সম্পাদকের পাতা

নিরবতার চাদরে মোড়ানো মরিয়ম

নজরুল মিন্টো

কানাডার টরন্টো শহরের দক্ষিণ-পূর্ব কোণে অবস্থিত এক প্রান্তিক আবাসিক এলাকা স্কারবোরো। এখানে উচ্চভবনগুলোর ছায়ায় লুকিয়ে থাকে দক্ষিণ এশীয় অভিবাসীদের স্বপ্ন, যাদের কেউ কেউ এসেছেন জীবনের নতুন মানে খুঁজতে, কেউ কেউ কেবল বাঁচার জন্য। বিকেলে লেক অন্টারিওতে সূর্য ঢলে পড়লে, বহুতলের বারান্দা থেকে দেখা যায় একটি ক্লান্ত প্রহর।

স্কারবোরো শুধু ইট-কাঠের শহর নয়—এ যেন এক ভাঙা গানের সুর, যেখানে রান্নাঘরের ধোঁয়া আর পেছনের গলির শিশুর কান্না মিলে যায় অভিবাসী জীবনের এক কঠিন বাস্তবতায়। এখানেই বাস করতেন এক তরুণী যার জীবনগাথা আজ পুরো কানাডার বিবেককে প্রশ্নবিদ্ধ করে।

মরিয়ম। ২৫ বছর বয়সি বাংলাদেশি তরুণী, যার জন্ম সিলেটের বালাগঞ্জে। ২০১২ সালে তিনি পরিবারের সঙ্গে কানাডায় আসেন। তার বাবা ছিলেন রেস্টুরেন্ট কর্মী, মা গৃহিণী। তিনি ESL কোর্স সম্পন্ন করে জর্জ ব্রাউন কলেজে হেলথ কেয়ার এইড প্রোগ্রামে ভর্তি হন।�

২০১৭ সালে পারিবারিকভাবে মরিয়মের বিয়ে হয় মুহাম্মদ রফিকুল ইসলামের সঙ্গে। স্বামীর পরিবার বাংলাদেশ থেকে কানাডায় এসেছিল ২০১৪ সালে। বিয়েতে মরিয়মের পরিবার ১৫ হাজার কানাডিয়ান ডলার নগদ ও সোনার গহনা দিয়েছিলেন।�রফিকুল তখন স্কারবোরোর একটি প্যাকেজিং ফ্যাক্টরিতে কর্মরত। শ্বশুর ছিলেন একটি ছোট দোকানের সহকারী। শুরু থেকেই মরিয়ম বাধা পড়েন স্বামীর আধিপত্যে, শ্বশুরবাড়ির রক্ষণশীলতার শেকলে।

মরিয়মের উপর আরোপিত হয় অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ—ব্যাংক কার্ড শ্বশুরের কাছে। সোশ্যাল মিডিয়াতে পোস্ট দেওয়াও ছিল নিষিদ্ধ। তার পরিচয় যেন শুধু একজন স্ত্রীর, রান্নার অধিকারী একজন সেবাদাসীর।

মরিয়মের স্বপ্ন ছিল নার্স হওয়ার। ২০১৮ সালে মরিয়ম চুপিচুপি নার্সিং প্রিপারেটরি প্রোগ্রামে আবেদন করেন। এ খবর জানার পরই শুরু হয় তার উপর নির্যাতন। মানসিক যন্ত্রণার পাশাপাশি শারীরিক হেনস্তাও শুরু হয়। একবার ফেসবুকে নারী স্বাধীনতা নিয়ে একটি উদ্ধৃতি শেয়ার করায় তাকে ঘরে তালাবদ্ধ করে রাখা হয়।

২০১৯ সালে মরিয়ম সেন্ট মাইকেলস হসপিটালে ভলান্টিয়ার শুরু করলে শ্বশুরবাড়ি আপত্তি তোলে। ২০২০ সালের ১ জুন একটি নার্সিং কলেজে ভর্তি নিশ্চিত করেন। কিন্তু এই সাহসই তার শেষ সাহস হয়।

৫ জুন তার স্বামী প্রথমবারের মতো তাকে আক্রমণ করে। ১০ জুন, মরিয়ম স্থানীয় উইমেন্স শেল্টারে ফোন করেন, কিন্তু পর্যাপ্ত জায়গা না থাকায় তাকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়।

১২ জুন ২০২০, রাত ১০টা ১৫। স্বামী মুহাম্মদ রফিকুল ইসলাম মরিয়মকে ঘুমের ওষুধ মেশানো চা খাওয়ান। যখন তিনি অচেতন, তখন শ্বশুর ও স্বামী মিলে বালিশ চাপা দিয়ে তাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেন।

প্রতিবেশী লিন্ডা ম্যাকডোনাল্ড হঠাৎ এক করুণ চিৎকার শুনেছিলেন— তারপর যেন হঠাৎ পৃথিবী নীরব। সন্দেহ জাগতেই তিনি ফোন করেন টরন্টো পুলিশ সার্ভিসে। মাত্র ছয় মিনিটের মাথায় পুলিশ এসে দরজা ভেঙে ঢোকে অ্যাপার্টমেন্টে—আর সেখানেই পড়ে ছিল মরিয়মের নিথর দেহ—মৃত্যুর পরশে শান্ত, নীরবতার চাদরে মুড়ে রাখা এক বিস্মৃত স্বপ্নের মতো।

সেই মুহূর্তেই পেছনের দরজা দিয়ে পালানোর চেষ্টা করেন শ্বশুর আব্দুল মালিক—কিন্তু পুলিশ তাকে ধরে ফেলে। আর ঠিক সেই সময় বিল্ডিংয়ের পার্কিং লটে গাড়ি স্টার্ট করে পালাতে চাচ্ছিলেন রফিকুল—তাকেও আটক করা হয় ঘটনাস্থলেই।

পুলিশ মরিয়মকে সঙ্গে সঙ্গে অ্যাম্বুলেন্সে করে হাসপাতালে নিয়ে যায়। কিন্তু কর্তব্যরত চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন—ততক্ষণে জীবনের আলো নিভে গিয়েছিল।

ফরেনসিক রিপোর্টে দেখা যায়—মরিয়মের মুখে ফেনা, গলায় আঙুলের চিহ্ন। তার নখের নিচে পাওয়া যায় স্বামীর ত্বকের কোষ—একটি নীরব অথচ দৃঢ় প্রমাণ যে, মৃত্যুর আগে তিনি হাল ছাড়েননি, লড়েছিলেন প্রাণপণে। পরীক্ষায় আরও ধরা পড়ে—তার লিভারে ছিল উচ্চমাত্রার বেনজোডিয়াজেপাইন, যা তাকে নিস্তেজ করে তুলেছিল হত্যার আগে।

১৭ জুন ২০২০, টরন্টো। স্কারবোরোর সেই নৃশংস হত্যাকাণ্ড শুধু একটি মামলা নয়, যেন কানাডার বিচার ব্যবস্থার বিবেককে দাঁড় করিয়ে দেয় এক কঠিন আয়নায়।

এই ঐতিহাসিক মামলার রায়ে বিচারক মাইকেল ডাউড বলেন: “এটি শুধু একটি হত্যা নয়, বরং একজন নারীর স্বপ্ন ও আত্মপরিচয়কে নির্মমভাবে পিষে ফেলার চেষ্টা। অভিযুক্তরা তাদের বিকৃত সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গিকে ‘সংস্কৃতি’ নামে আড়াল করে বর্বরতা চালিয়েছে। কানাডা এই ধরনের মধ্যযুগীয় মানসিকতার কোনো স্থান রাখে না।” এ মন্তব্যের পর রায়ে স্বামী ও শ্বশুর উভয়কে আজীবন কারাদণ্ড প্রদান করা হয়।

বর্তমানে স্বামী রফিকুল ইসলাম (৩২) মিলহ্যাভেন ম্যাক্সিমাম সিকিউরিটি জেলে, আর শ্বশুর আব্দুল মালিক (৬০) কোলিন্স বে ইনস্টিটিউশনে কারাদণ্ড ভোগ করছেন।

মরিয়মের সম্মানে স্কারবোরো সিভিক সেন্টারের একটি বেঞ্চে ফলক স্থাপন করা হয়েছে—‘Mariyam Begum: A Silent Soldier Who Fought for Freedom.’

আজ মরিয়ম নেই। কিন্তু তার দমবন্ধ করা স্বপ্ন যেন এখনো এক অদৃশ্য ধোঁয়ার মতো শহরের বাতাসে ভেসে বেড়ায়—নিরব, কিন্তু প্রশ্নবিদ্ধ; অতীতের ছায়া হয়ে ভবিষ্যতের দ্বারে সাবধানবাণী হিসেবে কড়া নাড়ে।

দ্রষ্টব্য (Footnote):
আইনি সীমাবদ্ধতা ও নৈতিক কারণে এ প্রতিবেদনের সকল নাম ও সংযুক্ত ছবি কল্পিত।


Back to top button
🌐 Read in Your Language