নকল ও ভেজাল পণ্যে বাজার সয়লাব: হুমকির মুখে জনস্বাস্থ্য ও বিশাল রাজস্ব

ঢাকা, ২৩ এপ্রিল – দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারের প্রায় ৪০ শতাংশ এখন নকল ও ভেজাল পণ্যের দখলে চলে গেছে। খাদ্যদ্রব্য, শিশুখাদ্য, প্রসাধনী থেকে শুরু করে প্রায় প্রতিটি খাতের পণ্যেই এই বিষাক্ত চক্র বিস্তার লাভ করেছে। এর ফলে একদিকে যেমন জনস্বাস্থ্য গুরুতর হুমকির মুখে পড়ছে, অন্যদিকে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, বৈধ কোম্পানির নামে বাজারে নকল পণ্য ছড়িয়ে পড়ায় সরকারের কোষাগার বছরে অন্তত ৩ হাজার ১৭০ কোটি টাকার রাজস্ব বঞ্চিত হচ্ছে। এছাড়া বৈধ ব্যবসায়ীরা বার্ষিক ১৩ হাজার ৬৮০ কোটি টাকার বিক্রয় ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন। বিভিন্ন রোগের প্রকোপ বৃদ্ধির কারণে দেশের জিডিপিতেও ২ শতাংশ নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বলে গবেষণায় উঠে এসেছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম আট মাসে রাজস্ব ঘাটতি ৭১ হাজার ৪৭২ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। অর্থবছর শেষে এই অঙ্ক এক লাখ কোটি টাকা অতিক্রম করার আশঙ্কা রয়েছে। মূলত অবৈধ ও নকল পণ্যের কেনাবেচা বৃদ্ধি পাওয়ায় সরকার তার প্রত্যাশিত কর আহরণ করতে পারছে না। যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে উন্নয়ন ব্যয় এবং সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির বরাদ্দে। বাংলাদেশ কসমেটিকস অ্যান্ড টয়লেট্রিজ ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন জানিয়েছে, ওষুধ, পানীয়, মসলা ও প্রসাধনীসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় কোনো পণ্যই নকলের হাত থেকে রেহাই পাচ্ছে না। বিশেষ করে বিএসটিআইয়ের ভুয়া সিল ও হলোগ্রাম ব্যবহার করে ভোক্তাদের বিভ্রান্ত করা হচ্ছে।
পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যমতে, দেশের অধিকাংশ পরিবার নিয়মিত দুধ, চা ও কফি পান করে। এসব পণ্য নকল হওয়ায় শিশুরা অপুষ্টি ও কিডনি জটিলতায় এবং প্রাপ্তবয়স্করা লিভারের দীর্ঘমেয়াদী রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর জনবল সংকট, পর্যাপ্ত গবেষণাগারের অভাব এবং সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতাকে এই সংকটের প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সদস্য ড. মোহাম্মদ মোস্তফা জানান, আইনের সীমাবদ্ধতা ও লাইসেন্স প্রদানকারী সংস্থার সঙ্গে তদারকি সংস্থার সমন্বয়হীনতার কারণে অনেক সময় কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
তদন্তে দেখা গেছে, ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন বড় শহরের অনুমোদনহীন কারখানায় এসব ভেজাল পণ্য তৈরি হচ্ছে। বিএসটিআই এবং নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ মাঝে মাঝে অভিযান পরিচালনা করলেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসছে না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, দূষিত খাদ্যের কারণে প্রতি বছর বিশ্বে প্রায় ৬০ কোটি মানুষ অসুস্থ হচ্ছে এবং মারা যাচ্ছে প্রায় ৪ লাখ ৪২ হাজার মানুষ। বাংলাদেশেও ভেজাল খাদ্যের কারণে ক্যানসার ও ডায়াবেটিসের মতো রোগের হার আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাজার তদারকি জোরদার করা এবং নকলকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি হয়ে পড়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
এস এম/ ২৩ এপ্রিল ২০২৬









