ডিসেম্বরের মধ্যেই শিক্ষার্থীদের হাতে বই পৌঁছানোর তাগিদ, ম্যানেজিং কমিটির সভাপতির পদে লাগছে ‘স্নাতক’ সনদ

ঢাকা, ০৮ নভেম্বর – দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় দীর্ঘদিনের জমে থাকা সেশনজট, অনিয়ম এবং অব্যবস্থাপনা দূর করতে এবার অত্যন্ত কঠোর ও যুগান্তকারী একগুচ্ছ সিদ্ধান্ত নিয়েছে জাতীয় সংসদ। দেশের লাখ লাখ শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং চাকরিপ্রত্যাশী শিক্ষকদের জন্য এসেছে বড় ধরনের একাধিক বার্তা। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আগামী ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের সমস্ত পাঠ্যপুস্তক নির্ধারিত সময়ের আগেই—অর্থাৎ ২০২৬ সালের ডিসেম্বর মাসের মধ্যেই শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দেওয়ার চরম নির্দেশনা দিয়েছে জাতীয় সংসদের শিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি।
আজ রবিবার (৮ নভেম্বর) জাতীয় সংসদ ভবনের স্থায়ী কমিটি কক্ষে অনুষ্ঠিত কমিটির দ্বিতীয় বৈঠকে এই সিদ্ধান্তগুলো সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়। শিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি মো. সেলিম ভূঁইয়ার সভাপতিত্বে এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলনসহ কমিটির অন্যান্য সদস্য মোছা. তাহসিনা রুশদীর, মো. সেলিমুজ্জামান মোল্যা, মো. জাহান্দার আলী মিয়া, বীথিকা বিনতে হোসাইন, মো. মুজিবুর রহমান ও আতিকুর রহমান মোজাহিদ অংশ নেন।
১. ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি হতে লাগবে ন্যূনতম ‘স্নাতক’ যোগ্যতা
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও শিক্ষার মান নিশ্চিত করতে একটি বড় পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এতদিন ধরে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতির পদ নিয়ে নানা অনিয়ম ও অনভিপ্রেত রাজনীতি নিয়ে সমালোচনা ছিল। এবার সেই দ্বারে কড়া আইনি নিয়ম আনার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সংসদীয় কমিটি স্পষ্ট জানিয়েছে, বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি হতে গেলে ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা হতে হবে ‘স্নাতক’ (Degree/Graduation)। এ বিষয়ে দ্রুত নতুন প্রবিধানমালা তৈরির তাগিদ দেওয়া হয়েছে।
২. ১ থেকে ১২তম নিবন্ধনধারীদের নির্বাহী আদেশে দ্রুত নিয়োগের সুপারিশ
এনটিআরসিএ কর্তৃক ১ থেকে ১২তম নিবন্ধনধারী যেসব শিক্ষক এতদিন ধরে নিয়োগের অপেক্ষায় প্রহর গুনছিলেন, তাঁদের জন্য বড় সুসংবাদ রয়েছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জনবল কাঠামো ও এনটিআরসিএ-র নেওয়া পদক্ষেপ পর্যালোচনা করে স্থায়ী কমিটি সুপারিশ করেছে—সরকারের একটি নির্বাহী আদেশের (Executive Order) মাধ্যমেই যেন দ্রুত এই ১ থেকে ১২তম নিবন্ধনকারীদের নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ করা হয়। এছাড়া, এনটিআরসিএ-র অধীনে চলমান অধ্যক্ষ, উপাধ্যক্ষ, সুপার, সহ-সুপার, প্রধান শিক্ষক ও সহকারী প্রধান শিক্ষক নিয়োগের সব মৌখিক পরীক্ষা আগামী ডিসেম্বরের মধ্যেই শেষ করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে।
৩. ডিসেম্বরের মধ্যেই হাতে নতুন বই: এনসিটিবিকে কড়া বার্তা
বিগত বছরগুলোতে বছরের শুরুতে শিক্ষার্থীদের হাতে সব বই পৌঁছাতে না পারা কিংবা দেরির যে অভিজ্ঞতা ছিল, তার পুনরাবৃত্তি আর দেখতে চায় না সংসদীয় কমিটি। এনসিটিবি (NCTB)-র সার্বিক কার্যক্রম পর্যালোচনা করে কমিটি পরিষ্কার নির্দেশ দিয়েছে—২০২৭ শিক্ষাবর্ষের সকল পাঠ্যপুস্তক যেন ২০২৬ সালের ডিসেম্বর মাসের ভেতরেই প্রেস থেকে বের হয়ে শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছায়। নির্ধারিত সময়ে বই মুদ্রণ ও সরবরাহ নিশ্চিত করতে মন্ত্রণালয়কে প্রয়োজনীয় সব দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
৪. অসুস্থ শিক্ষকদের অগ্রাধিকার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দুর্নীতিতে সংসদীয় তদন্ত
সংসদীয় বৈঠকে বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের অবসর সুবিধা ও কল্যাণ ট্রাস্টের অনিষ্পন্ন আবেদনগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির নির্দেশ দেওয়া হয়। বিশেষ করে—যেসব শিক্ষক হজযাত্রী কিংবা দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত, তাঁদের আবেদন অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিবেচনা করে দ্রুত অর্থ পরিশোধের ব্যবস্থা নিতে তাগিদ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সরকারের থেকে অর্থ প্রাপ্তি সাপেক্ষে পর্যায়ক্রমে অন্য সবার প্রাপ্য মেটানো হবে।
একইসঙ্গে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক কার্যক্রম এবং বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সংঘটিত নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অনিয়ম খতিয়ে দেখতে এবার সংসদীয় স্থায়ী কমিটির নিজস্ব উদ্যোগে অনুসন্ধান ও তদন্ত চালানোর গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে।
কারিগরি শিক্ষার গুণগত মান উন্নত করা, মাউশির আওতাধীন নন-এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বিষয়ে অবস্থান স্পষ্ট করা এবং চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের প্রশাসনিক কাজ পর্যালোচনা শেষ করে শিক্ষা খাতে এক গতিশীল ও স্বচ্ছ পরিবর্তনের বার্তা দিল এই সংসদীয় কমিটি।
এনএন/ ০৮ নভেম্বর ২০২৬







