৩ নভেম্বরের আগে ইরানে হামলা নয়: মধ্যবর্তী নির্বাচন ও তেলের উত্তাপের মাঝে ট্রাম্পের বড় ঘোষণা

ওয়াশিংটন, ০৯ অক্টোবর – যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচন (Midterm Elections) ঘনিয়ে আসার মুখে মধ্যপ্রাচ্য ইস্যুতে বড় কৌশলগত পদক্ষেপ নিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আগামী ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ইরানে মার্কিন বাহিনীর নতুন করে আর কোনো সামরিক হামলা চালানোর পরিকল্পনা নেই বলে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন তিনি। তবে হামলা স্থগিতের ঘোষণা দিলেও তেহরানের ওপর আরোপিত কঠোর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ও সমুদ্র অবরোধ আগের মতোই পূর্ণমাত্রায় বলবৎ থাকবে বলে হুঁশিয়ার করেছেন তিনি।
গত ৮ অক্টোবর (বৃহস্পতিবার) নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ দেওয়া এক বার্তায় ট্রাম্প এই তথ্য নিশ্চিত করেন। বর্তমানে ওয়াশিংটন ও তেহরানের প্রতিনিধিদের মধ্যে এক ধরণের ফলপ্রসূ আলোচনা চলছে বলেও দাবি করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
কেন হঠাৎ সামরিক পদক্ষেপে এই বিরতি?
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্তের পেছনে মূল প্রভাবক হিসেবে কাজ করছে যুক্তরাষ্ট্রের আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচন এবং দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক চাপ।
১. পতনমুখী জনসমর্থন: ফেব্রুয়ারি মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযান শুরুর পর থেকেই মধ্যপ্রাচ্য সংঘাত জটিল আকার ধারণ করে। এর জেরে মার্কিন ভোটারদের একাংশের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়, যার প্রভাব সরাসরি পড়েছে ট্রাম্পের অভ্যন্তরীণ জনপ্রিয়তায়।
২. বিশ্ববাজারে তেলের দরপতন ও মূল্যস্ফীতি: আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্স-ইপসোসের সাম্প্রতিক এক জরিপ অনুযায়ী, প্রায় ৬০ শতাংশ আমেরিকান ট্রাম্প প্রশাসনের ইরান নীতিতে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। মার্কিন নাগরিকদের মধ্যে জ্বালানি তেলের বর্ধিত দর এবং সার্বিক জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি সবচেয়ে বড় চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
৩. কংগ্রেসে আসন হারানোর ভয়: মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসে রিপাবলিকান পার্টির সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখা এখন বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বড় ধরণের রাজনৈতিক ঝুঁকি এড়াতেই নির্বাচনের আগে সরাসরি হামলা থামানোর সিদ্ধান্ত এসেছে বলে মনে করা হচ্ছে।
কূটনীতির জল কতদূর গড়াল?
ট্রাম্পের দাবি অনুযায়ী, উভয় পক্ষের প্রতিনিধিরা একটি সমঝোতায় পৌঁছানোর উদ্দেশ্যে কূটনৈতিক বার্তা আদান-প্রদান করছেন। তবে মাঠের চিত্র ও নীতিগত অবস্থান এখনো বেশ জটিল:
হরমুজ প্রণালী ও জ্বালানি প্রবাহ: বিশ্ব বাণিজ্যের অত্যন্ত সংবেদনশীল এই নৌপথে উত্তেজনা কমেনি। ট্রাম্পের দাবি, নিছক কঠোর অবরোধের কারণেই সেখান থেকে রেকর্ড পরিমাণ তেল প্রবাহ হচ্ছে, অথচ তার মধ্যে এক ব্যারেল তেলও ইরান থেকে আসছে না বা সেখানে যাচ্ছে না।
তেহরানের কড়া অবস্থান: ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম ও পরমাণু শক্তি সংস্থা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে, তারা ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম বন্ধ করবে না কিংবা অর্জিত সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদও কোনো বহিরাগত পক্ষের হাতে হস্তান্তর করবে না।
মার্কিন শর্ত: কিছুদিন আগেই যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স রয়টার্সকে বলেছিলেন যে, কোনো স্থায়ী চুক্তি হতে হলে ইরানকে অবশ্যই তাদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের সক্ষমতা “অর্থবহ” পর্যায়ে নামিয়ে আনতে হবে।
মার্কিন রাজনৈতিক প্রেক্ষিত ও ইরান সংকট:
মার্কিন অবস্থান: ৩ নভেম্বরের নির্বাচন পর্যন্ত সামরিক হামলা স্থগিত, তবে নিষেধাজ্ঞা ও অবরোধ বজায় থাকবে
ইরানের অবস্থান: ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধে নারাজ; আলোচনার মাধ্যমে অর্থনৈতিক সংকট নিরসনে আগ্রহী
আমেরিকান জনমত: ৬০% ভোটার ইরান পরিস্থিতি মোকাবেলায় অসন্তুষ্ট; জ্বালানি মূল্যে মূল উদ্বেগ
রাজনৈতিক প্রভাব: কংগ্রেসে রিপাবলিকান পার্টির একক আধিপত্য টিকিয়ে রাখার টানাপোড়েন
নির্বাচনের পর কী অপেক্ষা করছে?
মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারবার আশ্বাস দিচ্ছেন যে নির্বাচনের পর জ্বালানি তেলের দাম কমে আসবে। তবে মধ্যপ্রাচ্য সংঘাত থেকে দীর্ঘমেয়াদে বের হয়ে আসার কোনো সুস্পষ্ট ‘এগজিট প্ল্যান’ (Exit Plan) এখনো ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে তুলে ধরা হয়নি।
ফলে আগামী ৩ নভেম্বরের ভোটগ্রহণ পর্ব শেষ হওয়া পর্যন্ত সংঘাত সাময়িক থমকে থাকলেও, নির্বাচনের পর ওয়াশিংটন ও তেহরানের এই দ্বিপাক্ষিক উত্তেজনা কোনো কূটনৈতিক সমঝোতায় পৌঁছাবে নাকি পুনরায় তীব্র সামরিক রূপ নেবে—তা নিয়ে বিশ্ব রাজনীতিতে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা রয়েই যাচ্ছে।
এনএন/ ০৯ অক্টোবর ২০২৬







