সম্পাদকের পাতা

কানাডায় আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য নতুন নিয়মে কী থাকছে

নজরুল মিন্টো

কানাডায় আশ্রয় চাওয়া একজন মানুষের জন্য আবেদন জমা দেওয়ার পরের সময়টা কাটে নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তায়। কখন সাক্ষাৎকার হবে, কী নথি দিতে হবে, অপেক্ষার সময়ে কাজ করা যাবে কি না, এসব প্রশ্নের উত্তরেই আটকে থাকে তাঁর জীবন গুছিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি। আবেদন থেকে শুনানি পর্যন্ত বিভিন্ন ধাপের জট কমাতে এবার পদ্ধতি বদলেছে কানাডা। নতুন ব্যবস্থায় আবেদনকারীর করণীয় ও সময়সীমা আরও স্পষ্ট করা হয়েছে, বিশেষ সহায়তার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে অপ্রাপ্তবয়স্ক এবং আবেদনপ্রক্রিয়া পুরোপুরি বুঝতে অক্ষম আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য।

৩ নভেম্বর থেকে কার্যকর হওয়া সংশোধিত বিধিমালার ঘোষণা দিয়েছেন অভিবাসন, শরণার্থী ও নাগরিকত্ববিষয়ক মন্ত্রী লেনা মেটলেজ ডায়াব। সরকারের বক্তব্য, একই তথ্য বারবার চাওয়া ও অপ্রয়োজনীয় কাগজপত্রের বোঝা কমিয়ে আবেদনগুলো দ্রুত শুনানির উপযোগী করাই এসব পরিবর্তনের উদ্দেশ্য।

নতুন পদ্ধতিতে কানাডার ভেতর থেকে আশ্রয় চাইলে প্রথমে অভিবাসন বিভাগের অনলাইন পোর্টালে নিজের পরিচয়, প্রাথমিক তথ্য ও প্রয়োজনীয় নথি দিয়ে আবেদন করার ইচ্ছা জানাতে হবে। এরপর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে সরাসরি সাক্ষাতের জন্য ডাকা হবে। অভিবাসন কর্মকর্তার সামনে সেই সাক্ষাতেই আনুষ্ঠানিকভাবে আশ্রয়ের আবেদন করা হবে। কর্মকর্তা যাচাই করবেন, আবেদনটি স্বাধীন ইমিগ্রেশন অ্যান্ড রিফিউজি বোর্ডে শুনানির জন্য পাঠানোর যোগ্য কি না।

যোগ্য বিবেচিত হলে আবেদনকারীকে পূর্ণাঙ্গ আবেদন ও প্রয়োজনীয় নথি জমা দেওয়ার শেষ তারিখ জানিয়ে নোটিশ দেওয়া হবে। নোটিশ পাওয়ার পর এ জন্য সময় মিলবে ৬০ দিন। নথি সংগ্রহ বা আবেদন সম্পন্ন করতে আরও সময় প্রয়োজন হলে মূল সময়সীমা শেষ হওয়ার আগেই পোর্টালের মাধ্যমে একবার অতিরিক্ত ৩০ দিন চাওয়া যাবে। এই সময়সীমা আবেদন সম্পন্ন করার জন্য; এর মধ্যে আশ্রয়ের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়ার বাধ্যবাধকতা নেই।

আবেদনকারীদের জীবিকার প্রশ্নেও গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা রয়েছে। পূর্ণাঙ্গ আশ্রয় আবেদনের মধ্যেই যোগ্য ব্যক্তিরা কাজের অনুমতি চাইতে পারবেন। এ জন্য আলাদা আবেদন বা ফি লাগবে না। তবে কাজের অনুমতি পেতে পূর্ণাঙ্গ আবেদন জমা দেওয়ার পাশাপাশি অভিবাসনসংক্রান্ত স্বাস্থ্য পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে। অপেক্ষার সময়ে বৈধভাবে কাজ করার প্রচলিত এই ব্যবস্থাকে নতুন বিধিমালায় স্থায়ী করা হয়েছে।

শিশু ও আবেদনপ্রক্রিয়া পুরোপুরি বুঝতে অক্ষম ব্যক্তিদের সহায়তা দেওয়ার বিষয়টিও স্পষ্ট করা হয়েছে। তাঁদের জন্য নির্ধারিত প্রতিনিধি নিয়োগের ব্যবস্থা থাকবে। কখন প্রতিনিধি নিয়োগ করতে হবে, তাঁর দায়িত্ব কী এবং দায়িত্বের মেয়াদ কখন শেষ হবে, তা বিধিমালায় নির্ধারণ করা হয়েছে। বোর্ডে আবেদন পৌঁছানোর আগের ধাপেও এই সহায়তা পাওয়া যাবে।

প্রশাসনিক পরিবর্তনের একটি বড় অংশ হলো শুনানির প্রস্তুতি। নিরাপত্তা, অপরাধের ইতিহাস, কানাডায় প্রবেশ ও অবস্থানের আইনগত গ্রহণযোগ্যতা এবং আবেদনটি বোর্ডে পাঠানোর আগেই এসব গুরুত্বপূর্ণ যাচাই সম্পন্ন করার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এসব সরকারি পর্যালোচনার জন্য সময়সীমাও নির্ধারণ করা হয়েছে। সরকারের প্রত্যাশা, প্রয়োজনীয় যাচাই অসম্পূর্ণ থাকার কারণে শুনানি পিছিয়ে যাওয়া বা বাতিল হওয়ার ঘটনা এতে কমবে।

তবে আবেদনকারীকেও নির্ধারিত সময় মেনে প্রতিটি ধাপ সম্পন্ন করতে হবে। যোগ্য বিবেচিত হওয়ার পর পূর্ণাঙ্গ আবেদন জমা না দিলে, চাওয়া অতিরিক্ত তথ্য সময়মতো না পাঠালে কিংবা নির্ধারিত সাক্ষাতে উপস্থিত না হলে আবেদন পরিত্যক্ত হয়েছে কি না, তা নির্ধারণের জন্য বোর্ডে পাঠানো হতে পারে। বোর্ড সিদ্ধান্ত দেওয়ার আগে প্রয়োজনীয় নথি জমা দিয়ে বা নির্ধারিত করণীয় সম্পন্ন করে আবেদন এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

যাঁরা ৩ নভেম্বরের আগে আশ্রয়ের আবেদন জমা দিয়েছেন, তাঁদের নতুন করে আবেদন করতে হবে না। আগের নিয়মেই তাঁদের আবেদন প্রক্রিয়া চলবে। তবে যাঁরা অনলাইনে ফরম পূরণ শুরু করেছিলেন কিন্তু জমা দেননি, তাঁদের জমা দেওয়ার আগে নতুন কিছু প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে এবং আগে দেওয়া তথ্য ঠিক আছে কি না, দেখে নিতে হবে।

মন্ত্রী লেনা মেটলেজ ডায়াবের বক্তব্য, সুরক্ষার প্রয়োজন রয়েছে এমন মানুষকে সহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি আবেদনব্যবস্থাকে ন্যায্য, সুষ্ঠু ও কার্যকর রাখা জরুরি। নতুন নিয়মে আবেদনকারীরা কী করবেন এবং কখন করবেন, সে বিষয়ে আরও স্পষ্ট ধারণা পাবেন বলে আশা করছে সরকার। আবেদন যাচাই ও শুনানির অপেক্ষা বাস্তবে কতটা কমবে, তার ওপরই নির্ভর করবে এই পরিবর্তনের সাফল্য।

তথ্যসূত্র: Immigration, Refugees and Citizenship Canada (IRCC), Government of Canada

Back to top button
🌐 Read in Your Language