ইসরায়েলের নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারাল নেতানিয়াহুর জোট, সরকার গঠন নিয়ে অনিশ্চয়তা

তেল আবিব,২৯ অক্টোবর-ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোট সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়েছে। তবে বিরোধী জোটও এককভাবে সরকার গঠনের মতো আসন পায়নি। ফলে নতুন সরকার গঠন না হওয়া পর্যন্ত নেতানিয়াহুই দেশটির অন্তর্বর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে পারেন।
বুধবার (২৮ অক্টোবর) অনুষ্ঠিত নির্বাচনের ভোট গণনা শেষে পাওয়া প্রাথমিক পূর্বাভাসে এমন চিত্র উঠে এসেছে। বৃহস্পতিবার পর্যন্ত প্রায় ৮৬ শতাংশ ভোট গণনার পর ইসরায়েলের প্রধান তিনটি সম্প্রচারমাধ্যম জানিয়েছে, ১২০ আসনের পার্লামেন্ট নেসেটে নেতানিয়াহুর জোট ৫৩টি আসন পেতে পারে। তবে কোনো কোনো প্রতিবেদনে ভোট গণনার হার ৯০ শতাংশ বলা হয়েছে।
নেতানিয়াহুর জোটে রয়েছে ডানপন্থী, কট্টর ডানপন্থী ও অতি রক্ষণশীল ইহুদি দলগুলো। অন্যদিকে তাঁর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ও সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট ৪৮টি আসন পেতে পারে। ফলে দুই জোটের কেউই সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ৬১টি আসন নিশ্চিত করতে পারেনি।
এ অবস্থায় সরকার গঠনের হিসাব-নিকাশে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে আরব ইসরায়েলিদের প্রতিনিধিত্বকারী দলগুলো। বুথফেরত জরিপের পূর্বাভাস অনুযায়ী, এসব দল সম্মিলিতভাবে ১৯টি আসন পেতে পারে। এমনটি হলে তা তাদের জন্য নজিরবিহীন সাফল্য হতে পারে।
তবে বিরোধী জোটকে সরকার গঠন করতে হলে আরব দলগুলোর সমর্থন প্রয়োজন হবে। ইসরায়েলের অনেক ইহুদি রাজনৈতিক নেতা এসব দলের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক জোট গঠনে আপত্তি জানিয়ে আসছেন। ফলে আইজেনকটের সামনে রাজনৈতিক সমঝোতা ও আসনসংখ্যা—দুই দিক থেকেই চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
বিরোধী জোটের প্রত্যাশা পূরণ হয়নি
নেতানিয়াহুবিরোধী জোটে মধ্যবাম থেকে শুরু করে কট্টর ডানপন্থী বিভিন্ন দলের সমর্থকেরা রয়েছেন। নির্বাচনের আগে জনমত জরিপে দুই পক্ষের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস পাওয়া গিয়েছিল। কিন্তু ভোটের প্রাথমিক পূর্বাভাসে আইজেনকটের জোট প্রত্যাশিত আসন পায়নি।
আইজেনকট স্বীকার করেছেন, নেতানিয়াহু অন্তর্বর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তবে তিনি সতর্ক করে বলেছেন, নেতানিয়াহু নিজের রাজনৈতিক স্বার্থে দেশের নিরাপত্তার বিষয়টি ব্যবহার করতে পারেন।
নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর প্রধান ও সরকারি কর্মকর্তাদের উদ্দেশে আইজেনকট বলেন, নেতানিয়াহুর হাতে নতুন সরকার গঠনের জন্য জনগণের সুস্পষ্ট ম্যান্ডেট নেই। তাই সরকারি কর্মকর্তাদের যেকোনো চাপের মুখে দৃঢ় থাকার আহ্বান জানান তিনি।
নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোট সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় বিরোধী দলগুলো তাঁকে ক্ষমতা থেকে সরানোর সুযোগ খুঁজছে। তবে তাদের নিজেদের মধ্যে সরকার গঠনের মতো পর্যাপ্ত আসন নেই। আরব দলগুলোর সমর্থন ছাড়া এ উদ্যোগ সফল করা কঠিন।
ইসরায়েলের ইতিহাসে এর আগে নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরাতে একটি জোট ছোট একটি আরব দলের সমর্থন নিয়েছিল। কিন্তু এবার আইজেনকটের জোট প্রত্যাশার চেয়ে কম আসন পাওয়ায় জয়েন্ট লিস্টের মতো আরব দলগুলোর সমর্থন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ইসরায়েল প্রতিষ্ঠার পর থেকে দেশটির অধিকাংশ ইহুদি নেতা আরব দলগুলোর সঙ্গে আনুষ্ঠানিক জোট গঠন এড়িয়ে চলেছেন।
অন্তর্বর্তী সরকারের ক্ষমতা কতটা
নতুন সরকার গঠনের আলোচনা চলাকালে এবং প্রয়োজনে আগামী বছর নতুন নির্বাচন হওয়া পর্যন্ত নেতানিয়াহু অন্তর্বর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে পারেন। তবে অন্তর্বর্তী সরকার হলেও রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে তাঁর সরকারের হাতে গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতা থাকবে।
ইসরায়েল ডেমোক্রেসি ইনস্টিটিউটের গবেষক গাই লুরি বলেন, আনুষ্ঠানিকভাবে একটি অন্তর্বর্তী সরকার নিয়মিত সরকারের মতোই ক্ষমতা ভোগ করে। তবে কিছু ক্ষেত্রে তাদের সংযম বজায় রাখার বাধ্যবাধকতা থাকে। এ কারণে কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা তৈরি হতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাও অন্তর্বর্তী সরকারের থাকবে। অর্থাৎ নতুন সরকার গঠন নিয়ে রাজনৈতিক অচলাবস্থা তৈরি হলেও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে সরকার পুরোপুরি অক্ষম হয়ে পড়বে না।
ভোটার উপস্থিতিতে নতুন রেকর্ড
ইসরায়েলের এবারের নির্বাচনে ভোট পড়েছে ৭৭ দশমিক ৭ শতাংশ। দুই দশকের বেশি সময়ের মধ্যে এটি সর্বোচ্চ ভোটার উপস্থিতি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত ইসরায়েলিদের মধ্যেও ভোট দেওয়ার হার ছিল উল্লেখযোগ্য। দেশটির মোট জনসংখ্যার এক-পঞ্চমাংশের বেশি এই জনগোষ্ঠীর মানুষ। তাদের ভোট এবং প্রতিনিধিত্বকারী দলগুলোর আসনসংখ্যা সরকার গঠনের হিসাব-নিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বুথফেরত জরিপের ফল প্রকাশের পর জয়েন্ট লিস্টের সদর দপ্তরে সমর্থকদের উচ্ছ্বাস দেখা যায়। দলটির প্রার্থী ফাতেন গাত্তাস বলেন, তাঁরা দখলদারত্ব ও বর্ণবাদ প্রত্যাখ্যান করেন এবং ইসরায়েলেই থাকবেন।
অন্যদিকে নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টির সদর দপ্তরে তিনি সমর্থকদের উদ্দেশে বক্তব্য দেন। ভোট গণনা ও সরকার গঠনের আলোচনা চলতে থাকায় শেষ পর্যন্ত কোন পক্ষ সরকার গঠন করবে, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
ভোট গণনার চূড়ান্ত ফল এবং বিভিন্ন দলের মধ্যে সম্ভাব্য সমঝোতার ওপর নির্ভর করবে ইসরায়েলের পরবর্তী সরকার গঠনের প্রক্রিয়া। আপাতত সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলেও নেতানিয়াহুর অন্তর্বর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বে থাকার সম্ভাবনাই সামনে এসেছে।
এস এম/ ২৯ অক্টোবর ২০২৬







