সম্পাদকের পাতা

লুটনের বিষন্ন বিশপস্কোট রোড

নজরুল মিন্টো

ওয়ারিয়াম হুসেইন

লুটন—ইংল্যান্ডের বেডফোর্ডশায়ার কাউন্টিতে অবস্থিত একটি কর্মচঞ্চল শহর, লন্ডন থেকে প্রায় চল্লিশ মাইল উত্তরে। এখানে নেই লন্ডনের জাঁকজমক, নেই অক্সফোর্ডের ইতিহাস, তবে আছে এক নিজস্ব ছন্দ—যে ছন্দে মিশে আছে বহু জাতিগোষ্ঠীর প্রাণস্পন্দন। শহরের মাঝখানে দিয়ে চলে গেছে বিস্তৃত রেললাইন, চারদিকে ছড়ানো পুরনো ইট-সুরকির দালান, ছোট ছোট দোকানপাট, এবং একেকটি রাস্তার মোড়ে ফুটে থাকা বহুজাতিক জীবনচিত্র।

লুটনের বাংলাদেশি কমিউনিটি এখানে এক দৃঢ় অবস্থান গড়ে তুলেছে। ষাট ও সত্তরের দশকে সিলেট থেকে আগত অভিবাসীরা ছিলেন এই শহরের ভিত্তি গড়ার কারিগর। আজ তাদের পরবর্তী প্রজন্ম যুক্তরাজ্যের নাগরিক হয়ে পড়াশোনা করছে, ব্যবসা চালাচ্ছে, বা বিভিন্ন খাতে কাজ করছে। স্কুল-কলেজে পড়ুয়া ছেলেমেয়েরা ইংরেজি কবিতা মুখস্থ করে, আবার বাড়ি ফিরে মা-বাবার কাছ থেকে শেখে সিলেটি উপভাষায় আদর-শাসনের ভাষা। এখানে আছে বাংলাদেশি রেস্টুরেন্ট, হালাল মাংসের দোকান, টেইলার্স ও সেলুন।

ওয়ারিয়াম হুসেইন—মাত্র ২০ বছর বয়স। সবার প্রিয়, হাসিখুশি এক তরুণ। বাড়ি ছিল সিলেট জেলার বালাগঞ্জ উপজেলায়। বাবা মা দুজনেই যুক্তরাজ্যে বহু বছর ধরে বসবাস করছেন। ওয়ারিয়ামের বাবা একজন ট্যাক্সিচালক, মা গৃহিণী। পরিবারে দুই ভাই ও এক বোন। ছোট ভাই স্কুলে পড়ে, বড় বোন সদ্য বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে।

ওয়ারিয়াম নিজেও কলেজ শেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে যাচ্ছিল। পাশাপাশি সে কাজ করতো স্থানীয় এক দোকানে পার্টটাইম। স্বপ্ন দেখছিল বিয়ের—তার দীর্ঘদিনের প্রেমিকা সাঈবা জাভেদকে ঘরে তোলার। পরিবার ছিল গর্বিত তার উপর। বন্ধুরা বলত, “ওয়ারিয়ামকে একবার দেখলেই মন ভালো হয়ে যায়।”

মাজহারুল ইসলাম

মাজহারুল ইসলাম—একই বয়সী। তার পরিবার এসেছে নোয়াখালীর সেনবাগ উপজেলা থেকে। মাজহারুলের বাবা ছোটখাটো দোকান চালাতেন, মা গৃহিণী। এক সময় স্কুলে ভালো ছাত্র হলেও, মাঝপথে পড়াশোনা ছেড়ে গাঁজার নেশায় ডুবে যায় সে। চাকরি ছিল না, জীবনের দিশাও ছিল না। দিনের পর দিন ঘরে বসে গাঁজা টেনে বাস্তবতা থেকে নিজেকে গুটিয়ে রাখত।

পাড়ার ছেলেরা জানত, মাজহারুল মাঝে মাঝে আচরণে অস্থির হয়ে পড়ে। তার হাতে ছুরি থাকা, কিংবা ‘তুই জানিস না আমি কে’—এ রকম হুমকি, পাড়ার সবাই শুনেছে একাধিকবার। কিন্তু কেউ ভাবেনি, একদিন সে সত্যিই কাউকে ছুরি মারবে।

৬ মে ২০১৮, রোববার। বিকেল ৪টা ৪০ মিনিট। লুটনের বিশপস্কোট রোডে দেখা হয় দু’জনের। কথাকাটাকাটির এক পর্যায়ে মাজহারুল কোমর থেকে ছুরি বের করে সোজা ওয়ারিয়ামের বুকে ঢুকিয়ে দেয়। মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়ে চিৎকার, দৌড়াদৌড়ি, রক্ত আর কান্না। ওয়ারিয়াম পড়ে যায় ফুটপাথের ওপর, চোখ খোলা, কিন্তু নিথর। বিকেল ৪টা ৪০ মিনিটে, প্যারামেডিকরা যখন আসে, তখন চিকিৎসক শুধু বললেন—“He’s gone.”

ওয়ারিয়ামের মৃত্যু সংবাদ পৌঁছায় তার পরিবারের কাছে, যেখানে ছোট ছোট ভাইঝিরা, ভাগ্নেরা চিৎকার করে কান্না করে। মা-মেয়ে, চাচা-ভাই—সবাই স্তব্ধ হয়ে যায়, বিশ্বাসই করতে পারে না। যে ছেলেটা সবার মুখে হাসি ফুটাতো, যে ছিল পরিবারের ‘বেস্ট ফ্রেন্ড’, ‘বেস্ট ভাই’, ‘বেস্ট ভাগ্নে’—সে কি সত্যিই আর নেই?

মাজহারুল পালিয়ে যায়। প্রথমে যায় নিউক্যাসল, পরে হিথ্রো বিমানবন্দর দিয়ে পাড়ি জমায় বাংলাদেশে। কিন্তু সেখানে সে থাকতে পারে না। অজানা এক আতঙ্ক তাকে পেয়ে বসে। সে ফিরে আসে লন্ডন। ২২ মে, যখন সে গ্যাটউইক বিমানবন্দরে ফেরে, তখনই গ্রেপ্তার হয়।

নয় দিনব্যাপী বিচার অনুষ্ঠিত হয় লুটন ক্রাউন কোর্টে, এবং রায় ঘোষিত হয় মঙ্গলবার, ২৭ নভেম্বর ২০১৮। বিচারক রিচার্ড ফস্টার মাজহারুল ইসলামকে আজীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করেন, যার মধ্যে কমপক্ষে ২২ বছর তাকে কারাভোগ করতে হবে।

লুটনের আকাশ এখনো ধূসর হয়ে আসে বিকেল হলেই। বিশপস্কোট রোডের সেই মোড়টাতে আজও কিছু মানুষ দাঁড়িয়ে চুপচাপ তাকিয়ে থাকে। ওয়ারিয়াম আর ফিরে আসবে না। মাজহারুলও হারিয়ে ফেলেছে জীবনের সব সম্ভাবনা। দু’টি পরিবার, দু’টি ভবিষ্যৎ—সব কিছুকে কেটে ফেলেছে এক ছুরির ফলায়।


Back to top button
🌐 Read in Your Language