সম্পাদকের পাতা

প্রতারণার ছায়ায় ঢাকা টরন্টোর এক দম্পতির কাহিনি

নজরুল মিন্টো

কানাডার অভিবাসী জীবনে সাফল্যের গল্প যেমন আছে, তেমনি আছে অনিশ্চয়তা আর প্রতারণার শিকার হয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়ার বেদনা। সমৃদ্ধির স্বপ্ন নিয়ে ঘর ছাড়ার মানুষগুলো মনে করেছিল বিদেশের মাটিতে পরিশ্রম আর সততার ওপর দাঁড়িয়ে একটা ভবিষ্যৎ গড়ে তুলবে। কিন্তু কিছু মানুষের লোভ, অসত্য প্রতিশ্রুতি আর সুন্দর কথার আড়ালে লুকিয়ে থাকা ফাঁদের কারণে এই স্বপ্নগুলো আজ দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে অনেকের জন্য। এই অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এমনই এক দম্পতির গল্প, যাঁদের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে গুরুতর অভিযোগ ঘুরে বেড়াচ্ছে। তারা হলেন মোরশেদা শরিফ, যিনি কমিউনিটিতে ছন্দা নামে পরিচিত, এবং তাঁর স্বামী রিয়েলটর মাসুদ গালিব।

টরন্টোর বহু পরিবার, বিশেষ করে নতুন অভিবাসী ও সীমিত আয়ের মানুষ, এদের কারণে আজ আর্থিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি। এই দম্পতির কথিত প্রতারণার জালে আটকে কেউ হারিয়েছেন জীবনের সকল সঞ্চয়, কেউবা ঋণের বোঝায় ডুবে ক্রমেই অন্ধকারে তলিয়ে গেছেন। কেউ নিজের বাড়ি হারিয়ে এখন অন্ধকার বেসমেন্টের বাসিন্দা।

মোরশেদা শরিফ ছন্দা

মোরশেদা শরিফ ছন্দা নিজেকে পরিচয় দিতেন একজন অভিজ্ঞ মর্টগেজ ব্রোকার হিসেবে। প্রথম সাক্ষাতে তার হাসি আর মধুর কথায় মনে হতো তিনি যেন পরিবারেরই একজন। তাঁর কথাবার্তা ছিল এমনভাবে সাজানো যে যেকোনো মানুষ তাঁকে ভরসা করে ফেলে।

মোরশেদা শরীফের বিজনেস কার্ড

তাঁর স্বামী মাসুদ গালিব ছিলেন রিয়েলটর। দেখতে যতটুকু সহজ সরল ভেতরে ভেতরে ততটুকু লোভী। এই দুইজন মিলে মানুষকে এমন ধারণা দিতেন, যেন ব্যাংকের কর্তা ব্যক্তিদের সাথে তাঁদের সরাসরি যোগাযোগ আছে। যেন কোনো জটিল কাগজপত্র তাঁদের এক ফোনেই পাশ হয়ে যায়। কেউ বাড়ি কিনতে সমস্যায় আছেন, কারো আয় কম, কারো ডাউন পেমেন্ট নেই, আবার কারো ট্যাক্স বা ক্রেডিট স্কোর ভালো নয়। মোরশেদা তখন বলতেন, সবকিছু তিনি ঠিক করে দিতে পারবেন, শুধু তাঁর নির্দেশ অনুসরণ করতে হবে।

রিয়েলটর মাসুদ গালিব

বলা হয়, টরন্টোর অভিবাসী সমাজে মোরশেদার যোগাযোগ, তার কাগজপত্র তৈরির দক্ষতা এবং আইনজীবীদের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা দেখে অনেকে মুগ্ধ হতেন। আর এখান থেকেই তৈরি হয় এক অদৃশ্য ফাঁদ। মানুষ বিশ্বাস করতে শুরু করে, তিনি যেহেতু দীর্ঘদিন ধরে মর্টগেজের কাজ করছেন এবং নিজের পরিচিত পরিমণ্ডলে প্রভাবশালী, তাই তাঁর কাছে সাহায্য নেওয়া নিরাপদ। সেই বিশ্বাসই পরে বহু পরিবারকে সর্বনাশের দিকে ঠেলে দেয়।

আদালতের নথিতে পাওয়া গেছে, বহু ক্ষেত্রে মোর্শেদা ফোনে মর্টগেজ আবেদন পূরণ করতেন। ভুক্তভোগীরা জানতেনই না তাদের নামে কোন্ তথ্য লেখা হচ্ছে, কোন্ আয় দেখানো হচ্ছে, কোন্ চাকরির কাগজ তৈরি হচ্ছে।

মোর্শেদার বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি অভিযোগ মর্টগেজ প্রক্রিয়াকে ঘিরে। বহু ভুক্তভোগী জানিয়েছেন, মোরশেদা তাঁদের আয় বাড়িয়ে দেখাতেন, ভুয়া চাকরির চিঠি বানিয়ে দিতেন, ব্যাংক স্টেটমেন্টে পরিবর্তন আনতেন, এমনকি ট্যাক্স রিটার্ন বা CRA ডকুমেন্ট পর্যন্ত সাজিয়ে মর্টগেজ অ্যাপ্লিকেশন জমা দিতেন। ক্লায়েন্টের সমস্যার কথা তিনি কখনোই তাদের জানাতেন না, বরং বলতেন, “চিন্তা করবেন না, এগুলো শুধু দেখানোর জন্য, শুধু সই করে দিন।”

এই ভুয়া কাগজপত্রের বিপর্যয় শুরু হয় তখন, যখন হঠাৎ করে বড়সড় কিস্তি থেমে যায়, ব্যাংক তদন্ত শুরু করে, অথবা মর্টগেজ রিনিউয়ের সময় সত্য বেরিয়ে আসে। ভুক্তভোগী তখন বুঝতে পারেন, তাদের নামে নেওয়া মর্টগেজটি ছিল এক ধরনের ফাঁদ। আয় অনুযায়ী কিস্তি পরিশোধ সম্ভব ছিল না, তাঁরা কখনোই সেই টাকা দিতে পারার সক্ষমতায় ছিলেন না। শেষ পর্যন্ত কেউ কেউ বাড়ি হারিয়েছেন, কেউ বিশাল অর্থ ঋণে জড়িয়ে পড়েছেন।

মোরশেদার স্বামী রিয়েলটর মাসুদ গালিব নিজেকে একজন সফল ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচয় দিয়ে মানুষকে বিনিয়োগের লোভ দেখাতেন। বলা হতো, কিছু নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করলে দ্রুত লাভ পাওয়া যাবে। বাস্তবে এসব প্রতিষ্ঠান ছিল ভুয়া বা লাইসেন্সবিহীন। কমিশন পাওয়া ছিল তাঁদের একমাত্র উদ্দেশ্য। তার ফেসবুক ওয়ালে একটি পোস্টার তিনি পোস্ট করেছেন, সেখানে ইংরেজিতে লেখা আছে, “Let’s Make Your Life Savings be A Better Investment For Your Future।”

মোরশেদা-গালিব মানুষকে বাড়ি বন্ধক রাখতে বিশেষভাবে উৎসাহ দিতেন। তারা বলতেন, “এটা খুব সাধারণ প্রক্রিয়া, কোনো ব্যাপারই না।” উদ্দেশ্য ছিল একটাই, তাদের মাধ্যমে নেওয়া লোনে কমিশন পাওয়া। তাই তারা ব্যাংক বাদ দিয়ে প্রাইভেট লেন্ডারের কাছ থেকে লোন নিতে জোর দিতেন, যদিও প্রাইভেট লোনে থাকে কঠিন সব শর্ত এবং সুদের হারও থাকে অনেক বেশি। পরে জানা যায়, এ ধরনের লোন পরিশোধ করা অধিকাংশ মালিকের পক্ষেই প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।

অনেক পরিবার জানিয়েছেন, দ্বিতীয় মর্টগেজ বা হোম ইকুইটি লোন নিয়ে তাঁরা এমন ঋণের ফাঁদে পড়েছেন, যেখান থেকে আর বেরিয়ে আসা সম্ভব হয়নি। কেউ কেউ আজ নিজের বাড়ি হারিয়ে ভাড়া বাড়িতে বাস করছেন। নতুন অভিবাসী পরিবারের কাছে এটি শুধু আর্থিক ধ্বংস নয়, বরং মানসিকভাবে সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ার মতো অভিজ্ঞতা।

ভুক্তভোগী অশোয়ার বাসিন্দা আবুল কালাম আহমদ হোসেন ওরফে টিটন

অশোয়ায় বসবাসরত আবুল কালাম মাহমুদ হোসেন টিটনের সঙ্গে গালিবের বন্ধুত্বের বয়স চার দশকেরও বেশি। নব্বইয়ের দশকে উচ্চশিক্ষার্থে তারা ম্যানিলায় যান এবং একই বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করেন। তারপর দু’জনেই সৌদি আরবে ভাল বেতনে একই কোম্পানিতে চাকুরি জীবন শুরু করেন। বন্ধুত্বটা এত নিবিড় ছিল যে, বহুদিন তারা একই বিছানায় ঘুমিয়েছেন।

পরবর্তীতে তাঁরা কানাডায় ইমিগ্রেশন নিয়ে নতুন জীবনের পথে হাঁটেন। দুই পরিবারের মধ্যে সম্পর্ক এতটাই গভীর ছিল যে, একসময় সবাই তাদের “এক পরিবার” বলেই চিনত। টিটনের স্ত্রী সিফাত ও গালিবের স্ত্রী মোরশেদা একই কলেজের ছাত্রী ছিলেন। সবকিছু মিলিয়ে দুই পরিবারের সম্পর্ক ছিল নিখাদ আস্থা ও স্নেহের বন্ধনে বাঁধা।

২০২৩ সালের এক সময় টিটন দম্পতি বেড়াতে যান গালিবের রিচমন্ড হিলের বাড়িতে। সেদিনের আড্ডায় মোরশেদা এমনভাবে বিনিয়োগের গল্প শুরু করলেন যে সিফাত একেবারে মুগ্ধ হয়ে যান। মোরশেদা জানান, তাঁরা একটি বিশেষ কোম্পানিতে বিনিয়োগ করেছেন এবং সেখান থেকে প্রতিমাসে তাঁদের অ্যাকাউন্টে জমা হয় দুই শতাংশ লভ্যাংশ।

বাড়ি ফিরে সিফাত তাঁর স্বামী টিটনকে বারবার বোঝাতে থাকেন যে তিনি তাঁর সঞ্চিত পঞ্চাশ হাজার ডলার বিনিয়োগ করবেন। প্রথমে দ্বিধায় ছিলেন টিটন। তিনি গালিবকে ফোন করে বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চান।

গালিব জানান, ঘটনা সত্যি। বছরে চব্বিশ শতাংশ লাভ। কোন ঝুঁকি নেই।” তিনি আরও যুক্ত করেন, “HYWI Capital খুব বড় কোম্পানি। ছোট বিনিয়োগ তারা নেয় না। যদি বেশি ইনভেষ্ট করেন, তাহলে আমি কথা বলব।”

অবশেষে টিটন ও সিফাত সিদ্ধান্ত নেন তারা দেড় লক্ষ ডলার বিনিয়োগ করবেন। ইত্যবসরে গালিব মার্ক কামিংস নামে এক ব্যক্তিকে HYWI Capital-এর সিইও পরিচয়ে টিটনের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। মার্কের কথা বলার ধরন এমন ছিল যেন তিনি বিশাল একটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের কর্তা।

Mark Cummings

পেমেন্টের দিন ঠিক হলো। টিটন দেড় লক্ষ ডলারের চেক মার্ক কামিংসের নামে লিখে দিলেন। প্রশ্ন উঠেছিল—চেকটি কোম্পানির নামে হচ্ছে না কেন? কিন্তু গালিব তখন আত্মবিশ্বাস নিয়ে বলেছিলেন, “কোনো সমস্যা নেই, এটা অ্যাগ্রিমেন্টে লিখা থাকবে।” চার দশকের সম্পর্কের ওপর ভরসা করে টিটন আর কিছু জিজ্ঞেস করেননি।

চেক দেওয়ার পরই শুরু হয়ে যায় প্রত্যাশিত লভ্যাংশ। প্রতি মাসে দুই শতাংশ করে টাকা টিটন–সিফাত দম্পতির অ্যাকাউন্টে জমা হতে থাকে। টানা ছয় মাস ধরে নিয়মিত লভ্যাংশ পেয়ে টিটন দম্পতির চোখে স্বপ্ন আরও বড় হতে থাকে।

এরিমধ্যে হঠাৎ একদিন গালিব ফোন করে বলেন, কোম্পানি তাদের বিনিয়োগ বৃদ্ধি করতে চায়। “এখন লাভ আরও বেশি দেবে। যা পারেন ইনভেস্ট করেন।” এতদিন লভ্যাংশ ঠিকমতো আসায় টিটন আর কোনো প্রশ্ন করেননি। তিনি নিজের লাইন অব ক্রেডিট থেকে পঞ্চাশ হাজার ডলার উঠিয়ে হাসিমুখে গালিবের হাতে তুলে দেন।

কিন্তু এরপরই শুরু হলো কাহিনির অন্ধকার অধ্যায়। সেই অধ্যায়, যার ভেতর লুকিয়ে আছে প্রতারণা আর বিশ্বাসভঙ্গ। লভ্যাংশ আর আসে না। এক সপ্তাহ যায়, তারপর এক মাস, এভাবে এক বছর। প্রতিশ্রুতির পেছনে ছুটতে ছুটতে একসময় তাঁরা বুঝতে পারলেন, এ সবই ছিল নিখুঁত ছলনা।

মার্ক কামিংস যে ঠিকানা থেকে ইমেইল পাঠিয়েছেন

ঠিক সেই সময়ে মার্ক কামিংস একটি ইমেইল পাঠালেন। কয়েকটি নির্লিপ্ত বাক্যের ভেতরেই লুকিয়ে ছিল ভাঙা স্বপ্নের চূড়ান্ত ঘোষণা। সেই ইমেইল ছিল তাঁদের বিশ্বাসভঙ্গের নির্মম সিলমোহর। আরও জানা গেল, গালিব এবং মোরশেদা কমিশনের লোভে তাঁদের এই প্রতারণার জালে ফেলেছিলেন। মার্ক কামিংসের ইমেইল থেকে জানা গেলো মোরশেদা কমিশন বাবদ এক মিলিয়ন ডলার কামিয়েছেন এবং গালিব কামিয়েছেন সত্তর হাজার ডলারেরও বেশি। (ইমেইলের স্ক্রিনশট সংযুক্ত করা হলো)

দীর্ঘ ইমেইলের অংশ বিশেষ

টিটন যাকে এতদিন ভাই বলে মনে করতেন, যে পরিবারের সঙ্গে জীবনের সুখ–দুঃখ ভাগ করেছেন, সেই মানুষগুলোই শেষ পর্যন্ত বিশ্বাসের মূলে আঘাত করে কেড়ে নিলেন তার পরিবারের শান্তি।

ইমেইলের সেই অংশ বিশেষের বাংলা অনুবাদ

পরবর্তী পর্বে: মোরশেদা–গালিবের টার্গেট করা নারীদের কাহিনি, লাবন্যের জীবনের পতন, আর HYWI Capital–এর ভেতরের বিস্ফোরক ইমেইলের সত্য।

(অপেক্ষায় থাকুন….)


Back to top button
🌐 Read in Your Language