সম্পাদকের পাতা

ইমিগ্রেশন প্রতারণা: মাস্টারমাইন্ড অপারেশন-এর আধুনিক গাথা

নজরুল মিন্টো

বিএসবি গ্লোবাল নেটওয়ার্ক এর চেয়ারম্যান লায়ন এমকে খায়রুল বাসার

প্রযুক্তি, প্রতারণা আর স্বপ্নবাজি। এটি ছিল আধুনিক ইমিগ্রেশন ফ্রডের এক চূড়ান্ত রূপ, যেখানে প্রযুক্তির ব্যবহারে, দুর্বল নীতির ফাঁক-ফোকরে, আর মানুষের স্বপ্নের ওপর ভর করে গড়ে উঠেছিল একটি অন্ধকার সাম্রাজ্য। ২০২১ সালে শুরু হওয়া এবং ২০২৩ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত চলা ‘মাস্টারমাইন্ড অপারেশন’ নামে পরিচিত এই কেলেঙ্কারিটি পরিচালনা করেছিল কানাডার টরন্টোভিত্তিক একটি বাংলাদেশি চক্র। উদ্দেশ্য—ভুয়া নিয়োগপত্র, জাল আর্থিক দলিল, এবং প্রতারণামূলক উপায়ে শতাধিক বাংলাদেশিকে স্থায়ী বসবাসের (PR) সুযোগ করে দেওয়া।

এই ফ্রড শুধু কয়েকজন দালালের স্বার্থসিদ্ধির গল্প নয়, বরং এটি ছিল কানাডার অভিবাসন ব্যবস্থাকে কাঁপিয়ে দেওয়া এক কৌশলী, সংগঠিত ও বহুমাত্রিক অপরাধের গল্প। যেখানে স্টুডেন্ট ভিসার আড়ালে আসা তরুণেরা রেস্টুরেন্টের ডিশওয়াশার কিংবা কনস্ট্রাকশন সাইটের শ্রমিকে পরিণত হয়েছে, সেখানে ভুয়া স্পাউস ভিসার মাধ্যমে আসা বহু নারী পড়েছে এক অনির্বচনীয় দুর্দশায়।

এই প্রতারণার প্রধান চালিকাশক্তি ছিল বাংলাদেশি ইমিগ্রেশন কনসালট্যান্টদের একটি চক্র, যারা টরন্টো থেকে ঢাকার মিরপুর, বনানী, সিলেটের উপশহর কিংবা চট্টগ্রামের জিইসি মোড় পর্যন্ত ছড়িয়ে ছিল। প্রতিটি এলাকায় গজিয়ে উঠেছিল একের পর এক আড়ম্বরপূর্ণ অফিস। এসি-চালিত রুম, মার্বেল মেঝে, দেওয়ালে কানাডার মনোরম দৃশ্য—সব মিলিয়ে যেন এক চলমান স্বপ্নের স্টুডিও।তাদের মূল কৌশল ছিল মানুষকে কানাডায় স্থায়ী বসবাসের লোভ দেখানো, PR-এর নাম করে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়া।

ফেসবুক লাইভে এজেন্টরা বলত, “কানাডার ডাইরেক্ট PR এখন আপনার হাতের মুঠোয়!” ইউটিউব চ্যানেল ও ফেসবুক পেইজে সাজানো ‘সাফল্যের গল্প’ আর ‘ধন্যবাদ জানানো ক্লায়েন্ট’-এর ভিডিওতে ভরে উঠত টাইমলাইন। লাইভে দেখা যেত, কেউ টরন্টোর রাস্তা ধরে হেঁটে বলছে—‘আপনাদের কারণে আজ আমি কানাডায়।’

লোভনীয় তথ্য দিয়ে সাজানো পোষ্টার

তারা বলত, “১০ দিনের মধ্যে অফার লেটার, ২ মাসে মেডিকেল, ৪ মাসে PR।” এসব লোভনীয় প্রতিশ্রুতি বিশ্বাস করে অনেক পরিবার তাদের শেষ সম্বল বিক্রি করে ফেলে। কেউ গয়না বিক্রি করেছে, কেউ বসতভিটা বন্ধক রেখেছে, কেউ ধারকর্জ করে ২০-২৫ লাখ টাকা তুলে দিয়েছে এই প্রতারকদের হাতে। কিন্তু বাস্তবে কিছুই হয়নি।

এই চক্রটি ২৮০টি ভুয়া নিয়োগপত্র তৈরি করেছিল বিভিন্ন কানাডিয়ান কোম্পানির নামে। কিন্তু অধিকাংশ কোম্পানিই ছিল অস্তিত্বহীন কিংবা ফেক ওয়েবসাইট-নির্ভর। টরন্টোতে বসেই তারা ফেক অফার লেটার তৈরি করত—কম্পিউটারে তৈরি একই MS Word টেমপ্লেট, একই ফন্ট (Calibri), একই গ্রামার ভুল (যেমন, “You will be responsible for perform duties.”)।

এই চিঠিগুলো বাংলাদেশি ক্লায়েন্টদের দেওয়া হতো, যারা সেগুলো নিয়ে এক্সপ্রেস এন্ট্রি, কানাডিয়ান এক্সপেরিয়েন্স ক্লাস বা স্টুডেন্ট ভিসার আবেদনে যুক্ত করত। PR-এর জন্য প্রয়োজনীয় পয়েন্ট বাড়াতে এগুলো ব্যবহার হতো।

কানাডায় স্থায়ী বসবাসের লোভ দেখিয়ে পোষ্টার

চক্রটি PR অ্যাপ্লিকেশনের প্রমাণ হিসেবে প্রত্যেক ক্লায়েন্টের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে $১৫,০০০–$২০,০০০ কানাডিয়ান ডলার জমা রাখত। এই টাকা হাওয়ালা মাধ্যমে আবার ফিরিয়ে নেওয়া হতো PR অ্যাপ্রুভালের পর। বাংলাদেশের এক্সচেঞ্জ হাউস, দুবাইয়ের “Golden Sands Exchange,” আর কানাডার কিছু স্যাম্পল অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে এই মানি সাইকেল চলত।

২০২২ সালে কানাডার ইমিগ্রেশন বিভাগ (IRCC) তাদের অ্যান্টি-ফ্রড ইউনিট দিয়ে একটি গোপন তদন্ত শুরু করে। ফাইলের মেটাডেটা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ৮০টির বেশি অফার লেটার একই কম্পিউটার থেকে তৈরি হয়েছে। ফাইলের “Last Modified By”-তে লেখা ছিল—“H Ahmed”। এছাড়া, ৭০% আবেদনকারীর ইমেইল লগইন ছিল বাংলাদেশ থেকে, যদিও তারা দাবি করেছিল তারা কানাডায় বসবাসরত।

ট্যাক্স রেকর্ড খতিয়ে দেখা হলে বোঝা যায়, যেসব কোম্পানির নামে অফার লেটার, তাদের T4 স্লিপ (ইনকাম রিপোর্ট) নেই। ৭০% কোম্পানিই কর ফাঁকি দিয়ে চলছিল বা বাস্তবে অস্তিত্বহীন ছিল। কিছু জাল কোম্পানির নাম ছিল—”Maple Leaf Foods Inc.” বা “North River Logistics Ltd.”—যাদের কোনো রেজিস্ট্রেশনই নেই।

R v. Islam মামলার রায়ে উঠে আসে ভয়াবহ এক চিত্র। প্রধান অভিযুক্ত শফিকুল ইসলামের ফোন থেকে উদ্ধার হয় শতাধিক জাল নিয়োগপত্র, ভুয়া পে-স্লিপ, এবং ক্লায়েন্টদের সঙ্গে প্রতারণামূলক WhatsApp চ্যাটের স্ক্রিনশট। আদালত প্রমাণ পেয়ে তাকে সংঘবদ্ধ ইমিগ্রেশন প্রতারণার দায়ে দোষী সাব্যস্ত করে—সাজা হয় পাঁচ বছরের কারাদণ্ড এবং $১০০,০০০ কানাডিয়ান ডলার জরিমানা।

বিএসবি গ্লোবাল নেটওয়ার্কের চেয়ারম্যান খায়রুল বাশারকে গত সোমবার (১৪ জুলাই ২০২৫) গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

অন্যদিকে, R v. Ahmed (2023) মামলায় অভিযুক্ত হোসাইন আহমেদ নিজ নামে ২৮টি ভুয়া কোম্পানি রেজিস্টার করে ট্যাক্স ফ্রডের মাধ্যমে $২.৩ মিলিয়ন কানাডিয়ান ডলার হাতিয়ে নেয়। তদন্তে জানা যায়, এই কোম্পানিগুলোর কোনো প্রকৃত কার্যক্রম ছিল না—সবই কাগুজে প্রতিষ্ঠান। আদালতের রায়ে তাকে সাত বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয় এবং নির্দেশ দেওয়া হয়—তাঁর মাধ্যমে PR আবেদনে জড়িত সব ক্লায়েন্টের ডিপোর্টেশনের খরচও তিনিই বহন করবেন।

এই কেলেঙ্কারির সবচেয়ে হৃদয়বিদারক দিক ছিল—১৪৩ জন আবেদনকারীর PR বাতিল করেছে কানাডার ইমিগ্রেশন বিভাগ, এবং তাঁদের অনেককেই ডিপোর্ট করে দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে। শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতি নয়, এ ছিল এক একটি স্বপ্নের নির্মম পতন।

এই স্ক্যাম শুধুমাত্র কানাডার নয়, বিশ্বব্যাপী ইমিগ্রেশন ব্যবস্থাকে নাড়া দিয়েছে। অস্ট্রেলিয়ায় ফেক ট্রেড সার্টিফিকেট, যুক্তরাজ্যে IELTS প্রোক্সি স্ক্যান্ডাল, আমেরিকায় H1B ভিসার ফেক কোম্পানি—সবই এখন ফ্রডের অংশ।

তবে কানাডা এই ফ্রড থেকে শিক্ষা নিয়ে নিয়োগপত্র যাচাইয়ের জন্য Employer Portal চালু করেছে, যেখানে কোম্পানিকে সরাসরি IRCC-তে অফার আপলোড করতে হয়। বায়োমেট্রিক শেয়ারিং চালু হয়েছে Five Eyes দেশের মধ্যে।

এদিকে একই সময়ে আলোচনায় উঠে এসেছে আরও একটি চাঞ্চল্যকর প্রতারণার ঘটনা—”বিএসবি গ্লোবাল নেটওয়ার্ক” নামে একটি নামী শিক্ষা পরামর্শ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে। এই প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে অভিযোগ, তারা উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন দেখিয়ে দেশের নানা প্রান্ত থেকে ছাত্রছাত্রীদের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে, কিন্তু বাস্তবে অধিকাংশ শিক্ষার্থীকে বিদেশে পাঠানোর কোনো ব্যবস্থা করা হয়নি।

এই প্রতারণা চক্রের নেতৃত্বে ছিলেন বিএসবি গ্লোবাল নেটওয়ার্কের চেয়ারম্যান খায়রুল বাশার। তাঁকে সোমবার (১৪ জুলাই ২০২৫) রাজধানীর ধানমন্ডি এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। তার বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিং আইনে মামলা করা হয়।

মামলার তথ্য অনুযায়ী, বাশার, তাঁর স্ত্রী খন্দকার সেলিমা রওশন এবং ছেলে আরশ ইবনে বাশার মিলে ২০১৮ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে একটি প্রতারণা চক্র পরিচালনা করেন। তাঁরা বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ, স্কলারশিপ ও স্টুডেন্ট ভিসা প্রক্রিয়াকরণের নামে ১৪১ শিক্ষার্থীর কাছ থেকে ১৮ কোটি ২৯ লাখ ৫৭ হাজার ৬৮০ টাকা হাতিয়ে নেন।

এই কেলেঙ্কারির অন্যতম ভুক্তভোগী হলেন আইনজীবী দম্পতি জাহিদুল হক খান ও রওনক জাহান। তাঁরা বিএসবি গ্লোবাল নেটওয়ার্কের প্রতিশ্রুতিতে বিশ্বাস করে ১৭ লাখ করে মোট ৩৪ লাখ টাকা দেন। প্রতিষ্ঠানটি তাঁদের ভিসার ব্যবস্থা করতে ব্যর্থ হয় এবং টাকাও ফেরত দেয়নি।
এ ঘটনায় ২০২৪ সালের ৫ মে গুলশান থানায় খায়রুল বাশারের বিরুদ্ধে জাহিদুল-রওনক দম্পতিসহ আরও ১৮ জনের পক্ষে মামলা করা হয়।

শুধু এই একটি নয়—শরীয়তপুরের বাসিন্দা আমির হোসেন জমি বিক্রি করে বিএসবি গ্লোবাল নেটওয়ার্ককে ১৩ লাখ টাকা দেন। তাঁকে বলা হয়েছিল, তিন মাসের মধ্যে কানাডার ভিসা হবে, কিন্তু হয়নি। পরে তিনি এবং আরও ২২ জন ২৮ ডিসেম্বর গুলশান থানায় আরেকটি মামলা করেন, যাতে ১ কোটি ৮০ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়।

জান্নাতুল ফেরদৌস নামের এক শিক্ষার্থীও বিএসবি গ্লোবালের প্রতারণার শিকার হন। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে তিনি গুলশান থানায় মামলা করেন, যাতে তাঁর কাছ থেকে ১৬ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ করা হয়। এই মামলায় প্রতিষ্ঠানটির মহাব্যবস্থাপক আবু জাহিদ গ্রেপ্তার হন ১১ ডিসেম্বর এবং ২০২৪ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি জামিনে মুক্তি পান।

সিআইডির অনুসন্ধানে জানা যায়, প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান মো. খায়রুল বাসার ও তার সহযোগীরা এক হাজারের বেশি শিক্ষার্থীর ২০০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন। তবে এই সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। দেশের বিভিন্ন থানায় এবং ঢাকার আদালতে তাদের বিরুদ্ধে এ পর্যন্ত ১০০টিরও বেশি মামলা হয়েছে।

এই বিস্তৃত প্রতারণার ঘটনাটি ইমিগ্রেশন ও উচ্চশিক্ষা বিষয়ক প্রতারকদের নতুন মুখোশ উন্মোচন করেছে। সুনামি সদৃশ গতিতে দেশে-বিদেশে ছড়িয়ে পড়া এই ফ্রড নেটওয়ার্ক কেবল অর্থনৈতিক ক্ষতির কারণ নয়, বরং একটি জাতির শিক্ষিত তরুণ প্রজন্মের স্বপ্নভঙ্গের ভয়ানক উদাহরণ হয়ে রইল।

এই প্রতিবেদন একটি সতর্কবার্তা—ইমিগ্রেশন ও উচ্চশিক্ষার নামে যারা স্বপ্ন বিক্রি করে, তাদের চেনা এবং প্রতিরোধ করা এখন সময়ের দাবি।

কানাডার পথে যাত্রা যেন হয় স্বপ্নপূরণের, স্বপ্নভঙ্গের নয়। যে দেশে পাড়ি জমাতে গিয়ে কেউ যেন ঘর বিক্রি করে পথে না নামে, প্রতিশ্রুতির বদলে প্রতারণা না পায়—এই দায় সমাজ, রাষ্ট্র এবং প্রতিটি সচেতন নাগরিকের।

সর্বশেষ: সিআইডি’র অনুসন্ধানে জানা যায়, বিএসবি গ্লোবালের মালিক খায়রুল বাশার বাহারের ১ হাজার ১০৬ শতাংশ জমি থাকার তথ্য মিলেছে। এছাড়া রাজধানীর গুলশান, বারিধারাসহ বিভিন্ন এলাকায় বিএসবি গ্লোবালসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নামে অসংখ্য ফ্ল্যাট, ভবন ও জমির তথ্য পেয়েছে সিআইডি।


Back to top button
🌐 Read in Your Language