উত্তর আমেরিকা

মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের আশঙ্কায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম ১১২ ডলার ছাড়াল

তেলের দাম

ওয়াশিংটন, ২২ অক্টোবর- মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত আরও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে। সৌদি আরবে ইয়েমেনের হুতিদের নতুন করে হামলা এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ও তেল সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কায় বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম গত মে মাসের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।

বৃহস্পতিবার গ্রিনিচ মান সময় সকাল ১১টা ৪ মিনিটে (বাংলাদেশ সময় বিকেল ৫টা ৪ মিনিট) ব্রেন্ট ক্রুডের ভবিষ্যৎ সরবরাহের চুক্তির দাম ব্যারেলপ্রতি ৩ দশমিক ০৬ ডলার বা ২ দশমিক ৮১ শতাংশ বেড়ে ১১১ দশমিক ৮৮ ডলারে দাঁড়ায়। দিনের শুরুতে এই তেলের দাম বেড়ে ১১২ দশমিক ৫৫ ডলারে পৌঁছেছিল, যা গত ১৮ মে’র পর সর্বোচ্চ।

অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ২ দশমিক ০৪ ডলার বা ২ দশমিক ১ শতাংশ বেড়ে ৯৯ দশমিক ১৯ ডলারে ওঠে। এর আগে এই তেলের দাম ১০০ দশমিক ০৭ ডলারে পৌঁছেছিল।

বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল রপ্তানির পরিমাণ সংঘাত শুরুর আগের পর্যায়ের চেয়ে বেশি হলেও জাহাজে হামলা, হরমুজ প্রণালিতে নিরাপত্তাঝুঁকি এবং সৌদি আরবের জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলার আশঙ্কা বাজারে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।

তেলবাজার বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান পিভিএমের বিশ্লেষক তামাস ভার্গা বলেন, মধ্যপ্রাচ্য থেকে অপরিশোধিত তেল রপ্তানি সংঘাতের আগের মাত্রা ছাড়িয়ে যাওয়ার খবরের চেয়েও হরমুজ প্রণালিতে জাহাজে হামলা এবং সৌদি আরব ও দেশটির তেল অবকাঠামোয় হুতিদের আক্রমণ বাজারে বেশি প্রভাব ফেলছে।

তাঁর ধারণা, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে সংঘাত কমে আসার সম্ভাবনা কম। ফলে তেলের দাম উচ্চ পর্যায়ে থাকতে পারে।

মরগান স্ট্যানলির বিশ্লেষকেরা এক নোটে জানিয়েছেন, গত সপ্তাহে মধ্যপ্রাচ্য থেকে প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি ৭০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল রপ্তানি হয়েছে।

সৌদি আরবে হামলা, আরামকোর কর্মীদের সরে যাওয়ার নির্দেশ

সৌদি আরবে একের পর এক হামলার ঘটনায় নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। বৃহস্পতিবার সংশ্লিষ্ট ছয় ব্যক্তির বরাতে জানা গেছে, সৌদি আরবের রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানি আরামকো ধাহরানে তাদের সদর দপ্তরের কর্মীদের সেখান থেকে সরে যেতে এবং বাসা থেকে কাজ করতে নির্দেশ দিয়েছে।

এ ছাড়া সৌদি আরবে যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি কূটনৈতিক মিশন থেকে কিছু কূটনীতিক ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের চলে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর। মধ্যপ্রাচ্যের আরও কয়েকটি মার্কিন মিশন থেকে কর্মীদের পরিবারের সদস্যদের সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে বলেও জানিয়েছেন মার্কিন কর্মকর্তারা।

বুধবার সৌদি আরবের একাধিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালায় ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা। দাম্মামের একটি বেসামরিক বিমানবন্দরে হামলায় অন্তত একজন নিহত এবং আটজন আহত হন। এ ছাড়া সৌদি আরবের একটি তেলক্ষেত্রে ড্রোন হামলায় দুজন নিহত হয়েছেন।

একই দিনে ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় সিরিকে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে বলে দেশটির গণমাধ্যম জানিয়েছে। তবে বিস্ফোরণের ধরন ও এর উৎস সম্পর্কে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

হরমুজে জাহাজে হামলা, লিবিয়ায় কমেছে তেল উৎপাদন

মধ্যপ্রাচ্যে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে হরমুজ প্রণালির আশপাশে জাহাজে হামলা ও মাইন বিস্ফোরণের খবরের কারণে।

বৃহস্পতিবার ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) নৌবাহিনী জানায়, উত্তর উপসাগরে অবৈধভাবে তেল স্থানান্তরের সঙ্গে জড়িত চারটি জাহাজকে বুধবার শনাক্ত করার পর একযোগে আঘাত করা হয়। এতে জাহাজগুলোতে আগুন ধরে যায়। এ ছাড়া হরমুজ প্রণালির পশ্চিমে আরও তিনটি জাহাজ মাইনের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়েছে বলে দাবি করেছে বাহিনীটি।

এদিকে, লিবিয়ায় হামাদা ও তাহারা তেলক্ষেত্র থেকে জাওইয়া বন্দরে তেল পরিবহনের পাইপলাইনের একটি ভালভ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এর ফলে ওই দুটি তেলক্ষেত্রে উৎপাদন কমেছে বলে রয়টার্সকে জানিয়েছেন দেশটির জাতীয় তেল করপোরেশনের প্রধান।

দাম নিয়ন্ত্রণে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগ

জ্বালানি তেলের উচ্চমূল্য ও ডিজেলের ঘাটতি মোকাবিলায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন জরুরি মজুত থেকে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ হিটিং অয়েল বা তাপ উৎপাদনে ব্যবহৃত জ্বালানি তেল ঋণ হিসেবে দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে। দেশটির জরুরি মজুতে এ ধরনের তেলের পরিমাণ প্রায় ১০ লাখ ব্যারেল।

ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধ এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সরবরাহে চাপ তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব পড়ছে ডিজেলের বাজারেও।

এদিকে, ইউরোপীয় পার্লামেন্ট তেল ও গ্যাস আমদানির ক্ষেত্রে মিথেন নিঃসরণসংক্রান্ত ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিধি কার্যকরের সময়সীমা তিন বছর পিছিয়ে দেওয়ার পক্ষে ভোট দিয়েছে। ফ্রান্সসহ কয়েকটি দেশের সরকার এবং যুক্তরাষ্ট্রের চাপের পর এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে আলোচনার উদ্যোগ

এদিকে, ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধের লক্ষ্যে কূটনৈতিক তৎপরতাও চলছে। বুধবার রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফের সঙ্গে বৈঠক করেছেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন।

ক্রেমলিন জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় আগামী মাসের শুরুতেই ইউক্রেনের সঙ্গে শান্তি আলোচনা আবার শুরু করতে সম্মত হয়েছেন পুতিন। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিও আলোচনায় সমর্থন জানিয়েছেন এবং যত দ্রুত সম্ভব আলোচনা শুরু হওয়ার আশা প্রকাশ করেছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত ছড়িয়ে পড়া এবং গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথে নিরাপত্তাঝুঁকি অব্যাহত থাকলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম আরও অস্থির হয়ে উঠতে পারে। এর প্রভাব পড়তে পারে জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশগুলোর মূল্যস্ফীতি, পরিবহন ব্যয় ও সামগ্রিক অর্থনীতিতে।

এস এম/ ২২ অক্টোবর ২০২৬

Back to top button
🌐 Read in Your Language