ইউরোপ

লাগামহীন মূল্যস্ফীতিতে উত্তাল ফ্রান্সে ভয়াবহ তাণ্ডব, গ্রেফতার ১২০০, আহত ১৫০ পুলিশ

প্যারিস, ১৮ অক্টোবর – আকাশছোঁয়া মূল্যস্ফীতি আর জীবনযাত্রার অনিয়ন্ত্রিত ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে জ্বলছে ইউরোপের অন্যতম পরাশক্তি ফ্রান্স। গত শনিবার (১৭ অক্টোবর) দেশজুড়ে উসকে ওঠা গণবিক্ষোভ রূপ নিয়েছে অভূতপূর্ব সহিংসতা, ব্যাপক লুটপাট ও এক রক্তক্ষয়ী সংঘাতের। উত্তাল এই পরিস্থিতিকে ‘চরম মাত্রার সহিংসতা’ বলে আখ্যা দিয়েছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়েন লেকর্নু।

প্যারিস থেকে শুরু করে দেশের প্রধান প্রধান শহরগুলোতে ফুঁসে ওঠা জনতার সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনীর দিনভর সংঘর্ষে অন্তত ১৫০ জন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে কঠোর অবস্থানে গিয়ে অন্তত ১২০০ জন বিক্ষোভকারীকে গ্রেফতার করেছে ফরাসি পুলিশ।

রণক্ষেত্র প্যারিস: ‘বিধ্বস্ত পুরো সড়ক’

ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, দেশজুড়ে প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ মানুষ রাস্তায় নেমে আসেন (যদিও শ্রমিক সংগঠন সিজিটি-র দাবি এই সংখ্যা ৮ লাখ)। বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করলে পাল্টা ইটপাটকেল ও আতশবাজি ছুড়ে জবাব দেয় আন্দোলনকারীরা।

রাজধানী প্যারিসের চিত্র ছিল সবচেয়ে ভয়াবহ। প্যারিসের মেয়র এমানুয়েল গ্রেগোয়ার হতাশা প্রকাশ করে জানান, শহরটির পুরো সড়কই ভেঙেচুরে ‘বিধ্বস্ত’ করে দেওয়া হয়েছে। মাস্ক ও গ্লাভস পরা তরুণদের ছোট ছোট দল সিসিটিভি ক্যামেরার সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে বিলাসবহুল ব্র্যান্ডের শো-রুম, সুপারমার্কেট, ফার্মেসি ও চশমার দোকানে রীতিনীতিহীন লুটপাট চালায়। রাস্তায় পার্ক করে রাখা একাধিক গাড়িতে ধরিয়ে দেওয়া হয় আগুন।

দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর সাঁ-এতিয়েনে জনতা নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত গ্রেনেডের আঘাতে ১৭ বছর বয়সী এক কিশোরের ডান হাত উড়ে যাওয়ার মতো মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে।

ধ্বংসযজ্ঞের মুখে ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা

কেবল দোকানপাট বা যানবাহন নয়, আন্দোলনকারীদের ক্ষোভের শিকার হয়েছে বিভিন্ন সরকারি ও প্রশাসনিক স্থাপনাও:

লিমোজ: শহরটির ১৪০ বছরেরও বেশি পুরনো ঐতিহাসিক পৌর ভবনটি অগ্নিকাণ্ডে প্রায় সম্পূর্ণ ভস্মীভূত হয়ে গেছে।

মার্সেই ও লিল: দুটি বড় শহরের পৌরসভায় জোরপূর্বক প্রবেশ করে চালানো হয়েছে ব্যাপক ভাঙচুর।

বোর্দো ও লিয়ঁ: বোর্দো শহরে পুলিশের স্থাপনাবলি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে এবং লিয়ঁ শহরে একটি পর্যটন তথ্যকেন্দ্রে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।

‘বিপ্লব অথবা মৃত্যু’: নতুন এক বাস্তিল দখলের হুঁশিয়ারি

২০০৮ সালের আলোড়ন সৃষ্টিকারী ‘ইয়েলো ভেস্ট’ (হলুদ পোশাক) আন্দোলনের অনুসারীদের ডাকেই এই নতুন তরুণ বিক্ষোভের সূচনা। ফরাসি বিপ্লবের ঐতিহাসিক আবহে আন্দোলনকারীরা স্লোগান তোলেন— ‘এটাই বিপ্লব, আমরা বাস্তিল দখল করছি!’ এমনকি লা রশেল শহরে ‘বিপ্লব অথবা মৃত্যু’ লেখা ব্যানার নিয়ে মিছিলে অংশ নিতে দেখা যায় ক্ষুব্ধ জনতাকে।

শিক্ষার্থী সংগঠন ‘এলএসইউ’-এর প্রধান রিয়াদ রানি হুঙ্কার দিয়ে বলেছেন, “সরকার কাঁপছে, আর কাঁপাটাই স্বাভাবিক। ফরাসি জনগণ একবার ক্ষুব্ধ হলে সহজে থামে না।”

রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও ম্যাক্রোঁর হুঁশিয়ারি

ছয় মাস পরেই ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। এই উত্তাল পরিস্থিতিতে সামাজিক মাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) ক্ষোভ প্রকাশ করে প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, ভাঙচুর, সহিংসতা ও লুটপাটে যুক্ত প্রত্যেককে আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তি দেওয়া হবে।

অন্যদিকে নির্বাচনকে সামনে রেখে বিরোধী দলগুলো এই সহিংসতাকে পুঁজি করে রাজনীতিতে হাওয়া দেওয়ার চেষ্টা করছে। ডানপন্থি রাজনৈতিক দল ‘ন্যাশনাল র্যালি’-র প্রধান মারিন ল্য পেন সরাসরি কাঠগড়ায় তুলেছেন বামপন্থি নেতা জ্যঁ-লুক মেলঁশোঁকে। ল্য পেনের দাবি, উগ্র বামপন্থিরাই এই সহিংসতাকে উসকে দিচ্ছে এবং তিনি ক্ষমতায় এলে ফ্রান্সকে এই নৈরাজ্য থেকে রক্ষা করবেন।

মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতার কারণে বিশ্বজুড়ে যে জ্বালানি ও অর্থনৈতিক সঙ্কট তৈরি হয়েছে, তারই অভিঘাত এখন ফ্রান্সের প্রতিটি কোণায় কোণায় আছড়ে পড়ছে, যা দেশটির চলমান রাজনৈতিক ভবিষ্যতকে ঠেলে দিয়েছে চরম অনিশ্চয়তার মুখে।

এনএন/ ১৮ অক্টোবর ২০২৬

Back to top button
🌐 Read in Your Language