ফ্যামিলি কার্ডের নামে চরম প্রতারণা: নিরক্ষর বিধবার টিপসই নিয়ে জাল কাবিননামা তৈরি

ময়মনসিংহ, ০৮ অক্টোবর – ফ্যামিলি কার্ড পাইয়ে দেওয়ার কথা বলে এক অসহায় বিধবা নারীর সরলতার সুযোগ নিয়ে জাল কাবিননামা ও এফিডেভিট তৈরির এক চাঞ্চল্যকর প্রতারণার অভিযোগ উঠেছে। সরকারি সহায়তার আশায় জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি, ছবি ও টিপসই দিয়েছিলেন ওই নারী। কিন্তু কিছুদিন পরই তিনি জানতে পারেন—তার অজান্তেই গ্রামে রটে গেছে তার দ্বিতীয় বিয়ের খবর! ময়মনসিংহের ফুলবাড়ীয়া উপজেলার পুটিজানা ইউনিয়নের পাটুলী গ্রামে ঘটে যাওয়া এই ঘটনায় পুরো এলাকায় তীব্র ক্ষোভ ও চাঞ্চলের সৃষ্টি হয়েছে।
ফ্যামিলি কার্ডের আড়ালে প্রতারণার ছক
ভুক্তভোগী আছিয়া বেগম (৪৩) জানান, প্রায় ১৩ বছর আগে স্বামী আবু কালাম মারা যাওয়ার পর দুই সন্তানকে বড় করতে তিনি দিনমজুরি বেছে নেন। সন্তানদের কথা ভেবে একাধিক বিয়ের প্রস্তাব এলেও তিনি আর সংসারী হননি। প্রায় দেড় মাস আগে স্থানীয় ব্যবসায়ী আবদুস ছাত্তার ফ্যামিলি কার্ড করে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে তার কাছ থেকে ছবি ও জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি নেন। পরবর্তীতে টিপসই নেওয়ার কথা বলে ডেকে একটি কাগজে নিরক্ষর আছিয়ার টিপসই নেওয়া হয়।
এর কিছুদিন পর এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে যে আছিয়া বেগমের বিয়ে হয়ে গেছে। পরে তাকে আড়াই লাখ টাকা দেনমোহরের একটি কাবিননামা দেখানো হয়, যেখানে বর হিসেবে নাম রয়েছে স্থানীয় বাসিন্দা আবদুল কুদ্দুছের। কাবিননামায় টিপসই থাকলেও আছিয়া বেগমের স্পষ্ট দাবি—তিনি কোনো কাজির কাছে যাননি, বিয়ের কোনো অনুষ্ঠানেও উপস্থিত ছিলেন না কিংবা এতে তার কোনো সম্মতি ছিল না। ফ্যামিলি কার্ডের জন্য নেওয়া টিপসই ব্যবহার করেই এই ভুয়া কাবিননামা তৈরি করা হয়েছে।
কাজি ও সাক্ষীর অস্বীকৃতি: জাল কাবিননামার পর্দা উন্মোচন
প্রতারণার এই ঘটনায় তথাকথিত ‘বর’ আবদুল কুদ্দুছ ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর থেকে আত্মগোপনে রয়েছেন। তবে তার প্রথম স্ত্রী সুফিয়া খাতুন জানান, স্বামী কোর্ট ম্যারেজ করার দাবি করলেও পরিবারের কেউ এই বিয়ের বিষয়ে জানত না।
অন্যদিকে কাবিননামায় উল্লেখিত কাজি গোলাম মোস্তফা পুরো ঘটনাটিকে জালিয়াতি বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি নিশ্চিত করেছেন, এমন কোনো বিয়ে তিনি রেজিস্ট্রি করেননি এবং বিষয়টি নিয়ে পুলিশের সহায়তা নেবেন। এমনকি কাবিননামায় সাক্ষী হিসেবে নাম থাকা সাইফুল ইসলামও জানিয়েছেন, তিনি এই বিয়ের বিষয়ে কিছুই জানেন না।
সালিশে অনুপস্থিত অভিযুক্তরা, আইনি পদক্ষেপের প্রস্তুতি
স্থানীয়ভাবে বিষয়টি নিষ্পত্তির জন্য গত সোমবার ও বুধবার সালিশ বৈঠক ডাকা হলেও মূল অভিযুক্ত আবদুস ছাত্তার ও আবদুল কুদ্দুছ সেখানে উপস্থিত হননি। সালিশে নেতৃত্ব দেওয়া স্থানীয় পল্লী চিকিৎসক মোহাম্মদ রুস্তম আলী জানান, শুক্রবার পর্যন্ত সময় দেওয়া হয়েছে, অবস্থান স্পষ্ট না করলে ভুক্তভোগী পরিবারকে সঙ্গে নিয়ে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
প্রতারণার দায়ে অভিযুক্ত আবদুস ছাত্তার অবশ্য অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেছেন, জমি সংক্রান্ত বিরোধের জেরে তাকে ফাঁসানো হচ্ছে। ফুলবাড়ীয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ রাশেদুল হাসান জানিয়েছেন, বিষয়টি তারা জানতে পেরেছেন। লিখিত অভিযোগ পেলেই তদন্ত সাপেক্ষে দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
এনএন/ ০৮ অক্টোবর ২০২৬







