ইউরোপ

প্রকৃতির রুদ্ররোষে ব্রিটেন: তুষার ও ঝোড়ো হাওয়ায় বিপন্ন জনজীবন

নজরুল মিন্টো

লন্ডন, ০৯ জানুয়ারি- শক্তিশালী সামুদ্রিক ঝড় ‘গোরেত্তি’র তান্ডবে কার্যত অচল হয়ে পড়েছে সমগ্র ব্রিটেন। গত এক দশকের মধ্যে ভয়াবহতম তুষারপাত আর হাড়কাঁপানো শীতল বাতাসের ঝাপটায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে দেশটির জনজীবন। লন্ডনের হিথ্রোসহ প্রধান বিমানবন্দরগুলোতে শত শত ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে এবং বিদ্যুৎহীন অবস্থায় অন্ধকারে দিন কাটাচ্ছে হাজার হাজার পরিবার আবহাওয়া দপ্তর এই পরিস্থিতিকে ‘ওয়েদার বম্ব’ বা আবহাওয়া বোমা হিসেবে বর্ণনা করে সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করেছে।

গত কয়েকদিন ধরেই ব্রিটেনের আকাশে মেঘের ঘনঘটা ছিল, কিন্তু শুক্রবার সকাল হতেই সেই মেঘ ব্রিটিশ দ্বীপপুঞ্জের ওপর এক বিভীষিকা হয়ে নেমে আসে। উত্তর দিক থেকে ধেয়ে আসা তীব্র শীতল বাতাস আর পালকের মতো ঝরতে থাকা তুষার দ্রুতই এক ভয়াবহ রূপ ধারণ করে। দক্ষিণ-পশ্চিম ইংল্যান্ডে বাতাসের গতিবেগ যখন ঘণ্টায় ৯৯ মাইল স্পর্শ করে, তখনই বোঝা গিয়েছিল যে প্রকৃতি আজ তার চরম প্রতিশোধ নেবে। ঝড়ের তীব্রতায় শুধু গাছপালাই উপড়ে পড়েনি, বরং আধুনিক ব্রিটেনের উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়েছে।

সবচেয়ে ভয়াবহ বিপর্যয় দেখা দিয়েছে ব্রিটেনের আকাশপথে। বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত বিমানবন্দর লন্ডনের হিথ্রো আজ নিস্তব্ধ। ব্রিটিশ এয়ারওয়েজ কর্তৃপক্ষ শুক্রবার সকাল পর্যন্ত তাদের ৫২টি গুরুত্বপূর্ণ ফ্লাইট বাতিল করতে বাধ্য হয়েছে। এর মধ্যে ২৫টি বহির্গামী এবং ২৭টি আগত ফ্লাইট। মূলত প্যারিস, আমস্টারডামসহ ইউরোপের বিভিন্ন গন্তব্যে যাওয়ার কথা ছিল এই বিমানগুলোর। রানওয়েতে জমে থাকা কয়েক ইঞ্চি পুরু বরফের স্তর পরিষ্কার করতে হিমশিম খাচ্ছে কর্তৃপক্ষ। হিথ্রো ছাড়াও বার্মিংহাম বিমানবন্দরের অবস্থা আরও করুণ। সেখানে রানওয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব না হওয়ায় বিমান ওঠানামা পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ইস্ট মিডল্যান্ডস বিমানবন্দর আজ ভোরে কিছুক্ষণ চালু হওয়ার চেষ্টা করলেও বৈরী আবহাওয়ার কারণে বারবার কার্যক্রম স্থগিত করতে হচ্ছে।

আকাশপথের এই বিশৃঙ্খলার মাঝে সাধারণ মানুষের ভোগান্তির সীমা নেই। বার্মিংহাম বিমানবন্দরে আটকে পড়া একজন যাত্রী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার ক্ষোভ উগড়ে দিয়ে জানিয়েছেন, তাদের তিন ঘণ্টা ধরে বিমানের ভেতরে বসিয়ে রাখা হয়েছিল কিন্তু বাইরে নামতে দেওয়া হয়নি। কারণ বাইরে রানওয়ে এতই পিচ্ছিল ছিল যে যাত্রীদের পড়ে গিয়ে বড় কোনো দুর্ঘটনার আশঙ্কা ছিল। বিমানবন্দরের নিরাপত্তা কর্মীরা জানিয়েছেন, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কোনো যাত্রীকে তারা টার্মিনালে নিতে চাচ্ছেন না। ফলে শত শত যাত্রী বিমানের ভেতরেই এক প্রকার বন্দি জীবন কাটাচ্ছেন।

অন্যদিকে রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা আজ সকাল থেকেই পুরোপুরি অচল হয়ে পড়েছে। লন্ডন নর্থ-ওয়েস্টার্ন এবং ওয়েস্ট মিডল্যান্ডস রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ তাদের সব যাত্রীদের কাছে বিশেষ অনুরোধ জানিয়েছে যেন তারা আজ ঘর থেকে বের না হন। তুষারপাতের কারণে রেললাইনে যান্ত্রিক গোলযোগ দেখা দিয়েছে এবং সিগন্যাল ব্যবস্থা অকেজো হয়ে পড়েছে। অনেক স্টেশনে যাত্রীরা পৌঁছে দেখছেন যে তাদের নির্ধারিত ট্রেনটি বাতিল করা হয়েছে। প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে থাকা যাত্রীদের অবস্থা অবর্ণনীয়, কারণ কনকনে ঠান্ডার মধ্যে দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করা অনেকের জন্যই যন্ত্রণাদায়ক হয়ে উঠেছে।

বিদ্যুৎহীনতা এই দুর্যোগের মাত্রাকে আরও কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। জাতীয় গ্রিড বা ন্যাশনাল গ্রিডের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ঝড়ের আঘাতে দেশটির প্রায় ৬০ হাজার বাড়ি এখন অন্ধকারে ডুবে আছে। দক্ষিণ-পশ্চিম ইংল্যান্ডেই ৪৩ হাজারের বেশি পরিবার গত রাত থেকে বিদ্যুৎহীন। হিমাঙ্কের নিচে তাপমাত্রায় যেখানে ঘর গরম রাখার জন্য হিটার অপরিহার্য, সেখানে বিদ্যুৎ না থাকা মানে এক চরম মানবিক সংকট। বিশেষ করে বয়স্ক ও শিশুদের জন্য এই পরিস্থিতি অত্যন্ত বিপজ্জনক। ওয়েলস এবং মিডল্যান্ডসের অনেক এলাকায় উপড়ে পড়া বিশাল বিশাল গাছ রাস্তার ওপর পড়ে থাকায় বিদ্যুৎ সংস্কার কর্মীরা সেখানে পৌঁছাতে পারছেন না।

লন্ডন শহরের চিত্রও খুব একটা স্বস্তিদায়ক নয়। যদিও রাজধানীর মূল অংশে তুষারপাত মিডল্যান্ডসের মতো আকাশছোঁয়া নয়, কিন্তু বৃষ্টির সাথে ঝোড়ো হাওয়া আর হাড়কাঁপানো ঠান্ডায় রাজধানীবাসী দিশেহারা। রাস্তাঘাট এবং ফুটপাত এখন এক একটি কাঁচের মেঝের মতো পিচ্ছিল হয়ে আছে। লন্ডনবাসীরা সামাজিক মাধ্যমে স্থানীয় কাউন্সিলগুলোর বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। অভিযোগ উঠেছে যে আগে থেকে ঝড়ের পূর্বাভাস থাকা সত্ত্বেও রাস্তা এবং ফুটপাতে পর্যাপ্ত পরিমাণ লবণ বা গ্রিট ছিটানো হয়নি। ফলে মানুষজন কাজে বের হতে গিয়ে বারবার পিছলে পড়ে আহত হচ্ছেন। সাইকেল চালকদের অবস্থা সবচেয়ে খারাপ। পিচ্ছিল রাস্তায় চাকা পিছলে গিয়ে বড় ধরনের সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

দুর্যোগের এই কঠিন সময়ে কিছু লোমহর্ষক ঘটনার খবরও পাওয়া যাচ্ছে। পূর্ব লন্ডনে একটি জমে যাওয়া পুকুরে খেলতে গিয়ে দুই শিশু বরফের নিচে পড়ে গেলে তাদের উদ্ধার করতে ফায়ার সার্ভিসকে প্রাণপণ লড়াই করতে হয়। ঠান্ডায় জমে যাওয়া পানির মরণকামড় থেকে শিশুদের শেষ পর্যন্ত জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হলেও এই ঘটনাটি পুরো এলাকায় আতঙ্কের সৃষ্টি করেছে। যাতায়াত ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এমনকি সংবাদমাধ্যমের কর্মীরাও রেহাই পাচ্ছেন না। বিবিসির একজন সুপরিচিত উপস্থাপক জানিয়েছেন যে ঝড়ের কারণে সব পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তাকে স্টুডিওর ভেতরেই রাত কাটাতে হয়েছে।

আবহাওয়াবিদদের মতে, এই পরিস্থিতির মূল কারণ হলো বায়ুমণ্ডলীয় চাপের আকস্মিক এবং দ্রুত পতন। যখন কোনো শক্তিশালী নিম্নচাপ মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ২৪ মিলিবার বা তার বেশি চাপ হারিয়ে ফেলে, তখনই একে বিজ্ঞানের ভাষায় ‘ওয়েদার বম্ব’ বলা হয়। আজ সারাদিন লন্ডনের তাপমাত্রা ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে ওঠার কোনো সম্ভাবনা নেই। রাতে এই আবহাওয়া আরও ভয়াবহ হতে পারে কারণ বৃষ্টির পানি জমে গিয়ে রাস্তাগুলোতে বরফের একটি অদৃশ্য স্তর তৈরি করবে, যাকে বলা হয় ‘ব্ল্যাক আইস’। এই ব্ল্যাক আইস সাধারণ মানুষের হাঁটাচলা এবং গাড়ি চালানোর জন্য এক মরণফাঁদ।

এই দুর্যোগে ব্রিটিশ সরকারের ব্যবস্থাপনা এবং স্থানীয় কাউন্সিলগুলোর আগাম প্রস্তুতি নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন উঠছে। সাধারণ মানুষের মতে, প্রতি বছর এমন পরিস্থিতির জন্য কোটি কোটি পাউন্ড খরচ করা হলেও সামান্য তুষারপাতে কেন পুরো দেশ স্থবির হয়ে পড়বে? কেন হাজার হাজার মানুষকে অন্ধকারে কাটাতে হবে? বিশেষ করে মিডল্যান্ডসের মতো গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলগুলোতে উদ্ধার তৎপরতা আরও গতিশীল হওয়া প্রয়োজন ছিল বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

তবে প্রতিকূলতার মাঝেও মানুষের মধ্যে একতাবদ্ধ হওয়ার চিত্র দেখা যাচ্ছে। অনেক এলাকায় প্রতিবেশীরা একে অপরের খোঁজ নিচ্ছেন এবং বিদ্যুৎহীন বাড়িতেগরম খাবার পৌঁছে দিচ্ছেন। রেড ক্রস এবং অন্যান্য স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলো দুর্গম এলাকাগুলোতে বৃদ্ধ এবং অসহায়দের সহায়তায় কাজ শুরু করেছে। প্রকৃতির এই রুদ্ররূপ হয়তো আরও কয়েক দিন বজায় থাকবে, কিন্তু ব্রিটেনবাসীর এই সম্মিলিত লড়াই-ই হয়তো শেষ পর্যন্ত ঝড় গোরেত্তির বিরুদ্ধে ঘুরে দাঁড়ানোর শক্তি জোগাবে।

আগামী ২৪ ঘণ্টা ব্রিটেনের জন্য অত্যন্ত সংকটময়। আবহাওয়া অফিস থেকে লাল এবং হলুদ সতর্কবার্তা জারি করা হয়েছে দেশের বিভিন্ন অংশে। অপ্রয়োজনে ঘর থেকে বের না হওয়া এবং রাস্তায় চলাচলের সময় সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। যারা একান্তই জরুরি প্রয়োজনে যাতায়াত করছেন, তাদের সাথে অতিরিক্ত গরম কাপড় এবং পর্যাপ্ত খাবার রাখার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ করা হয়েছে। প্রকৃতির এই বৈরী রূপ আমাদের আবারও মনে করিয়ে দেয় যে মানুষের তৈরি সব প্রযুক্তি আর আধুনিকতা শেষ পর্যন্ত প্রকৃতির এক একটি প্রচণ্ড আঘাতের সামনে কতটা অসহায়। ঝড় গোরেত্তি ব্রিটেনের গতি থমকে দিলেও মানুষের বেঁচে থাকার অদম্য ইচ্ছাকে হয়তো স্তব্ধ করতে পারবে না।

আশা করা হচ্ছে যে সামনের সপ্তাহের শুরুতে আবহাওয়ার কিছুটা উন্নতি হতে পারে। তবে ততক্ষণ পর্যন্ত ব্রিটেনের প্রতিটি নাগরিককে এক কঠিন ধৈর্যের পরীক্ষা দিতে হবে। তুষার শুভ্র এই সকালগুলো যখন বিভীষিকা হয়ে নামে, তখন পারস্পরিক সহমর্মিতাই হয় টিকে থাকার একমাত্র অবলম্বন। ঝড় থামবে, আকাশ আবার পরিষ্কার হবে, কিন্তু গোরেত্তির রেখে যাওয়া এই দহন ব্রিটিশ জনজীবন হয়তো বহু বছর মনে রাখবে।


Back to top button
🌐 Read in Your Language