প্রেমে প্রত্যাখ্যাত হয়ে এক নারীকে ICE এজেন্ট সেজে হুমকি দেওয়ায় নিউ ইয়র্কে NYPD এর বাংলাদেশি সার্জেন্ট আতিকুল ইসলাম গ্রেপ্তার
নজরুল মিন্টো

বছরজুড়ে রাজনীতি, অপরাধ, প্রযুক্তি কিংবা আন্তর্জাতিক উত্তেজনার নানা খবরে সরগরম থাকে যুক্তরাষ্ট্র। তবে কিছু ঘটনা এমনভাবে জনমনে নাড়া দেয় যে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে মুহূর্তেই। নিউ ইয়র্কে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত পুলিশ সার্জেন্ট আতিকুল ইসলামকে ঘিরে সাম্প্রতিক বিতর্ক তেমনই এক বিষয়। অনলাইনে পরিচিত এক নারীর সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে না ওঠায় প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে ওঠা একজন পুলিশ কর্মকর্তা, ফেডারেল সংস্থার পরিচয় ভুয়া দাবি করে হুমকি প্রদান এবং তার পরিণতিতে গ্রেপ্তার, আদালতে হাজিরা এবং ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা সব মিলিয়ে এই ঘটনাটি এখন পুরো আমেরিকায় আলোচনার কেন্দ্রে।
সংবাদটি প্রথম প্রকাশ করে নিউ ইয়র্ক পোস্ট, যা পরে যুক্তরাষ্ট্রের আরও কয়েকটি গণমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। প্রতিবেদনে বলা হয়, নিউ ইয়র্ক পুলিশ ডিপার্টমেন্টের সার্জেন্ট আতিকুল ইসলাম (২৯), অনলাইনে পরিচিত এক নারীকে প্রেমের প্রস্তাব দেন এবং ওই নারী তাঁকে প্রত্যাখ্যান করলে ঘটনাটি আকস্মিক মোড় নেয়। প্রতিশোধের উদ্দেশ্যে তিনি নিজেকে ICE এর একজন উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তা হিসেবে পরিচয় দিয়ে ওই নারীকে ভয় দেখানোর চেষ্টা করেন। বিষয়টি দ্রুতই ফেডারেল অপরাধের পর্যায়ে চলে যায়।
ব্রুকলিনের সার্ভিস এরিয়া থ্রি থেকে কর্মরত সার্জেন্ট আতিকুল ইসলাম তাঁর বাবা ও ভাইয়ের সঙ্গে বসবাস করেন। তদন্তে জানা যায়, তিনি অনলাইনে পরিচিত ওই নারীকে বেশ কিছুদিন ধরে ঘনিষ্ঠ হওয়ার চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু সম্পর্কের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর তিনি নানাভাবে চাপ সৃষ্টি করতে শুরু করেন। অভিযোগপত্র অনুসারে, গত মার্চে কর্তব্যের বাইরে তিনি ওই নারীকে ফোন ও বার্তায় জানান যে ICE কর্মকর্তারা তাঁর কুইন্সের বাসায় পৌঁছে যাবে যে কোনো সময়। শুধু তাই নয়, তিনি নিজেকে ICE এর ফিল্ড ডিরেক্টর বলে পরিচয় দেন এবং দাবি করেন যে ওই নারী ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের ১৫ এপ্রিল নিউ ইয়র্ক সিটির অফিসে হাজির হতে হবে।
তদন্তকারীরা আরও জানতে পারেন, অনলাইনে আতিকুল ইসলাম নিজেকে জেমস ডব্লিউ অ্যান্ডারসন নামেও পরিচয় দিতেন। বহুরূপী পরিচয়ের এই ব্যবহার তদন্তকারীদের আরও সন্দেহে ফেলেছে। ভুক্তভোগী নারী ভয় পেয়ে ঘটনাটি NYPD এর ইন্টারনাল অ্যাফেয়ার্স ব্যুরোতে জানান। অভ্যন্তরীণ তদন্তে নিশ্চিত হয় যে সার্জেন্ট আতিকুল ইসলাম সত্যিই ICE কর্মকর্তার পরিচয় ব্যবহার করেছেন, যা একটি গুরুতর ফেডারেল অপরাধ। পরে NYPD বিষয়টি অবিলম্বে যুক্তরাষ্ট্রের ডিপার্টমেন্ট অফ হোমল্যান্ড সিকিউরিটিকে জানায়।

ঠিক এই পর্যায়ে ঘটনাটি ছড়িয়ে পড়ে কমিউনিটিতে এবং শুরু হয় ব্যাপক প্রতিক্রিয়া। নিউ ইয়র্ক এবং আশপাশের বাংলাদেশি সম্প্রদায়ের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। অনেকে বিস্ময় প্রকাশ করে বলেছেন, ব্যক্তিগত সম্পর্কের ব্যর্থতা কখনোই একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তাকে এমন বিপজ্জনক পথে ঠেলে দিতে পারে না। অভিবাসীদের নিরাপত্তা, আস্থা এবং মানসিক স্থিতির ওপর ICE সম্পর্কিত যেকোনো হুমকি সরাসরি আঘাত করে। তাই বিষয়টি কেউই হালকাভাবে নিচ্ছেন না।
বাংলাদেশি আমেরিকান কমিউনিটির নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গরা বলছেন, নিউ ইয়র্কে বাংলাদেশিরা দীর্ঘদিন ধরে কঠোর পরিশ্রম, সততা এবং নৈতিকতা দিয়ে নিজেদের একটি পরিচিতি গড়ে তুলেছেন। একজন ব্যক্তির ভুল সিদ্ধান্ত পুরো সম্প্রদায়ের সুনাম ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
তরুণ প্রজন্মের মধ্যেও আলোচনা চলছে যে একজন পুলিশ কর্মকর্তার কাছ থেকে পেশাদারিত্বই প্রত্যাশিত, সেখানে প্রতিশোধপরায়ণতা শুধু হতাশাজনক নয়, বরং কমিউনিটির প্রতি দায়িত্ববোধের ঘাটতিও প্রকাশ করে। অনেকে আশা করছেন যে আইনের সঠিক প্রয়োগ এই ঘটনার মাধ্যমে নিশ্চিত হবে এবং ভবিষ্যতে এমন আচরণ থেকে অন্যরা বিরত থাকবে।
ফেডারেল তদন্তে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে আসে। ভুক্তভোগী নারী কিংবা তাঁর পরিবারের প্রকৃত অভিবাসন অবস্থা পরিষ্কার নয়। তবে এই অনিশ্চয়তাই আতিকুল ইসলামের হুমকিকে আরও ভয়ঙ্কর করে তুলেছিল।
পরবর্তীতে ফেডারেল গ্র্যান্ড জুরি তাঁর বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের কর্মকর্তা পরিচয় ভুয়া ব্যবহার করার অভিযোগে এক দফা মামলা দায়ের করে। ১৮ নভেম্বর তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে ব্রুকলিনের ম্যাজিস্ট্রেট বিচারক ট্যারিন মার্কলের আদালতে হাজির করা হলে তিনি নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন। বিচারক তাঁকে ২৫ হাজার ডলারের ব্যক্তিগত বন্ডে মুক্তি দেন। তবে মুক্তির শর্ত ছিল কঠোর। তাঁকে ভুক্তভোগী নারীর বাসার আশপাশে যাওয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয় এবং ভুক্তভোগীর সঙ্গে যেকোনো ধরনের যোগাযোগও নিষিদ্ধ করা হয়।
আদালতে সহকারী যুক্তরাষ্ট্র অ্যাটর্নি রেবেকা শুমান বিচারকের উদ্দেশে বলেন যে আতিকুল ইসলাম ভুক্তভোগীর ঠিকানা জানেন, তাই তাঁর চলাচলে সীমাবদ্ধতা আরোপ করা প্রয়োজন। আইনজীবীর বক্তব্যে বিষয়টির সংবেদনশীলতা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
সার্জেন্ট আতিকুল ইসলামের আইনজীবী জন আরলিয়া আদালতে জানান যে NYPD তাঁর ব্যাজ ও সার্ভিস অস্ত্র জব্দ করেছে এবং তাঁকে বেতনসহ সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। তিনি জানান, তাঁর মক্কেল অভিযোগগুলোর বিরুদ্ধে লড়াই করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
আদালত ভবন থেকে বের হওয়ার সময় সাংবাদিকরা যখন জানতে চান কেন তিনি নিজেকে ICE কর্মকর্তা পরিচয় দিয়েছিলেন, তখন তিনি কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান।
অভিযোগ প্রমাণিত হলে তাঁর সর্বোচ্চ তিন বছরের কারাদণ্ড হতে পারে। মামলার পরবর্তী শুনানির দিন নির্ধারিত হয়েছে ৬ জানুয়ারি ২০২৬।
এই মামলা এখন নিউ ইয়র্ক শহরের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, ফেডারেল কর্তৃপক্ষ এবং বাংলাদেশি কমিউনিটি সবার নজরে। বিচার প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে আগামী মাসগুলোতে এই ঘটনার ভবিষ্যৎ পরিণতি নির্ধারিত হবে এবং সামনে আরও তথ্য প্রকাশ পাওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।
তথ্যসূত্র:
- New York Post (১৮ নভেম্বর ২০২৫)
- U.S. Department of Homeland Security (DHS)
- United States District Court, Eastern District of New York









