সম্পাদকের পাতা

টরন্টোর মেয়র নির্বাচনে অলিভিয়া-ব্র্যাডফোর্ডের ব্যবধান এখন মাত্র ২.৯ পয়েন্ট

নজরুল মিন্টো

টরন্টোর মেয়র নির্বাচনে অলিভিয়া-ব্র্যাডফোর্ড

কানাডার প্রধান বাণিজ্যিক নগরী টরন্টোর মেয়র নির্বাচনে অলিভিয়া চাও ও ব্র্যাড ব্র্যাডফোর্ডের ব্যবধান আরও কমেছে। ৯ অক্টোবর প্রকাশিত Mainstreet Research-এর সর্বশেষ জরিপে দেখা গেছে, পছন্দের প্রার্থী ঠিক করে ফেলেছেন বা কোনো প্রার্থীর দিকে ঝুঁকেছেন এমন ভোটারদের মধ্যে অলিভিয়া এখনও এগিয়ে আছেন, তবে ব্যবধান নেমে এসেছে মাত্র ২.৯ শতাংশ পয়েন্টে। জরিপটির margin of error প্লাস-মাইনাস ৩.১ শতাংশ পয়েন্ট। অর্থাৎ জরিপে পাওয়া সমর্থনের হার প্রকৃত ভোটারসমর্থনের তুলনায় প্রায় ৩.১ পয়েন্ট কম বা বেশি হতে পারে। সে কারণে অলিভিয়া ও ব্র্যাডফোর্ডের ২.৯ পয়েন্টের ব্যবধানকে নিশ্চিত ব্যবধান হিসেবে ধরা যায় না।

জরিপটি চালানো হয় ৬ ও ৭ অক্টোবর, এক হাজার প্রাপ্তবয়স্ক টরন্টোবাসীর ওপর। অংশগ্রহণকারীদের ল্যান্ডলাইন ও মোবাইল ফোনে স্বয়ংক্রিয় টেলিফোন পদ্ধতিতে প্রশ্ন করা হয়। প্রকাশিত বিস্তারিত তথ্য অনুযায়ী, অলিভিয়া পেয়েছেন ৪৭.২ শতাংশ এবং ব্র্যাডফোর্ড ৪৪.৩ শতাংশ সমর্থন।

এই সংখ্যার তাৎপর্য শুধু ব্যবধান কমায় নয়। গত ২ অক্টোবর Mainstreet-এর আগের জরিপে সব ভোটারকে বিবেচনায় নিয়ে অলিভিয়ার সমর্থন ছিল ৩৮.১ শতাংশ এবং ব্র্যাডফোর্ডের ৩২.২ শতাংশ। তখন ক্রিস আলেকজান্ডারও প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ছিলেন এবং তিনি পেয়েছিলেন ৭.২ শতাংশ। ১৬ শতাংশ ভোটার তখনও সিদ্ধান্ত নেননি। একই জরিপে যাঁরা পছন্দ ঠিক করেছিলেন বা কোনো প্রার্থীর দিকে ঝুঁকেছিলেন, তাঁদের মধ্যে অলিভিয়া ছিলেন ৪৫.৪ এবং ব্র্যাডফোর্ড ৩৮.৩ শতাংশে। অর্থাৎ তখন ব্যবধান ছিল প্রায় সাত পয়েন্ট।

তারপর কয়েক দিনের মধ্যে নির্বাচনী সমীকরণ বদলেছে। ৬ অক্টোবর Forum Research-এর জরিপে অলিভিয়া পেয়েছিলেন ৪৬ শতাংশ এবং ব্র্যাডফোর্ড ৪২ শতাংশ। ওই জরিপেও দেখা গিয়েছিল ব্যবধান চার পয়েন্টে নেমে এসেছে। ১,৬০৪ জন টরন্টোবাসীর ওপর পরিচালিত Forum-এর জরিপটির margin of error ছিল প্লাস-মাইনাস ২.৪৫ শতাংশ পয়েন্ট।

এখন Mainstreet-এর নতুন জরিপে ব্যবধান আরও কমে ২.৯ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। তবে এটিকে সরাসরি ভোটের ফলাফলের পূর্বাভাস হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। জরিপের margin of error-এর মধ্যে থাকা মানে বাস্তবে দুই প্রার্থীর অবস্থান আরও কাছাকাছি হতে পারে, আবার ব্যবধান কিছুটা বেশিও হতে পারে। ভিন্ন জরিপ প্রতিষ্ঠানের পদ্ধতি, নমুনা এবং প্রশ্ন করার ধরনও এক নয়। তাই একটি জরিপের পরিবর্তে ধারাবাহিক কয়েকটি জরিপ একসঙ্গে দেখলেই ভোটের গতিপথ সম্পর্কে তুলনামূলক পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যায়।

তবু ধারাবাহিক জরিপে একটি বিষয় চোখে পড়ছে। কয়েক সপ্তাহ আগেও অলিভিয়ার ব্যবধান ছিল অনেক বেশি। ২৫ সেপ্টেম্বর Forum Research-এর জরিপে তিনি ব্র্যাডফোর্ডের চেয়ে ১১ পয়েন্ট এগিয়ে ছিলেন, ৪৬ শতাংশ বনাম ৩৫ শতাংশ। ৬ অক্টোবর সেই ব্যবধান নেমে আসে চার পয়েন্টে। আর ৬ ও ৭ অক্টোবর পরিচালিত Mainstreet-এর নতুন জরিপে ব্যবধান আরও কমে ২.৯ পয়েন্ট।

নতুন জরিপে নারী ও পুরুষ ভোটারের মধ্যেও উল্লেখযোগ্য পার্থক্য দেখা গেছে। Mainstreet বলছে, নারী ভোটারদের মধ্যে অলিভিয়া এগিয়ে, আর পুরুষ ভোটারদের মধ্যে ব্র্যাডফোর্ড। বয়সের ক্ষেত্রেও বিভাজন রয়েছে। তুলনামূলক কম বয়সী ভোটারদের মধ্যে অলিভিয়ার সমর্থন বেশি, আর বয়স্ক ভোটারদের মধ্যে ব্র্যাডফোর্ড এগিয়ে।

এলাকাভিত্তিক সমর্থনেও ভিন্ন চিত্র দেখা যাচ্ছে। Mainstreet-এর প্রেসিডেন্ট ও সিইও কুইটো ম্যাগির ভাষ্য অনুযায়ী, Downtown, Scarborough ও North York-এ অলিভিয়া এগিয়ে রয়েছেন, আর Etobicoke-তে ব্র্যাডফোর্ড এগিয়ে। বিশেষ করে East Asian ভোটারদের একটি অংশ ব্র্যাডফোর্ডের দিকে সরে এসেছে বলেও তিনি উল্লেখ করেছেন।

এই আঞ্চলিক ও জনমিতিক বিভাজন নির্বাচনের শেষ দুই সপ্তাহকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলছে। অলিভিয়ার শক্তির জায়গা তরুণ ভোটার, নারী এবং শহরের কেন্দ্র ও কয়েকটি বড় অঞ্চলে। ব্র্যাডফোর্ডের পক্ষে তুলনামূলক বেশি সমর্থন দেখা যাচ্ছে পুরুষ, বয়স্ক ভোটার এবং Etobicoke-তে। ফলে কোন পক্ষ তাদের সমর্থকদের ভোটকেন্দ্রে বেশি নিয়ে যেতে পারবে, সেটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

ভোটারদের প্রধান উদ্বেগও দুই প্রার্থীর প্রচারে বড় ভূমিকা রাখছে। Canada Pulse Insights-এর সাম্প্রতিক জরিপে ৪৩ শতাংশ ভোটার জীবনযাত্রার ব্যয় ও affordability-কে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এরপর রয়েছে অপরাধ, পুলিশিং ও জননিরাপত্তা এবং যানজট ও সড়ক অবকাঠামো। একই জরিপে দেখা যায়, অলিভিয়ার সমর্থকদের মধ্যে আবাসন ও সামাজিক সহায়তা তুলনামূলক গুরুত্বপূর্ণ, আর ব্র্যাডফোর্ডের সমর্থকদের মধ্যে অপরাধ, জননিরাপত্তা, যানজট, কর ও সিটি বাজেট বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।

দুই প্রার্থীর সাম্প্রতিক প্রচারেও সেই বিভাজন পরিষ্কার। ব্র্যাডফোর্ড এক হাজার নতুন পুলিশ কর্মকর্তা নিয়োগ, সিটি হলের ব্যয় পর্যালোচনা, পানির বিল কমানো এবং সম্পত্তি কর নিয়ন্ত্রণের কথা বলছেন। অন্যদিকে অলিভিয়া আবাসন, সামাজিক সেবা, TTC, খাদ্য ব্যয় এবং বিভিন্ন কমিউনিটি-ভিত্তিক কর্মসূচিকে গুরুত্ব দিচ্ছেন। সাম্প্রতিক কয়েকটি মুখোমুখি বিতর্কে দুই পক্ষই একে অন্যের পরিকল্পনার বিশ্বাসযোগ্যতা ও অর্থায়ন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।

অলিভিয়া চাওয়ের পক্ষে ইতিমধ্যে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শ্রমিক ও পেশাজীবী সংগঠন প্রকাশ্যে সমর্থন জানিয়েছে। Toronto & York Region Labour Council তাঁর পুনর্নির্বাচনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। TTC কর্মীদের প্রতিনিধিত্বকারী ATU Local 113-ও অলিভিয়াকে সমর্থন করেছে, বিশেষ করে গণপরিবহনে বিনিয়োগ, সেবা রক্ষা এবং শ্রমিকদের সঙ্গে কাজ করার তাঁর অবস্থানকে সামনে রেখে। নির্মাণশ্রমিকদের শক্তিশালী সংগঠন LiUNA Local 183-ও এবার তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছে। পাশাপাশি Automotive Parts Manufacturers Association-এর সমর্থনও পেয়েছেন অলিভিয়া। বিভিন্ন খাতের এসব সমর্থন তাঁর প্রচারে একটি সংগঠিত প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি তৈরি করেছে এবং নির্বাচনের শেষ পর্যায়ে তা রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

অন্যদিকে ব্র্যাড ব্র্যাডফোর্ডের পক্ষে A Better City Toronto সক্রিয়ভাবে প্রচার চালাচ্ছে। সংগঠনটি টরন্টোর মেয়র নির্বাচন ঘিরে তাঁর পক্ষে জনমত গড়ে তোলার চেষ্টা করছে এবং অলিভিয়া চাওয়ের প্রশাসনের বিভিন্ন নীতি ও সিদ্ধান্তের সমালোচনাও করছে।

আগাম ভোট ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে এবং ১১ অক্টোবর পর্যন্ত চলবে। মূল ভোট ২৬ অক্টোবর। ফলে নির্বাচনী প্রচারের জন্য সময়ও দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। এখন থেকে নতুন প্রতিশ্রুতি, বিতর্ক, ভোটার উপস্থিতি এবং প্রচারের শেষ পর্যায়ের কৌশল প্রতিটি ছোট ব্যবধানকেও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলতে পারে।

সর্বশেষ জরিপের সবচেয়ে বড় বার্তা তাই সংখ্যার চেয়েও বড়। অলিভিয়া এখনও এগিয়ে আছেন, কিন্তু ব্যবধান এখন এতটাই কম যে এটিকে আর স্বস্তিদায়ক ব্যবধান বলা যায় না। একই সঙ্গে জরিপের margin of error-এর মধ্যে থাকা এই পার্থক্য থেকে নিশ্চিত কোনো ফলও টানা যায় না। নির্বাচনের শেষ দুই সপ্তাহে টরন্টোর মেয়র লড়াই তাই আরও নিবিড় পর্যবেক্ষণের দাবি রাখছে।

তথ্যসূত্র: Mainstreet Research; Forum Research; CityNews Toronto; TorontoToday

Back to top button
🌐 Read in Your Language