
বিশ্বকাপে মাঠে একটি বল গড়ায়। গ্যালারিতে ওঠে হাজারো মানুষের উল্লাস, টেলিভিশনের সামনে বসে থাকে কোটি কোটি দর্শক। বাইরে থেকে বিশ্বকাপ তাই ফুটবলের এক মহোৎসব। কিন্তু এই উৎসবের আরেকটি মুখ আছে, যা চোখে সহজে দেখা যায় না। মাঠে দেখা যায় গোল, পতাকা আর আবেগ। পর্দার আড়ালে সেই আবেগকে ঘিরেই গড়ে ওঠে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় চলমান অর্থনৈতিক মঞ্চগুলোর একটি।
২০২৬ সালের বিশ্বকাপ সেই অর্থনীতিকে আরও বড় করে দিয়েছে। এবার ৩২ দল নয়, ৪৮ দল। ৬৪ ম্যাচ নয়, ১০৪ ম্যাচ। এক দেশ নয়, তিন দেশ। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর ১৬টি শহরজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে ফুটবলের এই বিশ্বমেলা। তাই এবারের বিশ্বকাপ কেবল মাঠের আকারে বড় নয়; টাকার অঙ্কে বড়, ব্যবসার বিস্তারেও বড়।
ফিফার কাছে বিশ্বকাপ হলো চার বছরের সবচেয়ে বড় আয়-উৎস। ফিফা কোনো ক্লাবের মতো নিয়মিত লিগ চালায় না। তাদের প্রধান ব্যবসা হলো অধিকার বিক্রি করা। টেলিভিশন সম্প্রচার অধিকার, স্পন্সরশিপ, মার্কেটিং অধিকার, টিকিট, হসপিটালিটি, লাইসেন্সিং, ডিজিটাল কনটেন্ট, পণ্য বিক্রি, সব মিলিয়ে বিশ্বকাপের অর্থনীতি গড়ে ওঠে। এক অর্থে ফিফা মাঠ বানায় না, শহর চালায় না; তারা বিশ্বকাপ নামের একটি বৈশ্বিক স্বপ্নের মালিকানা বিক্রি করে।
এই অর্থনীতির আকার বুঝতে হলে একটু পেছনে তাকাতে হয়। ২০১৮ সালের রাশিয়া বিশ্বকাপ ছিল ৩২ দলের, ৬৪ ম্যাচের, ১১ শহরের ১২ ভেন্যুর আসর। ফিফার ২০১৫ থেকে ২০১৮ চক্রে মোট আয় ছিল ৬.৪২১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এই অঙ্কই বুঝিয়ে দেয়, বিশ্বকাপ বহু আগেই ফুটবলের সীমা ছাড়িয়ে বড় অর্থনৈতিক আসরে পরিণত হয়েছিল।
রাশিয়া নিজেও বিশ্বকাপের পেছনে বিপুল অর্থ ব্যয় করেছিল। বিভিন্ন গণমাধ্যম ব্যয়ের অঙ্ক ১৪ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি বলেছে। বিশ্বকাপ শেষে আয়োজক কমিটির হিসাবে বলা হয়, ২০১৩ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত এই আয়োজন রাশিয়ার অর্থনীতিতে প্রায় ৯৫২ বিলিয়ন রুবল বা প্রায় ১৪.৫ বিলিয়ন ডলারের প্রভাব তৈরি করেছে।
২০১৮ সালে অংশগ্রহণকারী ৩২ দলের জন্য ফিফার মোট প্রাইজমানি ছিল ৪০০ মিলিয়ন ডলার। চ্যাম্পিয়ন ফ্রান্স পেয়েছিল ৩৮ মিলিয়ন ডলার। যারা গ্রুপ পর্বেই বিদায় নিয়েছিল, তারাও পেয়েছিল ৮ মিলিয়ন ডলার করে। অর্থাৎ মাঠে ফলাফল যেমন বদলায়, টাকার অঙ্কও তেমন বদলায়। নকআউটে ওঠা, কোয়ার্টার ফাইনাল, সেমিফাইনাল, ফাইনাল, প্রতিটি ধাপ শুধু মর্যাদা নয়, অর্থও বাড়ায়।
২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপ এই অঙ্ককে আরও বড় করে দেয়। ফিফার ২০১৯ থেকে ২০২২ চক্রে আয় পৌঁছে যায় ৭.৫৬৮ বিলিয়ন ডলারে। এই এক অঙ্কই বুঝিয়ে দেয়, বিশ্বকাপ মাঠের খেলার বাইরে কত বড় আর্থিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে।
২০২২ সালে ৩২ দলের জন্য মোট প্রাইজমানি দাঁড়ায় ৪৪০ মিলিয়ন ডলার। আর্জেন্টিনা চ্যাম্পিয়ন হয়ে পায় ৪২ মিলিয়ন ডলার। ফ্রান্স রানার্সআপ হয়ে পায় ৩০ মিলিয়ন ডলার। গ্রুপ পর্বে বাদ পড়া দলগুলোও পায় ৯ মিলিয়ন ডলার করে। এর বাইরে ক্লাবগুলোর জন্যও অর্থ ছিল। কাতার বিশ্বকাপের পর ৪৪০টি ক্লাবের মধ্যে ২০৯ মিলিয়ন ডলার বিতরণ করা হয়।
২০২৬ বিশ্বকাপে এসে ছবিটি আরও বড় হয়ে গেছে। এবার ৪৮ দল, ১০৪ ম্যাচ, ১৬ শহর, তিন দেশ। ফিফার আয় লক্ষ্যমাত্রা ১৩ বিলিয়ন ডলারে উঠেছে। সহজ ভাষায় বললে, বিশ্বকাপ যত বেশি মানুষ দেখে, তার বাণিজ্যিক মূল্য তত বাড়ে। মানুষ মাঠে গেলেও আয়, টিভিতে দেখলেও আয়, মোবাইলে দেখলেও আয়, জার্সি কিনলেও আয়, স্টেডিয়ামের পাশে কোক পান করলেও আয়।
এবার আসা যাক দলগুলোর খরচে। বাইরে থেকে মনে হতে পারে, একটি দেশ বিশ্বকাপে গেলেই শুধু ২৬ জন ফুটবলার আর কয়েকজন কোচ নিয়ে চলে যায়। বাস্তবতা অনেক বড়। জাতীয় দলের সঙ্গে থাকে কোচিং স্টাফ, চিকিৎসা দল, বিশ্লেষক, নিরাপত্তা কর্মী, মিডিয়া টিম, লজিস্টিকস কর্মকর্তা ও ফেডারেশন প্রতিনিধি। তাদের ঘিরে তৈরি হয় প্রস্তুতি ক্যাম্প, বেস ক্যাম্প, হোটেল, খাবার, যাতায়াত, সরঞ্জাম, চিকিৎসা, ভাতা ও বোনাসের বড় হিসাব।
ফিফা দলগুলোর জন্য অর্থ দেয়। ২০২৬ বিশ্বকাপে ৪৮টি অংশগ্রহণকারী সদস্য অ্যাসোসিয়েশনের জন্য ফিফা আর্থিক বিতরণ প্রায় ৮৭১ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত করেছে। প্রত্যেক দল প্রস্তুতির জন্য ২.৫ মিলিয়ন ডলার এবং বিশ্বকাপে জায়গা পাওয়ার জন্য ১০ মিলিয়ন ডলার পাচ্ছে। এর বাইরে দলীয় প্রতিনিধিদলের খরচ ও টিকিট বরাদ্দের জন্য অতিরিক্ত সহায়তাও আছে।
খেলোয়াড়দের ক্লাবও এখানে অর্থনীতির অংশ। বিশ্বকাপে খেলোয়াড়রা জাতীয় দলের হয়ে খেললেও বছরের বেশির ভাগ সময় তারা ক্লাবের হয়ে খেলে। তাই ফিফা ক্লাবগুলোকেও অর্থ দেয়। একে বলা হয় Club Benefits Programme। সহজ ভাষায়, যে ক্লাব তার খেলোয়াড়কে বিশ্বকাপের জন্য ছাড়ে, সেই ক্লাবও ফিফার কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ পায়। ২০২৬ বিশ্বকাপ ঘিরে ক্লাবগুলোর জন্য মোট ৩৫৫ মিলিয়ন ডলারের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
এবার হোস্ট শহরের খরচ। এখানেই বিশ্বকাপের লাভ-ক্ষতির হিসাব সবচেয়ে জটিল। ফিফা আয় করে কেন্দ্রীয়ভাবে। কিন্তু শহরগুলোকে খরচ করতে হয় স্থানীয়ভাবে। নিরাপত্তা, পরিবহন, জরুরি সেবা, স্টেডিয়াম প্রস্তুতি ও জনসমাগম ব্যবস্থাপনার মতো খাতগুলো তখন হোস্ট শহরের বাজেটের ওপর বড় চাপ তৈরি করে।
টরন্টোর উদাহরণ নিলে বিষয়টি পরিষ্কার হয়। টরন্টো ছয়টি ম্যাচ আয়োজন করছে। শহরের মোট পরিকল্পনা ও আয়োজন ব্যয় ৩৮০ মিলিয়ন কানাডীয় ডলার। Deloitte Canada-এর মূল্যায়নে বলা হয়েছে, বিশ্বকাপ Greater Toronto Area-তে ৯৪০ মিলিয়ন কানাডীয় ডলার পর্যন্ত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড তৈরি করতে পারে।
ভ্যাঙ্কুভারের হিসাবও একইভাবে বড়। সাতটি ম্যাচ ঘিরে B.C. সরকার বলছে, প্রদেশের অর্থনীতিতে প্রায় ১ বিলিয়ন কানাডীয় ডলারের কার্যক্রম যোগ হতে পারে।
কানাডার পার্লামেন্টারি বাজেট অফিস একটি গুরুত্বপূর্ণ হিসাব দিয়েছে। তাদের হিসাবে কানাডায় ১৩টি ম্যাচ আয়োজনের জন্য ফেডারেল, প্রাদেশিক ও স্থানীয় স্তর মিলিয়ে সরকারি সহায়তা দাঁড়াচ্ছে ১.০৬৬ বিলিয়ন কানাডীয় ডলার। হিসাব করলে কানাডায় প্রতি ম্যাচে সরকারি সহায়তা দাঁড়ায় প্রায় ৮২ মিলিয়ন কানাডীয় ডলার। এই অঙ্ক দেখলেই বোঝা যায়, বিশ্বকাপের একটি ম্যাচ শুধু ৯০ মিনিটের খেলা নয়; এর পেছনে থাকে একটি শহরকে প্রস্তুত রাখার বিশাল ব্যয়।
যুক্তরাষ্ট্রের শহরগুলোর ক্ষেত্রেও ব্যয় কম নয়। ১১টি মার্কিন শহর ৭৮টি ম্যাচ আয়োজন করছে। এই আয়োজনের প্রস্তুতির জন্য হোস্ট সিটিগুলোর জন্য মোট ৬২৫ মিলিয়ন ডলার ফেডারেল সহায়তা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। গড় হিসাবে এটি শহরপ্রতি প্রায় ৫৬.৮ মিলিয়ন ডলার। তবে ব্যয়ের বিপরীতে সম্ভাব্য অর্থনৈতিক সুফলের অঙ্কও বড়। হিসাব বলছে, ২০২৬ বিশ্বকাপ যুক্তরাষ্ট্রে ৩০.৫ বিলিয়ন ডলারের মোট অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং ১৭.২ বিলিয়ন ডলারের GDP প্রভাব তৈরি করতে পারে।
মেক্সিকো ১৩টি ম্যাচ আয়োজন করছে। এ জন্য মেক্সিকোর ফেডারেল সরকার তিনটি হোস্ট সিটির প্রতিটির চলাচল ও পরিবহন অবকাঠামোতে প্রায় ১.৫ থেকে ২ বিলিয়ন পেসো পর্যন্ত সহায়তার কথা জানিয়েছে। মেক্সিকোর ব্যবসায়ী সংগঠন CONCANACO-এর হিসাবে, ২০২৬ বিশ্বকাপ দেশটিতে প্রায় ৬৫ বিলিয়ন পেসোর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড তৈরি করতে পারে, যা প্রায় ৩.৭ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি।
বিশ্বকাপের সৌন্দর্য মাঠে। কিন্তু বিশ্বকাপের শক্তি শুধু মাঠে সীমাবদ্ধ নয়। সেটি ছড়িয়ে থাকে অর্থনীতির সেই অদৃশ্য জালে, যেখানে মানুষের আবেগ পণ্যে পরিণত হয়, স্টেডিয়ামের আলো হয়ে ওঠে বিজ্ঞাপনের মঞ্চ, আর একটি বলকে ঘিরে গড়ে ওঠে বিলিয়ন ডলারের বিশাল সাম্রাজ্য।
তথ্যসূত্র: FIFA Annual Reports 2018 ও 2022; FIFA ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার ২০২৬ বিশ্বকাপ-সংক্রান্ত আর্থিক প্রতিবেদন।









