ডেঙ্গুতে ২৪ ঘণ্টায় আরও ৪ জনের মৃত্যু, হাসপাতালে নতুন ভর্তি ১৫১২

ঢাকা, ২২ অক্টোবর – দেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতির ভয়াবহতা দিনে দিনে আরও আশঙ্কাজনক রূপ নিচ্ছে। বছরের শেষ প্রান্তিকে এসে মশার কামড়ে প্রাণহানি ও হাসপাতালে ভর্তির পরিসংখ্যান যেভাবে ঊর্ধ্বমুখী, তাতে সাধারণ মানুষের উদ্বেগ এখন তুঙ্গে। ঢাকাসহ দেশের প্রতিটি বিভাগেই ডেঙ্গুর প্রকোপ ছড়িয়ে পড়েছে। অক্টোবর মাসের শুরু থেকেই আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যায় যে লাফ দেখা যাচ্ছে, তা স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের কঠোর সতর্কবার্তার সত্যতাই প্রমাণ করে।
বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত বুলেটিনে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় সারাদেশে নতুন করে ১,৫১২ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এবং একই সময়ে প্রাণ হারিয়েছেন আরও ৪ জন।
পরিসংখ্যানের আলোকেই উদ্ভাসিত ভীতিজনক চিত্র
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বুলেটিনের তথ্য বিশ্লেষণ করলে চলতি বছরের ডেঙ্গু পরিস্থিতির এক উদ্বেগজনক চিত্র স্পষ্ট হয়ে ওঠে:
মৃত্যুর করুণ রেকর্ড: চলতি বছর ডেঙ্গুতে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩৬৮ জনে।
অক্টোবরের উদ্বেগ: শুধুমাত্র অক্টোবরের প্রথম ২১ দিনেই মারা গেছেন ১২৪ জন—যা চলতি বছরের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। এর আগে সেপ্টেম্বর মাসে সর্বোচ্চ ১৪৮ জন ডেঙ্গু রোগীর মৃত্যু হয়েছিল।
সংক্রমণের ধারাবাহিকতা: আগস্টে ৪৩ জন, জুলাইয়ে ৩৬ জন, জুনে ১৩ জন, মে মাসে ১ জন এবং জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে ২ জন করে মারা যান।
আক্রান্ত ও সুস্থতার হার: চলতি বছরে ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে মোট ভর্তি রোগীর সংখ্যা ১,১৮,৫০২ জন। এর মধ্যে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ১,১২,১১১ জন (গত ২৪ ঘণ্টায় সুস্থ ১,৪৫৫ জন)।
বিভাগওয়ারি সংক্রমণ: শীর্ষে ঢাকা, পিছু ছাড়ছে না মফস্বলও
একসময় ডেঙ্গুকে প্রধানত রাজধানী ঢাকার সমস্যা মনে করা হলেও, বর্তমানে এর বিস্তার সারাদেশেই ছড়িয়ে পড়েছে। গত ২৪ ঘণ্টার বিভাগভিত্তিক রোগী ভর্তির চিত্র নিচে তুলে ধরা হলো:
- ঢাকা ৫০৭ জন
- চট্টগ্রাম ২৯৪ জন
- বরিশাল ২৩১ জন
- খুলনা ২০৬ জন
- রাজশাহী ১৬২ জন
- ময়মনসিংহ ৬০ জন
- রংপুর ৪৪ জন
- সিলেট ৮ জন
ঢাকা বিভাগে আক্রান্তের সংখ্যা (৫০৭ জন) সবচেয়ে বেশি হলেও চট্টগ্রাম, বরিশাল ও খুলনার মতো বিভাগগুলোতে আক্রান্তের উচ্চহার প্রমাণ করে যে ডেঙ্গু এখন আর শুধু নগরকেন্দ্রিক নেই, প্রান্তিক অঞ্চলগুলোতেও এর প্রকোপ তীব্র।
কেন কমছে না ডেঙ্গুর দাপট? বিশেষজ্ঞদের মত
অনুকূল আবহাওয়া ও জমে থাকা পানি: অনিয়মিত বৃষ্টিপাত এবং সঠিক নর্দমা নিষ্কাশন ব্যবস্থার অভাবে বাসাবাড়ি ও আশপাশে জমে থাকা পানি এডিস মশার প্রজননক্ষেত্রে পরিণত হচ্ছে।
দেরিতে হাসপাতালে আগমন: অধিকাংশ ক্ষেত্রে রোগীরা লক্ষণ দেখা দেওয়ার পর প্রাথমিক চিকিৎসায় সময় নষ্ট করছেন। প্লাটিলেট বা প্রেসার আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ার পর হাসপাতালে আসায় মৃত্যুর ঝুঁকি বেড়ে যাচ্ছে।
অপরিকল্পিত মশক নিধন: স্থানীয় পর্যায়গুলোতে কার্যকর ও নিয়মিত লার্ভিসাইড প্রয়োগ এবং মশক নিধন অভিযানের ঘাটতিকে এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী করছেন সাধারণ মানুষ।
জরুরি করণীয় ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা
জমে থাকা পানি পরিষ্কার: টব, ডাবের খোসা, ড্রাম বা বাড়ির আশপাশে ৩ দিনের বেশি জমে থাকা পানি অবিলম্বে ফেলে দিন।
মশারির ব্যবহার: দিনে কিংবা রাতে—ঘুমানোর সময় অবশ্যই মশারি ব্যবহার করুন।
দ্রুত পরীক্ষা ও চিকিৎসকের পরামর্শ: জ্বর এলেই অবহেলা না করে ডেঙ্গু পরীক্ষা (NS1) করান এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রচুর পরিমাণে তরল খাবার গ্রহণ করুন।
ডেঙ্গু প্রতিরোধে কেবল সরকারি উদ্যোগই যথেষ্ট নয়; ব্যক্তি ও সামাজিক সচেতনতাই পারে এই প্রাণঘাতী ভাইরাস থেকে পরিবার ও সমাজকে মুক্ত রাখতে।
এনএন/ ২২ অক্টোবর ২০২৬







