জার্মানির ইতিহাসে এক বছরে সর্বোচ্চ নাগরিকত্ব পাওয়ার নতুন নজির, নেপথ্যে নতুন আইন!

বার্লিন, ২৫ মে – অভিবাসীদের জন্য স্বপ্নের দেশ জার্মানিতে তৈরি হলো এক নতুন ইতিহাস। গত ২০২৫ সালে রেকর্ড সংখ্যক বিদেশি নাগরিক জার্মানির নাগরিকত্ব (পাসপোর্ট) লাভ করেছেন। দেশটির জনপ্রিয় ও প্রভাবশালী সাপ্তাহিক পত্রিকা ‘ভেল্ট আম জনটাগ’ (Welt am Sonntag)-এর এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, গত বছর (২০২৫ সালে) কমপক্ষে ৩ লাখ ৯ হাজার ৮৫২ জন অভিবাসী জার্মানির নাগরিকত্ব পেয়েছেন। জার্মানির ইতিহাসে এর আগে কখনো এক বছরে এত বিপুল সংখ্যক মানুষ জার্মান পাসপোর্ট পাননি। এর আগের বছর ২০২৪ সালে এই সংখ্যাটি ছিল ২ লাখ ৯১ হাজার ৯৫৫ জন।
জার্মানিতে হঠাৎ নাগরিকত্ব পাওয়ার এই জোয়ারের পেছনে রয়েছে দেশটির সরকারের একটি ঐতিহাসিক আইনি পরিবর্তন। ২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে জার্মানি তাদের নাগরিকত্ব আইনে এক যুগান্তকারী সংশোধন আনে।
আগে জার্মান পাসপোর্ট পেতে হলে অভিবাসীদের নিজ দেশের নাগরিকত্ব (সিটিজেনশিপ) সম্পূর্ণ ছেড়ে দিতে হতো এবং কমপক্ষে ৮ বছর জার্মানিতে বৈধভাবে বসবাস করতে হতো।
নতুন সংশোধিত আইনে দ্বৈত নাগরিকত্বের (Dual Citizenship) পূর্ণ অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, নিজ দেশের নাগরিকত্ব বজায় রেখেই জার্মান পাসপোর্ট পাওয়া সম্ভব। পাশাপাশি জার্মানিতে বসবাসের ন্যূনতম সময়সীমা ৮ বছর থেকে কমিয়ে মাত্র ৫ বছর করা হয়েছে।
এই আইন পাস হওয়ার পর থেকেই দেশটিতে নাগরিকত্বের আবেদন জ্যামিতিক হারে বাড়তে শুরু করে। যার সরাসরি প্রতিফলন দেখা গেছে ২০২৪ ও ২০২৫ সালের পরিসংখ্যানে। ২০২৩ সালের তুলনায় ২০২৪ সালে নাগরিকত্ব পাওয়ার হার এক ধাক্কায় ৪৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছিল। আর ২০২৫ সালে এসে সেই বৃদ্ধির গ্রাফ আরও ৬ শতাংশ উর্ধ্বমুখী রয়েছে।
পত্রিকাটির তথ্যমতে, ২০২৪ সালে যারা জার্মানির পাসপোর্ট হাতে পেয়েছেন, তাদের মধ্যে সিংহভাগই মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ সিরিয়ার নাগরিক (প্রায় ২৮ শতাংশ)। এর ঠিক পরের অবস্থানেই রয়েছেন তুরস্কের নাগরিকরা।
তবে এই হিসাবটি জার্মানির ১৬টি রাজ্যের মধ্যে ১৪টির প্রাপ্ত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে। পূর্বাঞ্চলের দুটি রাজ্য—মেকলেনবুর্গ-ফোরপমার্ন এবং সাকসেন-আনহাল্টের চূড়ান্ত তথ্য এখনো এই তালিকায় যুক্ত হয়নি।
বাজার ও অভিবাসন বিশ্লেষকরা ধারণা করছেন, আগামী ২০২৭ সালের মধ্যে জার্মান নাগরিকত্ব পাওয়ার এই রেকর্ড আরও বড় ব্যবধানে ভেঙে যাবে। আর এর নেপথ্যে থাকবেন ইউক্রেনীয় শরণার্থীরা।
২০২২ সালের শুরুতে ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক অভিযান শুরুর পর লাখ লাখ ইউক্রেনীয় নাগরিক জার্মানিতে আশ্রয় নেন। নতুন আইনের ৫ বছরের শর্ত অনুযায়ী, ২০২৭ সালের বসন্তের (Spring) মধ্যেই এই বিপুল সংখ্যক ইউক্রেনীয় জার্মানিতে ৫ বছর বসবাসের কোটা পূর্ণ করবেন।
২০১৫-১৬ সালে সিরিয়া থেকে আসা শরণার্থীদের শুরুতে কাজের বা পূর্ণ বাসস্থানের অনুমতি পেতে অনেক আইনি জটিলতার মুখোমুখি হতে হয়েছিল। কিন্তু ইউক্রেনীয়রা জার্মানিতে পা রাখার পর থেকেই সরাসরি কাজের অনুমতি এবং পূর্ণ সামাজিক মর্যাদা পেয়েছেন। ফলে ২০২৭ সালের মার্চে তাদের বিশেষ সুরক্ষার (Temporary Protection) মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই, লাখ লাখ ইউক্রেনীয় পাকাপাকিভাবে জার্মানির নাগরিকত্বের পথ বেছে নেবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
এনএন/ ২৫ মে ২০২৬









