমিউনিটি।

ব্রিটেনের ইতিহাসে মুসলমানদের আগমন কোনো নতুন ঘটনা নয়। উপনিবেশিক যুগ থেকেই ভারতীয় উপমহাদেশের মানুষরা কাজ, শিক্ষা ও বাণিজ্যের সূত্রে ব্রিটেনে আসতে শুরু করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর শিল্পকারখানা, পরিবহন, নির্মাণ ও স্বাস্থ্যখাতে শ্রমঘাটতি যখন তীব্র, তখনই দক্ষিণ এশিয়া থেকে বেশি করে মানুষ আসতে শুরু করে। পাকিস্তান, ভারত এবং বাংলাদেশ থেকে আসা বহু মানুষ প্রথমে ছিলেন শ্রমিক। পরে সময়ের সঙ্গে তারা স্থায়ী হলেন, পরিবার গড়লেন, সন্তানদের শিক্ষা দিলেন, কর দিলেন, ভোটাধিকার অর্জন করলেন এবং নাগরিকত্বের শপথ নিয়ে ব্রিটিশ সমাজের অংশ হয়ে উঠলেন।

আজ তারা আর কেবল অভিবাসী গোষ্ঠী নন। জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায় তাদের চিকিৎসক, নার্স ও কেয়ারাররা দিনরাত কাজ করে ব্রিটেনের স্বাস্থ্যখাতকে সচল রাখছেন। ছোট শহর থেকে বড় নগর পর্যন্ত তাদের দোকান, রেস্টুরেন্ট, ট্যাক্সি ও পরিবহন ব্যবসা, আইটি প্রতিষ্ঠান, আইন ও হিসাবরক্ষণ পেশা এবং নানা উদ্যোক্তা উদ্যোগ দেশটির অর্থনীতিতে দৃশ্যমান অবদান রেখে চলেছে।

অর্থনীতি ছাড়াও স্থানীয় রাজনীতিতে তাদের অংশগ্রহণ ক্রমেই সুদৃঢ় হয়েছে। কাউন্সিলর হিসেবে স্থানীয় সেবা ও নীতিনির্ধারণে ভূমিকা রাখা থেকে শুরু করে মেয়র ও সংসদ সদস্য হিসেবে জাতীয় রাজনীতিতে প্রতিনিধিত্ব পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে তাদের উপস্থিতি। স্কুল বোর্ড, চ্যারিটি সংগঠন, কমিউনিটি ট্রাস্ট ও নাগরিক প্ল্যাটফর্মে সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে তারা শুধু নিজেদের কমিউনিটির স্বার্থই নয়, বরং সামগ্রিকভাবে ব্রিটিশ সমাজের সামাজিক বুননকে সমৃদ্ধ করেছেন।

এই বাস্তবতার বিপরীতে এখন উঠে এসেছে এক অস্বস্তিকর প্রশ্ন! নাগরিকত্ব কি সবার জন্য সমান? নাকি কোনো কোনো জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে তা কেবল প্রশাসনিক বিবেচনার ওপর দাঁড়িয়ে থাকা একটি শর্তসাপেক্ষ সনদ?

রানিমিড ট্রাস্ট ও রিপ্রিভের সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, যুক্তরাজ্যে প্রায় ৯০ লাখ মুসলমান, অর্থাৎ জনসংখ্যার প্রায় ১৩ শতাংশ এমন অবস্থায় আছেন যেখানে ব্রিটিশ ন্যাশনালিটি অ্যাক্টের আওতায় স্বরাষ্ট্রসচিবের বিবেচনায় তাদের নাগরিকত্ব বাতিল করা আইনগতভাবে সম্ভব। এই ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি যাদের বাবা মা বিদেশে জন্মেছেন বা যাদের বংশগত সূত্র অন্য দেশের নাগরিকত্বের সম্ভাবনা তৈরি করে।

গবেষণাটি আরও বলছে, বাংলাদেশি, পাকিস্তানি, ভারতীয়, মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকান বংশোদ্ভূত জনগোষ্ঠীর মধ্যে ঝুঁকির মাত্রা অসমভাবে বেশি। এসব জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে প্রতি তিন জনে প্রায় দুই জন এই ক্ষমতার আওতায় পড়তে পারেন, যেখানে শ্বেতাঙ্গদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে অনেক কম।

এখনকার রাজনৈতিক পরিবেশে এই বাস্তবতা মুসলমান কমিউনিটিতে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। বিশেষ করে উপমহাদেশীয় পরিবারগুলোর অনেকেই মনে করছেন, নাগরিকত্বের আড়ালে তাদের নিরাপত্তা আর আগের মতো নির্ভরযোগ্য নেই। অনেকের আশঙ্কা, এই ক্ষমতা অতীতের বিচার ছাড়িয়ে ভবিষ্যতের রাজনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত হতে পারে।

ব্রিটেনে মুসলমানদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় এবং বারবার উচ্চারিত অভিযোগ হলো সন্ত্রাসবাদে জড়িত থাকার সন্দেহ। বাস্তব হলো, যুক্তরাজ্য কয়েকটি বড় হামলার ধাক্কা সহ্য করেছে, যেগুলোর সঙ্গে ইসলামি উগ্রবাদী বয়ান যুক্ত ছিল।

৭ জুলাই ২০০৫ লন্ডনের পরিবহন ব্যবস্থায় বোমা হামলায় ৫২ জন নিহত হন এবং শত শত মানুষ আহত হন। এই ঘটনাটি জাতীয় স্মৃতিতে গভীর দাগ রেখে যায়, এবং নিরাপত্তা নীতি ও জনমতের ধারাও বদলে দেয়।

পরবর্তী সময়ে ২০১৩ সালে দক্ষিণ লন্ডনের উলউইচে সৈনিক লি রিগবিকে প্রকাশ্যে হত্যা করা হয়। এই ঘটনার পর দেশজুড়ে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে এবং মুসলমানদের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়াও তীব্র হয়। রয়টার্সের বর্ণনায় দেখা যায়, ঘটনার পর ইসলামবিরোধী ক্ষোভ বাড়ে, মসজিদের ওপর হামলার ঘটনাও আলোচনায় আসে, ফলে নিরাপত্তা প্রসঙ্গের সঙ্গে সামাজিক উত্তাপও জড়িয়ে যায়।

২০১৭ সালে ম্যানচেস্টার অ্যারেনায় কনসার্ট শেষে বোমা হামলায় ২২ জন নিহত হন। এই হামলার অভিঘাত শুধু নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে নয়, মুসলমান কমিউনিটিকেও দীর্ঘদিনের জন্য সন্দেহের মুখে দাঁড় করিয়ে দেয়।

একই বছর ৩ জুন লন্ডন ব্রিজ ও বরো মার্কেট এলাকায় গাড়ি চাপা দেওয়া ও ছুরিকাঘাতে আট জন নিহত হন। এসব ঘটনায় দায় ছিল ব্যক্তিদের, কিন্তু তার সামাজিক প্রতিক্রিয়া ছড়িয়ে পড়ে পুরো মুসলমান কমিউনিটির ওপর।

এই বড় ঘটনাগুলোই পরবর্তী সময়ে একটি বৃহত্তর সামাজিক প্রবণতা তৈরি করে। কিছু রাজনৈতিক ভাষ্যকার এবং কট্টরপন্থী গোষ্ঠী এই হামলাগুলোকে কেন্দ্র করে এমন এক বয়ান দাঁড় করাতে চেয়েছে, যেখানে পুরো মুসলমান কমিউনিটিকে সন্দেহের তালিকায় রাখা হয়।

ফল হিসেবে দেখা যায়, একটি অপরাধীর দায় ক্রমে বহু মানুষের পরিচয়ের ওপর চাপানো হয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় মিডিয়ার কিছু অংশের অতিরঞ্জিত শিরোনাম, অনলাইন বিদ্বেষ, এবং নিরাপত্তার নামে দৈনন্দিন জীবনে অদৃশ্য নজরদারির অনুভূতি।

বিশেষজ্ঞরা বহুবার বলেছেন, এসব হামলার জন্য দায়ী ব্যক্তিরা ব্রিটিশ মুসলমানদের প্রতিনিধি নয়, বরং তারা যে ধর্মীয় যুক্তি হাজির করে, তা ব্রিটিশ মুসলমান নেতৃত্ব ও মূলধারার ইসলাম প্রত্যাখ্যান করে। তবু সামাজিক প্রতিক্রিয়ার ঢেউ অনেকের নাগরিক মর্যাদাকে আঘাত করেছে, বিশেষ করে যখন নিরাপত্তা নীতির প্রয়োগে পরিচয় এবং বংশগত সূত্র বড় হয়ে ওঠে।

নাগরিকত্ব বাতিলের মূল আইনগত ভিত্তি ব্রিটিশ ন্যাশনালিটি অ্যাক্ট ১৯৮১ এর সেকশন ৪০। এখানে কয়েকটি বড় ভিত্তি থাকে। প্রথমত, নাগরিকত্ব যদি প্রতারণা, মিথ্যা তথ্য বা তথ্য গোপনের মাধ্যমে অর্জিত হয়ে থাকে, তবে তা বাতিল হতে পারে।

দ্বিতীয়ত, আর সবচেয়ে বিতর্কিত অংশ হলো সেকশন ৪০(২), যেখানে বলা হয় জনস্বার্থের খাতিরে নাগরিকত্ব বাতিল করা যেতে পারে। সমালোচকদের মতে, ‘জনস্বার্থ’ শব্দটির কোনো স্পষ্ট সংজ্ঞা না থাকায় এটি রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যাখ্যার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা হলো দ্বৈত নাগরিকত্ব বা সম্ভাব্য অন্য নাগরিকত্বের ধারণা। আইন রাষ্ট্রহীনতা নিষিদ্ধ করে, কিন্তু বাস্তবে সরকার কখনও কখনও ধরে নেয় যে কেউ অন্য দেশের নাগরিকত্ব পেতে পারেন। এই অনুমানের ওপর দাঁড়িয়ে নাগরিকত্ব বাতিল হলে ব্যক্তি দীর্ঘ সময় আইনি অনিশ্চয়তায় পড়ে যেতে পারেন।

নাগরিকত্ব হারানো বৃটিশ তরুণী শামিমা বেগম (২৪)

সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা শামিমা বেগমের। লন্ডনে জন্ম নেওয়া এই তরুণী বেথনাল গ্রিনের একটি সাধারণ পরিবারে বড় হন। ২০১৫ সালে মাত্র ১৫ বছর বয়সে তিনি সিরিয়ায় চলে যান, যেখানে তথাকথিত ইসলামিক স্টেটের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় উপস্থিত থাকার অভিযোগ ওঠে। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই শামিমা বেগম ব্রিটিশ রাজনীতি, নিরাপত্তা নীতি এবং নাগরিকত্ব আইন নিয়ে এক গভীর বিতর্কের কেন্দ্রে পরিণত হন।

২০১৯ সালে যুক্তরাজ্যের তৎকালীন হোম সেক্রেটারি তাঁর ব্রিটিশ নাগরিকত্ব বাতিলের সিদ্ধান্ত নেন। যুক্তি হিসেবে বলা হয়, শামিমা বেগম জন্মসূত্রে বা বংশগত কারণে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব পাওয়ার যোগ্য হতে পারেন। এই সিদ্ধান্তের ফলে তিনি কার্যত ব্রিটেনের নাগরিকত্ব হারান এবং সিরিয়ার একটি শরণার্থী শিবিরে আটকে পড়েন। তবে বাংলাদেশ সরকার দ্রুত ও স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয় যে শামিমা বেগম বাংলাদেশের নাগরিক নন এবং তিনি কখনও বাংলাদেশি নাগরিকত্ব পাননি বা পাওয়ার যোগ্য নন।

এই অবস্থায় শামিমা বেগম দীর্ঘ সময় কার্যত রাষ্ট্রহীন হয়ে থাকেন। ব্রিটেনে ফিরে এসে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ, আদালতে উপস্থিত হয়ে নিজের বক্তব্য দেওয়ার অধিকার এবং ন্যায্য বিচার প্রক্রিয়ার সুযোগ থেকে তিনি বঞ্চিত হন। তাঁর আইনজীবীরা যুক্তি দেন, একজন অপ্রাপ্তবয়স্ককে বিদেশে রেখে নাগরিকত্ব বাতিল করা আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকার নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তারা আরও বলেন, জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন থাকলেও নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়া বিচার ব্যবস্থার বিকল্প হতে পারে না।

এই মামলা একাধিক নিম্ন ও উচ্চ আদালত হয়ে সর্বোচ্চ আদালত পর্যন্ত গড়ায়। কখনও আদালত সরকারের সিদ্ধান্তের পক্ষে রায় দেয়, কখনও মানবাধিকার প্রশ্নে উদ্বেগ প্রকাশ করে। দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পরেও শামিমা বেগম ব্রিটেনে ফেরার সুযোগ পাননি। নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা ঝুঁকির যুক্তি দেখিয়ে সরকার তাঁকে দেশে ফিরতে দেওয়ার বিরোধিতা করে।

শামিমা বেগমের ঘটনা ব্রিটিশ মুসলমান কমিউনিটির কাছে শুধু একটি ব্যক্তিগত কাহিনি নয়। এটি একটি সতর্কবার্তা হয়ে ওঠে। এই ঘটনা দেখিয়ে দেয়, জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব থাকলেও, পরিবার ও শিকড় এই দেশে হলেও, রাষ্ট্রের প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে সেই নাগরিকত্ব কতটা ভঙ্গুর হয়ে যেতে পারে। বিশেষ করে যাদের বংশগত সূত্র অন্য দেশের সঙ্গে যুক্ত, তাদের ক্ষেত্রে নাগরিকত্ব যে চূড়ান্ত নিরাপত্তা নয়, বরং শর্তসাপেক্ষ একটি পরিচয়ে রূপ নিতে পারে, শামিমা বেগমের ঘটনাই তার সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আরও উদ্বেগজনক হলো, ২০২২ সালের আইন অনুযায়ী নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে কাউকে আগাম নোটিশ না দিয়েই নাগরিকত্ব বাতিল করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে সরকারকে। এর ফলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি জানতেও পারেন না কখন, কী যুক্তিতে বা কোন প্রক্রিয়ায় তাঁর নাগরিকত্ব বাতিল করা হয়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, এটি আত্মপক্ষ সমর্থনের মৌলিক অধিকারকে মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন করে এবং ভুল বা বৈষম্যমূলক সিদ্ধান্তের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

২০২৫ সালে কার্যকর হওয়া নতুন আইন পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। এই আইনে বলা হয়, আদালত নাগরিকত্ব বাতিলকে অবৈধ ঘোষণা করলেও সরকারের আপিল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত নাগরিকত্ব স্বয়ংক্রিয়ভাবে ফিরে আসবে না। সমালোচকদের মতে, এতে আইনি বিজয়ও বাস্তবে অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।

মুসলমানদের বাস্তব অভিজ্ঞতায় বৈষম্য কেবল নাগরিকত্ব বাতিলের হুমকিতে সীমিত নয়। বিগত দিনগুলোতে চাকরির বাজারে পরিচয় দেখে অতিরিক্ত যাচাই, বিমানবন্দরে বাড়তি জিজ্ঞাসাবাদ, অনলাইনে বিদ্বেষ, হেট ক্রাইমের আশঙ্কা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে কটূক্তি, এসব অভিজ্ঞতা বহু পরিবারকে মানসিকভাবে ক্লান্ত করেছে।

৭ জুলাই ২০০৫ এর পর দীর্ঘ সময় ধরে বহু ব্রিটিশ মুসলমান বলেছেন, তারা এক ধরনের অযৌক্তিক সন্দেহের ভার বয়ে বেড়াচ্ছেন। নিরাপত্তা নীতির ছায়া যখন দৈনন্দিন জীবনে ঢুকে পড়ে, তখন রাষ্ট্রের সঙ্গে নাগরিকের সম্পর্ক বিশ্বাসের জায়গা থেকে সরতে থাকে।

এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মুসলমান কমিউনিটির বড় অংশ নিরাপত্তা চায়, সন্ত্রাসবাদকে নিন্দা করে, এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সহযোগিতার পক্ষেই থাকে। তবু নীতির প্রয়োগ যদি ধারাবাহিকভাবে একটি ধর্মীয় ও জাতিগত গোষ্ঠীর ওপর বেশি পড়ে, তাহলে সেটি বৈষম্যের প্রশ্ন তোলে।

রানিমিড ও রিপ্রিভের প্রতিবেদনের ভাষায়, এটি একটি দুই স্তরের অন্তর্ভুক্তির ব্যবস্থা তৈরি করে, যেখানে কারও নাগরিকত্ব জন্মসূত্রে নিরাপদ, আর কারও নাগরিকত্ব সম্ভাব্য অন্য নাগরিকত্বের অজুহাতে বাতিলযোগ্য।

সরকারি যুক্তি হলো, জাতীয় নিরাপত্তা। কোনো ব্যক্তি যদি সন্ত্রাসবাদে জড়িত হন বা রাষ্ট্রের জন্য বড় ঝুঁকি হন, তবে নাগরিকত্ব বাতিল করে তাদের ব্রিটেন থেকে দূরে রাখা সহজ হয়। ২০২৫ সালের আইনের ব্যাখ্যা নথিতেও এই ধরনের যুক্তি পাওয়া যায়। আপিল চলাকালে নাগরিকত্ব পুনর্বহাল না হলে ঝুঁকিপূর্ণ কেউ দেশে ফিরতে পারবেন না।

তবে প্রশ্ন রয়ে যায়। এই ব্যবস্থা কি সত্যিই নিরাপত্তা বাড়ায়, নাকি নিরাপত্তার ভাষায় রাজনৈতিক সুবিধা বাড়ায়। কারণ নাগরিকত্ব বাতিল হলে ব্যক্তি দেশের বাইরে থেকেও উগ্রবাদে জড়াতে পারেন, আবার ভুল সিদ্ধান্ত হলে একজন নির্দোষ নাগরিককে রাষ্ট্রহীনতার ঝুঁকিতে ফেলাও সম্ভব। একটি শক্ত রাষ্ট্রের কাজ হওয়া উচিত অপরাধ প্রমাণ হলে বিচার করা, এবং শাস্তি কার্যকর করা। নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়া যখন শাস্তির মতো ব্যবহৃত হয়, তখন তা বিচার প্রক্রিয়ার বাইরের একটি প্রশাসনিক আঘাতে পরিণত হয় বলে সমালোচকেরা মনে করেন।

নাগরিকত্ব বাতিল মানে শুধু একটি আইনি অবস্থার পরিবর্তন নয়। এর ফলে কাজের অধিকার ঝুলে যায়, ভ্রমণ সীমিত হয়, ব্যাংকিং ও পরিচয়সংক্রান্ত জটিলতা তৈরি হয়, এবং স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক সুরক্ষায় অনিশ্চয়তা নেমে আসে। একই সঙ্গে ক্ষতি বহন করে পুরো কমিউনিটি। একাধিক ঘটনার পর যখন সন্দেহের মেঘ ঘনিয়ে আসে, তখন স্কুলে শিশুরা প্রশ্নের মুখে পড়ে, কর্মক্ষেত্রে মানুষ আত্মরক্ষামূলক হয়ে ওঠে, এবং সামাজিক বন্ধন ধীরে ধীরে দুর্বল হয়। এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ে ব্রিটেনের বহুত্ববাদী পরিচয়ের ওপরও, কারণ নাগরিকত্বকে শর্তসাপেক্ষ করা হলে নাগরিক সমতার ধারণাটিই ক্ষয়ে যেতে থাকে।

রানিমিড ট্রাস্ট ও রিপ্রিভ নাগরিকত্ব বাতিলের ওপর স্থগিতাদেশ, জনস্বার্থ ভিত্তিক ধারার বাতিল, এবং অতীতে এই ধারায় যারা নাগরিকত্ব হারিয়েছেন তাদের বিষয়ে পুনর্বিবেচনার দাবি তুলেছে।

এই প্রতিবেদন এমন এক সময়ে প্রকাশিত হলো, যখন যুক্তরাজ্যের কনজারভেটিভ ও রিফর্ম ইউকে দলের রাজনীতিকেরা অভিবাসন ও নাগরিকত্ব নিয়ে আরও কঠোর ভাষায় কথা বলছেন। উভয় দলই এমন পরিকল্পনার ইঙ্গিত দিয়েছে, যার মাধ্যমে আইনগতভাবে বসবাসকারী বিপুলসংখ্যক মানুষকে দেশত্যাগে বাধ্য করা হতে পারে। মুসলিম সংগঠনগুলোর আশঙ্কা, এই রাজনৈতিক আবহে নাগরিকত্ব বাতিলের ক্ষমতা আরও আগ্রাসীভাবে প্রয়োগ করা হতে পারে।

যুক্তরাজ্যের বর্তমান হোম সেক্রেটারি শাবানা মাহমুদ

যুক্তরাজ্যের বর্তমান হোম সেক্রেটারি শাবানা মাহমুদ, যিনি ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫ থেকে দায়িত্বে আছেন, তার হাতে এই ক্ষমতার বড় অংশ কেন্দ্রীভূত।

নীতির প্রয়োগ কীভাবে হবে, তা অনেকটাই নির্ভর করবে রাজনৈতিক পরিবেশ, নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের মূল্যায়ন এবং আদালতের নজরদারির ওপর। কিন্তু মুসলমান কমিউনিটি বলছে, এই প্রশ্ন এখন সরাসরি তাদের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে। আমার জন্ম এই দেশে, আমার সন্তান এই দেশের স্কুলে পড়ে, আমি কর দিই, আমি ভোট দিই, তবু কেন আমার নাগরিকত্ব অন্যের তুলনায় কম নিশ্চিত। তাদের বক্তব্য স্পষ্ট। নাগরিকত্ব কোনো অনুগ্রহ নয়। এটি একটি মৌলিক অধিকার। কোনো নাগরিকের পরিচয়, ধর্ম বা বংশের ভিত্তিতে এই অধিকার শর্তসাপেক্ষ করা হলে তা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ভিত্তিকে দুর্বল করে।

ব্রিটেনের মুসলমান কমিউনিটি আজ শুধু নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে নয়, ব্রিটেনের ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রশ্ন তুলছে। এই দেশ কি সত্যিই সবার? নাকি প্রথম শ্রেণীর নাগরিক, দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক বলেও কিছু আছে?

এই প্রশ্নের উত্তর শুধু মুসলমানদের ভাগ্য নির্ধারণ করবে না। এটি নির্ধারণ করবে ব্রিটেন নাগরিকত্বকে কীভাবে দেখে। সমান অধিকার, সমান সুরক্ষা, এবং সমান মর্যাদার ধারণা যদি আইন ও নীতির ভেতর দ্বিস্তরীয় বাস্তবতায় পরিণত হয়, তবে রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তিই দুর্বল হয়ে যায়। নিরাপত্তা অবশ্যই জরুরি, কিন্তু নিরাপত্তার নামে নাগরিকত্বকে অনিশ্চয়তার রেখায় দাঁড় করালে সেই নিরাপত্তাই শেষ পর্যন্ত সামাজিক ভাঙন ডেকে আনতে পারে।

তথ্যসূত্র:

Runnymede Trust & Reprieve
প্রকাশকাল: ডিসেম্বর ২০২৫

Middle East Eye (MEE)
প্রকাশ: ১১ ডিসেম্বর ২০২৫


Back to top button
🌐 Read in Your Language