শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দেওয়ায় বাংলাদেশের মানুষের আস্থা ফেরানো কঠিন হচ্ছে: মুশফিকুল ফজল আনসারী

ঢাকা,১১ অক্টোবর-শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দেওয়া এবং তাঁকে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার সুযোগ করে দেওয়ার কারণে বাংলাদেশের জনগণের আস্থা আবার অর্জন করা কঠিন হয়ে পড়ছে বলে মন্তব্য করেছেন রাষ্ট্রদূত মুশফিকুল ফজল আনসারী।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক নতুন করে গড়ে তুলতে হলে ভারতকে এ দেশের মানুষের আকাঙ্ক্ষা বুঝতে হবে। একই সঙ্গে নতুন বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে ভারতের পক্ষ থেকে আরও স্পষ্ট পদক্ষেপ নিতে হবে।
শুক্রবার (৯ অক্টোবর) সন্ধ্যায় ওয়াশিংটন ডিসির ন্যাশনাল প্রেস ক্লাবে আসাঙ্গা আবেয়াগোনাসেকারার নতুন বই ‘উইন্ডস অব চেঞ্জ: জিওপলিটিক্স অ্যাট দ্য ক্রসরোডস অব সাউথ অ্যান্ড সাউথইস্ট এশিয়া’ নিয়ে আয়োজিত এক আলোচনায় অতিথি বক্তা হিসেবে এসব কথা বলেন তিনি।
আলোচনার বিষয় ছিল পরাশক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতা, যুক্তরাষ্ট্র-চীন ও চীন-ভারতের ভূরাজনীতি এবং দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় গণতন্ত্র ও মানবাধিকার।
অনুষ্ঠানে আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন দ্য মিলেনিয়াম প্রজেক্টের নির্বাহী পরিচালক, সহপ্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী জেরোম সি. গ্লেন এবং আটলান্টিক কাউন্সিলের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক রেসিডেন্ট সিনিয়র ফেলো মাইকেল কুগেলম্যান। গ্লোবাল ফোরসাইট স্ট্র্যাটেজিসের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী প্যাটি মরিসের সঞ্চালনায় আয়োজিত এ আলোচনায় বইটির লেখক আসাঙ্গা আবেয়াগোনাসেকারাসহ সাংবাদিক, কূটনীতিক ও বিশিষ্ট অতিথিরা অংশ নেন।
মুশফিকুল ফজল আনসারী বলেন, “বাংলাদেশ ও অন্যান্য প্রতিবেশী দেশের জনগণের আকাঙ্ক্ষা বুঝতে ভারতকে আরও বেশি সচেষ্ট হতে হবে। শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দেওয়া এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ করে দেওয়া জনগণের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠাকে আরও কঠিন করে তোলে।”
তিনি বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠন এবং নতুন বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার জন্য ভারতের পক্ষ থেকে আরও স্পষ্ট পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। দীর্ঘস্থায়ী বন্ধুত্ব গড়ে তুলতে হয় একটি দেশের জনগণের সঙ্গে। সেই সম্পর্ক কোনো একজন নেতা বা একটি রাজনৈতিক দলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না।
বাংলাদেশের গণতন্ত্রে ফিরে আসার প্রসঙ্গ তুলে আনসারী বলেন, এই পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে মানুষের স্বাধীনতা, মর্যাদা এবং জবাবদিহিমূলক সরকারের প্রতি আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ পেয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে এসব আকাঙ্ক্ষাকে বাস্তব পরিবর্তনে রূপ দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। মানুষ চায়, রাষ্ট্র পরিচালনায় তাদের মতামত ও প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটুক।
বাংলাদেশের প্রতি চীনের সহযোগিতামূলক মনোভাবকে স্বাগত জানিয়ে তিনি বলেন, দেশের উন্নয়ন এবং মানুষের জন্য নতুন সুযোগ তৈরিতে এই অংশীদারত্বকে কাজে লাগানো প্রয়োজন। ওয়াশিংটনে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক লালগালিচা অভ্যর্থনাকে সংলাপ ও সহযোগিতার গুরুত্বের একটি ইঙ্গিত হিসেবে তুলে ধরেন তিনি। তাঁর মতে, বড় প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিগুলোও পারস্পরিক বোঝাপড়া ও সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সম্পর্কের ক্ষেত্রেও একই ধরনের মনোভাব প্রয়োজন।
আনসারী বলেন, “আমি ভারত ও চীন—উভয় দেশের সঙ্গে বন্ধুত্ব সম্প্রসারণের পক্ষে। তবে সেই বন্ধুত্ব হতে হবে সমতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মানের ভিত্তিতে। নিজ জনগণের স্বার্থে সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা বাংলাদেশের থাকতে হবে।”
চীন বা ভারতের শিবিরে নয়, ভারসাম্য খুঁজছে দেশগুলো
মাইকেল কুগেলম্যান বলেন, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা এখন আর শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। রাশিয়াও এ অঞ্চলে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করছে। বাংলাদেশের সঙ্গে রাশিয়ার গভীর জ্বালানি সম্পর্ক এবং পাকিস্তান ও নেপালের জ্বালানি খাতে দেশটির সম্পৃক্ততার বিষয়টি তুলে ধরেন তিনি।
তাঁর মতে, দক্ষিণ এশিয়ায় রাশিয়ার প্রতি সরাসরি শত্রুভাবাপন্ন কোনো রাষ্ট্র নেই। ভারত ছাড়াও এ অঞ্চলের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে মস্কোর বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। এ কারণে আঞ্চলিক প্রতিযোগিতায় রাশিয়ার ভূমিকাকেও গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।
কুগেলম্যান বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার কয়েকটি দেশে নতুন নেতৃত্ব ক্ষমতায় আসার পর চীনের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়াচ্ছে এবং ভারতের কাছ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে—এমন আলোচনা প্রায়ই শোনা যায়। মালদ্বীপ, শ্রীলঙ্কা ও নেপালের ক্ষেত্রেও একই ধরনের ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে।
তবে তাঁর মতে, এসব দেশের অবস্থানকে সরলভাবে চীন বা ভারতের শিবিরে যোগ দেওয়ার চেষ্টা হিসেবে দেখা ঠিক নয়। বরং তারা দুই দেশের সঙ্গে সম্পর্কের মধ্যে আরও ভালো ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রত্যাবর্তনের পর যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি ও বিশ্বব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতাকেও প্রভাবিত করছে বলে মন্তব্য করেন কুগেলম্যান।
প্রতিযোগিতার মানসিকতা বদলানোর আহ্বান গ্লেনের
জেরোম সি. গ্লেন বিশ্বরাজনীতিতে ‘জিরো-সাম’ প্রতিযোগিতার ধারণার সমালোচনা করেন। এই ধারণায় এক পক্ষের লাভকে অন্য পক্ষের ক্ষতি হিসেবে দেখা হয়। তাঁর মতে, যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসা ও কূটনীতি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো যত দিন এই ধারণা শেখাতে থাকবে, তত দিন বিশ্বও একই প্রতিযোগিতার চক্র থেকে বের হতে পারবে না।
প্রযুক্তির ক্রমবর্ধমান সক্ষমতা নিয়েও সতর্ক করেন তিনি। গ্লেন বলেন, প্রযুক্তি আরও শক্তিশালী, সহজে বহনযোগ্য ও ক্ষুদ্র আকারের হয়ে ওঠায় ভবিষ্যতে একজন ব্যক্তির পক্ষেও এককভাবে গণবিধ্বংসী অস্ত্র তৈরি ও ব্যবহার করা সম্ভব হয়ে উঠতে পারে। এমন পরিস্থিতি এড়ানোর প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
এ প্রসঙ্গে ভবিষ্যৎচিন্তক বাকমিনস্টার ফুলারের ‘সিনার্জি’ বা সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বাড়তি সুফল তৈরির ধারণা তুলে ধরেন গ্লেন। তিনি বলেন, ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষণ চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নিয়ে চিন্তার ধরনও বদলাতে হবে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সম্মিলিত সুফল তৈরি করে এমন সহযোগিতামূলক সম্পর্ক গড়ে তুলতে পরিকল্পিত উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
ছোট রাষ্ট্রগুলোর স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ রক্ষা জরুরি
অনুষ্ঠান-পরবর্তী প্রতিফলনে বইটির লেখক আসাঙ্গা আবেয়াগোনাসেকারা বলেন, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াকে এখন আর আলাদাভাবে বোঝার সুযোগ নেই। পরাশক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতা, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, অর্থনৈতিক দুর্বলতা এবং স্বাধীনভাবে কৌশলগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রচেষ্টা—সবকিছুই এ দুই অঞ্চলের ভবিষ্যৎকে ক্রমেই একে অপরের সঙ্গে যুক্ত করছে।
প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে ভারতের সম্পর্কে ক্রমবর্ধমান আস্থার ঘাটতির বিষয়টিও তুলে ধরেন তিনি। তাঁর মতে, বড় শক্তিগুলোর উচ্চাকাঙ্ক্ষা কীভাবে ছোট রাষ্ট্রগুলোর সার্বভৌমত্ব ও কৌশলগত সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে, তা গভীরভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
আসাঙ্গা বলেন, বিভিন্ন সমঝোতা স্মারক ও প্রতিরক্ষা অংশীদারত্বের গুরুত্ব শুধু রাজনৈতিক প্রতীক দিয়ে বিচার করা যায় না। এসব চুক্তির বাস্তব ফলাফল, বাস্তবায়ন এবং পারস্পরিক সুফলের বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিতে হবে।
চীনের বাণিজ্য, অর্থনৈতিক সম্পৃক্ততা ও সফট পাওয়ার কূটনীতির মাধ্যমে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করার বিষয়টিও তাঁর আলোচনায় উঠে আসে। পাশাপাশি ইরানকে ঘিরে যুদ্ধের প্রভাব, জ্বালানির দামের অস্থিরতা, সামুদ্রিক নিরাপত্তা এবং ভারত মহাসাগরের সামরিকীকরণকে ঝুঁকিপূর্ণ অর্থনীতিগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।
তাঁর মতে, আঞ্চলিক সহযোগিতা, দূরদর্শিতা এবং আগাম প্রস্তুতিমূলক কূটনীতি এখন আরও বেশি জরুরি। মূল চ্যালেঞ্জ শুধু পরাশক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতা সামাল দেওয়া নয়, বরং ছোট রাষ্ট্রগুলো যাতে নিজেদের ভবিষ্যৎ নিজেরাই নির্ধারণ করতে পারে, সেই স্বাধীনতা নিশ্চিত করা।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত অতিথিদের মধ্যে ছিলেন রবার্ট এফ. কেনেডির কন্যা ক্যাথলিন কেনেডি এবং ন্যাশনাল প্রেস ক্লাবের মার্ক শোয়েফ জুনিয়র। অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া সাংবাদিক, কূটনীতিক ও অতিথিদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান আসাঙ্গা আবেয়াগোনাসেকারা।
এস এম/ ১১ অক্টোবর ২০২৬







