সম্পাদকের পাতা

কানাডিয়ান নীল পাসপোর্টের হাল-হকিকত!

নজরুল মিন্টো

কানাডার নীল কভারের পাসপোর্টটা হাতে পেয়ে একসময় ভেবেছিলাম—শরীরে বাতাস লাগিয়ে পৃথিবী চষে বেড়াবো। নিজের ইচ্ছেমতো উড়োজাহাজ বদলাব। সিডনি, টোকিও, কায়রো, লন্ডনের ইমিগ্রেশনে আর কোনো প্রশ্নের সন্মুখিন হতে হবে না। কিন্তু এখন? আমিও পাসপোর্ট পেলাম আর পৃথিবীর সিস্টেমও পাল্টে গেলো! আজকাল ‘ভিসা’ শব্দটার নামই বদলে গেছে। কেউ বলে ETA, কেউ বলে VOA, কেউ বা e-Visa। কানাডিয়ান পাসপোর্ট বলে কোথাও কোনো বিশেষ সুবিধা নেই। এটাই এখন নতুন বাস্তবতা।

ইউরোপ ভ্রমণের প্রস্তুতি নিয়েছি। অনেকগুলো দেশ ঘোরার ইচ্ছে। যেই ভাবা সেই কাজ। টরন্টো টু লন্ডন টিকিট কেটে ফেললাম। বিভিন্ন দেশে বসবাসরত আত্মীয়-বন্ধুদের সাথে কথা বলে প্ল্যানও করলাম। হঠাৎই শুনি—যুক্তরাজ্যে ঢুকতে এখন ETA (Electronic Travel Authorisation) লাগবে। এ কেমন কথা! একই রাজা, একই রাজার (কানাডা ও যুক্তরাজ্যের রাষ্ট্রপ্রধান রাজা চার্লস III) এক দেশ থেকে আরেক দেশে যেতে ভিসা লাগবে? অবিশ্বাস্য ব্যাপার! বিশ্বাস হোক, বা নাই হোক, নিয়ম তো মানতে হবে। অতঃপর অনলাইনে অ্যাপ ডাউনলোড করে £১৬ পাউন্ড (৩০ ডলার) ফি দিয়ে ETA নিলাম।

কানাডিয়ান পাসপোর্ট নিয়ে নিজ দেশ বাংলাদেশে যেতে ভিসা লাগবে এটা কস্মিনকালেও ভাবিনি। ভেবেছিলাম ডুয়েল সিটিজেনশিপ হলে খুব সহজেই দেশে যাওয়া-আসা করতে পারবো। কিন্তু কোথায় কি! ১৩০ ডলার দিয়ে NVR(No Visa Required) সিল/স্টিকার লাগাতে হয়। কেবল ফি দিলেই হয় না; এই NVR নিতে দূতাবাস/কনস্যুলেটে কাউকে কাউকে কঠিন পরীক্ষা দিতে হয় (আবেদন করতে জন্মসনদ, পিতামাতার কাগজ, বিবাহের প্রমাণ ইত্যাদি)। কাগজপত্র না গুছালে ভোগান্তি অনিবার্য।

ভারত বেশ ক’বছর আগে কানাডাসহ বিভিন্ন দেশের জন্য e-Tourist Visa চালু করেছে। সম্ভবতঃ ১-বছরের ভিসা ৪০ ডলার; ৫-বছরের ভিসা ৮০ ডলার। ৫ বছরের জন্য মাল্টিপল ভিসা করে রাখলাম যাতে যখন খুশি যেতে পারি। এ ভিসায় সমস্যা হলো যেতে হবে প্লেনে করে। ভিআইপি বলে কথা! নির্দিষ্ট দিনে যথারীতি কলকাতার উদ্দেশে উড়াল দিলাম। বিমানবন্দরে পা রাখতেই যা তা ব্যবহার শুরু হলো। অফিসাররা নিম্নবর্ণের(!) বাঙালিদের ভাষা বাংলায় কথা বলেন না; আবার ফিরিঙ্গিদের ভাষা ইংরেজিও বলতে চান না। তারা হিন্দিতে জিজ্ঞাসাবাদ করতে লাগলেন। অন্যান্য বাংলাভাষী যাত্রীদের সাথে যা করা হয়—আমিও রেহাই পেলাম না। কানাডিয়ান পাসপোর্ট তো কি হয়েছে? যাই হোক, সে গল্প আর নাই বললাম।

গত বছর ইন্দোনেশিয়ার বালি বিমানবন্দরে গিয়ে একটি ধাক্কা খেলাম। ইমিগ্রেশন কাউন্টারে নীল রঙের পাসপোর্টটি অফিসারের হাতে দিলাম। তিনি উল্টেপাল্টে দেখে বললেন, “ভিসার ফরম্যালিটি শেষ করে আসুন”। আমিতো অবাক! জিজ্ঞেস করলাম—কানাডিয়ানদের কি ভিসা লাগে? কাচের ওপাশ থেকে তিনি আঙুল তুলে দেখালেন— VOA (Visa on Arrival) কাউন্টার। ইন্দোনেশিয়ার VOA ফি ৫ লক্ষ রুপিয়া (৪২ ডলার)। এর সাথে যুক্ত হয় আলাদা ট্যুরিস্ট লেভি ১.৫ লক্ষ রুপিয়া (১৩ ডলার)।

এবার শুনুন মিশরের গল্প। লজ্জায় বিষয়টি নিয়ে কারো সাথে এতোদিন শেয়ার করিনি। গত বছরের কথা। মিশর যাওয়ার সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন। হোটেল, ট্রান্সপোর্ট সব বন্দোবস্ত আগেভাগে করে রেখেছি। টিকেট কেটে নির্দিষ্ট দিনে কায়রো বিমানবন্দরে পৌঁছালাম। ইমিগ্রেশন কাউন্টারে অফিসার বললেন— আপনার তো ভিসা নেই। বললাম অন-অ্যারাইভেল দিয়ে দিন। তিনি বললেন—‘অ্যাডভান্সড ভিসা’ লাগবে”। অন-অ্যারাইভাল ভিসা বন্ধ। তারপর সারারাত এয়ারপোর্টের ডিটেনশন সেন্টারে—দমবন্ধ, ক্লান্তিকর, অন্তহীন এক রাত। পরদিন নতুন টিকিট কেটে এথেন্সে উড়ে গিয়ে তবেই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম। ভালো একটা শিক্ষা হলো মিশর থেকে।

আজকাল যুক্তরাষ্ট্রও কানাডিয়ানদের জন্য ধাপে ধাপে নতুন নিয়ম দিচ্ছে বলে শুনছি। এখন নাকি ৩০ দিনের বেশি থাকলে রেজিস্ট্রেশন করতে হবে। নীল পাসপোর্ট আছে বলে বিশ্বজুড়ে বিশেষ সুবিধা/বিশেষ খাতির—এমনটা আর নেই। তাই বেরোবার আগে প্রতিটি দেশের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে নতুন আপডেট দেখে নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।


Back to top button
🌐 Read in Your Language