সম্পাদকের পাতা

কেপটাউনের রক্তমাখা এক সকাল

নজরুল মিন্টো

মিশে স্যামুয়েলস

কেপটাউন— দক্ষিণ আফ্রিকার প্রশাসনিক রাজধানী। আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্তে সমুদ্র, পাহাড় আর মানুষের রঙিন সহাবস্থানের এক অপূর্ব শহর। টেবিল মাউন্টেন যেন পাহাড়ের উপর দাঁড়িয়ে থাকা এক দার্শনিক, যে যুগ যুগ ধরে পর্যটকদের স্বাগত জানায়। শহরের রাস্তায় চলা মানুষদের ভাষা ভিন্ন, রং ভিন্ন, স্বপ্ন ভিন্ন—তবু ছুটে চলে একই জীবনের তাড়নায়।

কেপটাউনে থাকে ব্রিটিশ বংশোদ্ভূত ব্যবসায়ী, সোমালি ট্যাক্সিচালক, জিম্বাবুয়ের শিক্ষক, মালয় কসমেটিক বিক্রেতা, পাকিস্তানি টেইলার্স, ইথিওপিয়ান বারিস্টার। এ শহরের বাংলাদেশি কমিউনিটিও বেশ বড়। অনেকেই ব্যবসা করেন। বিশেষ করে ছোটো ছোট কনভিয়েন্স স্টোরের দোকানিরা হচ্ছে বাংলাদেশি। এসব দোকানগুলোর অবস্থান শহরের বিভিন্ন অলিতে, গলিতে অথবা কোনো ঘুপচিতে।

গোটা দক্ষিণ আফ্রিকায় বাংলাদেশিদের সংখ্যা প্রায় তিন লাখ। এদের অধিকাংশই ব্যবসা এবং বিভিন্ন সেবামূলক খাতে নিয়োজিত। এই অভিবাসীরা মূলত জোহানেসবার্গ, কেপটাউন, ডারবান, ইস্ট লন্ডন, পোর্ট এলিজাবেথ এবং গ্রাহামস্টাউনের মতো শহরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছেন। অনেকেই স্থানীয়দের সাথে মিশে গেছেন।

আবদুল সালাম

দক্ষিণ আফ্রিকায় বাংলাদেশি অভিবাসীদের অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো থাকলেও তারা গভীর উদ্বেগের সাথে বসবাস করছেন বলে জানা যায়। বাংলাদেশ দূতাবাসের দেয় তথ্য অনুযায়ী, কেবল ২০১৫ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে দক্ষিণ আফ্রিকায় ৪০০-রও বেশি বাংলাদেশি অভিবাসী হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। এই হত্যাকাণ্ডগুলোর পেছনে মূলত স্থানীয়দের সাথে ব্যবসায়িক বিরোধ, আর্থিক লেনদেন, বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক এবং ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব কাজ করেছে।

২০২১ সালের ৪ মার্চ। এক রৌদ্রজ্বল বৃহস্পতিবার সকালে, কেপটাউনের ওটারি রোডে (Ottery Road) ঘটে গেল এক মর্মান্তিক ঘটনা। আবদুল সালাম নামে এক বাংলাদেশি তার স্ত্রীকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করে। এসময় তার স্ত্রী গাড়ি চালাচ্ছিলো। চালকের সিটে বেল্ট বাঁধা থাকা অবস্থায় তাকে উপর্যপুরি ছুরিকাঘাত করা হয়। তাদের এক বছরের কন্যা তখন গাড়ির পেছনের আসনে ছিল এবং পুরো ঘটনা প্রত্যক্ষ করে।

মিশে স্যামুয়েলস। বয়স মাত্র ৩০। তিন সন্তানের মা। তিনি ছিলেন প্রাইভেট, আত্মনিবেদিত, একজন নিরলস শ্রমজীবী মা। পার্কউডের বিউলাহ কোর্টে তাদের বাসা। পুরো পরিবারটিকে একাই সামলাতেন তিনি। কাজ করতেন দিনের পর দিন, কারণ স্বামী সালাম দীর্ঘদিন ধরে বেকার, কোথাও কোনো কাজ পাচ্ছিলেন না। এ কারণে বোধহয় তার মধ্যে এক ধরনের মানসিক অস্থিরতা কাজ করছিলো।

লাল রঙের ফিয়াট গাড়ি চালাচ্ছিলেন মিশে। পাশের সিটে বসা তার স্বামী, বাংলাদেশি নাগরিক আবদুল সালাম। বছর সাতেকের দাম্পত্যজীবন। গাড়ির পেছনে তার এক বছরের কন্যা, নিস্পাপ, নিদ্রাভারী চোখে জানালা দিয়ে দেখছিল গাছেরা কেমন দ্রুত পেছনে চলে যাচ্ছে। কিন্তু সে জানত না—মা আর কখনো পেছন ফিরে তাকাবেন না।

গাড়ি চলছিল ওটারি রোড দিয়ে। এক পর্যায়ে তাদের মধ্যে বাক-বিতণ্ডা শুরু হয়। গাড়ির গ্লাভবক্সে মিশের রাখা ডিভোর্সের কাগজ দেখে সালামের ভেতরে জমা হতাশা বিস্ফোরণ ঘটায়। এক সময় আচমকা উঠে আসে ছুরি—তীব্র, ধারালো, সিদ্ধান্তহীন।

চালকের আসনে বসা মিশে প্রতিরোধ করতে পারেননি। গলায়, বুকে, বারবার ছুরির আঘাতে রক্ত ছড়িয়ে পড়ে গাড়ির ইন্টিরিয়রে। শিশুটি কেঁদে ওঠে। গাড়ির গতি হারায় ভারসাম্য। পেছনের গাড়ি ধাক্কা দেয়—রাস্তার ট্র্যাফিক থেমে যায় হঠাৎ।

গাড়িটা থেমে গেল, কিন্তু সময় থেমে গেল মিশের জন্য। তার নিথর দেহ লাল রঙের ফিয়াটে পড়ে রইল। মাথা হেলানো এক পাশে। হাতে ডিভোর্স পেপার, আর শরীর জুড়ে রক্তের ছাপ।

সন্তানদের সঙ্গে মিশে স্যামুয়েলস

সালাম পালাতে চেয়েছিলেন। রাস্তার পাশে দৌড়ে যান। ছুরি ছুঁড়ে ফেলেন এক খেলার মাঠে, সোয়েটার খুলে ফেলেন রক্ত লুকাতে। কিন্তু প্রত্যক্ষদর্শীরা চুপ ছিল না। লোকেরা দৌড়ে তাকে ধরে ফেলে। পুলিশের গাড়িতে তোলা হয় তাকে। সেই সময়কার ছবি ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক মাধ্যমে—একজন রক্তমাখা জামা পরা লোক, মুখে অস্পষ্ট ভয়ের রেখা।

হত্যার অভিযোগে সালাম (৩৯)-কে হাজির করা হয় উইনবার্গ ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে। রায় হয়—২৫ বছরের কারাদণ্ড। প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেছে, “সালাম যদি জামিনে বের হতেন, পাড়ার মানুষই ওকে পিটিয়ে মেরে ফেলত। সবাই ক্ষুব্ধ, কেউ মাফ করবে না।”

১৩ মার্চ, ২০২১। পার্কউডে অনুষ্ঠিত হয় মিশে স্যামুয়েলসের শেষ বিদায়। এই নির্মম হত্যাকাণ্ড দক্ষিণ আফ্রিকার বাংলাদেশি অভিবাসী সমাজসহ পুরো কেপটাউনে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে।

তিন সন্তান—এক বছরের কন্যা, পাঁচ এবং সাত বছরের দুই পুত্র—এখন থাকছে নানীর কাছে। তারা এখনও বোঝে না মাকে হারানো মানে কী। তারা শুধু জিজ্ঞেস করে—”মা কই?”

সূত্র: News24, IOL, Daily Voice South Africa, March 2021 – Wynberg Magistrate’s Court proceedings.


Back to top button
🌐 Read in Your Language