আজারবাইজানে স্কুলে হিজাব নিষিদ্ধের প্রতিবাদে বিক্ষোভ, তুরস্কের সঙ্গে টানাপোড়েন

বাকু,১৬ অক্টোবর-স্কুলে শিক্ষার্থীদের হিজাব পরা নিষিদ্ধ করার ঘটনাকে কেন্দ্র করে অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছে আজারবাইজান। সরকারের নতুন স্কুল ইউনিফর্ম বিধিমালার প্রতিবাদে রাজধানী বাকুসহ দেশটির দক্ষিণাঞ্চলের একাধিক জেলায় নজিরবিহীন বিক্ষোভ হয়েছে। হিজাব পরা ছাত্রীদের শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করতে বাধা দেওয়ার পর এই অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে। বিষয়টি এখন আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেও প্রভাব ফেলছে। এর ফলে দেশটির সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্র তুরস্কের সঙ্গে নতুন করে কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে।
সম্প্রতি আজারবাইজানের শিক্ষা মন্ত্রণালয় সরকারি স্কুলগুলোতে ধর্মীয় প্রতীকযুক্ত পোশাক পরা নিষিদ্ধ করে নতুন ইউনিফর্ম বিধিমালা কার্যকর করতে শুরু করে। এরপর নেভি ব্লু রঙের হিজাব পরা কয়েকজন শিক্ষার্থী স্কুলের গেটে কর্মকর্তাদের চ্যালেঞ্জ করছেন, এমন ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এ ঘটনার পর রাজধানী বাকুর আশপাশের বিভিন্ন এলাকা এবং ইরান সীমান্তবর্তী দক্ষিণের মাসাল্লি ও জলিলাবাদ জেলায় সাধারণ মানুষ ও অভিভাবকেরা রাস্তায় নেমে আসেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, রাজধানীর বাইরের একটি স্কুলের সামনে আন্দোলনকারীরা ‘হিজাব শিক্ষা গ্রহণে বাধা নয়’ লেখা ব্যানার নিয়ে অবস্থান করছেন।
স্বৈরাচারী শাসনের অধীনে থাকা তেল ও গ্যাসসমৃদ্ধ দেশ আজারবাইজানের জনসংখ্যা ১০.৫ মিলিয়ন। দেশটিতে যেকোনো ধরনের গণবিক্ষোভ অত্যন্ত বিরল। প্রেসিডেন্ট ইলহাম আলিয়েভ ২০০৩ সাল থেকে ক্ষমতায় রয়েছেন। বিরোধী মত দমনের জন্য তিনি বেশ পরিচিত।
হিজাব নিষিদ্ধের বিরুদ্ধে শুরু হওয়া এই বিক্ষোভ দমনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে। দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সামাজিক শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে ইতিমধ্যে অন্তত ৩৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ ছাড়া বিক্ষোভে অংশ নেওয়া কয়েকজন অভিভাবক ও অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টকে নিখোঁজ করা বা আটক করার অভিযোগ উঠেছে। আন্দোলন তীব্র হওয়ার পর থেকে দেশটিতে ভিপিএন ছাড়া ইনস্টাগ্রাম ও টিকটক ব্যবহারের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।
আজারবাইজান সাংবিধানিকভাবে একটি ধর্মনিরপেক্ষ দেশ। ধর্মীয় প্রভাব দূরে রাখতে দেশটির সরকার বেশ কঠোর অবস্থানে রয়েছে। অন্যদিকে, দেশটির ৬০ শতাংশের বেশি মানুষ শিয়া মুসলিম হলেও তাদের ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে প্রতিবেশী তুরস্কের অনেক মিল রয়েছে। আজারবাইজান দীর্ঘদিন ধরেই দক্ষিণের প্রতিবেশী ইরানের সম্ভাব্য ধর্মীয় ও রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে উদ্বিগ্ন। সম্প্রতি বিক্ষোভ চলাকালে সরকারের শতাধিক ওয়েবসাইটে বড় ধরনের সাইবার হামলার ঘটনা ঘটে। ইরানপন্থী একটি সাইবার গোষ্ঠী এই হামলার দায় স্বীকার করেছে। অন্যদিকে, আজারবাইজানের কর্মকর্তারা হিজাব নিষিদ্ধের পক্ষে যুক্তি দিয়ে বলছেন, শিশুরা নিজেদের পছন্দে হিজাব পরে না, বরং পরিবারের প্রভাবেই তা পরে। তাঁদের মতে, ধর্ম বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের থাকা উচিত।
আজারবাইজানের এই সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সবচেয়ে বড় চমক তৈরি হয়েছে। ভৌগোলিক ও কৌশলগত সম্পর্কের কারণে আজারবাইজান ও তুরস্ককে ‘এক জাতি, দুই রাষ্ট্র’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের সরকার হিজাব নিষিদ্ধের এই সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করেছে। এরদোয়ানের প্রধান উপদেষ্টা ওকতাই সারাল আজারবাইজানের সিদ্ধান্তকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে উল্লেখ করেছেন। একই সঙ্গে তিনি ভুল সিদ্ধান্তটি অবিলম্বে প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়েছেন।
ওকতাই সারাল স্পষ্টভাবে বলেছেন, হিজাব শিক্ষার পথে কোনো বাধা নয়, বরং এটি বিশ্বাসের অংশ। এই ইস্যুতে তুরস্কের ক্ষমতাসীন একে পার্টির একাধিক সংসদ সদস্য আজারবাইজান সরকারের কঠোর সমালোচনা শুরু করেছেন। ফলে দুই ঐতিহাসিক মিত্রের সম্পর্কেও এখন বেশ টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে।
এস এম/ ১৬ অক্টোবর ২০২৬







