
কানাডার রাজনীতিতে আলবার্টার বিচ্ছিন্নতাবাদ নতুন কোনো বিষয় নয়। কিন্তু এবারের বিষয়টি আলবার্টা ও অটোয়ার রাজনৈতিক টানাপোড়েনের সীমানা ছাড়িয়ে গেছে। ওয়াশিংটনে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন আলবার্টার বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতারা। ক্যালগেরিতে তাঁদের সঙ্গে বসেছেন মিশিগান থেকে আসা রিপাবলিকান রাজনৈতিক কৌশলবিদরা। আলোচনা হয়েছে সমর্থক খুঁজে বের করা, ভোটে মানুষ নামানো এবং স্বাধীন আলবার্টার ভবিষ্যৎ নিয়ে। এর সঙ্গে সামনে এসেছে তেল, পানি ও অন্যান্য প্রাকৃতিক সম্পদ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্ভাব্য বোঝাপড়ার কথাও। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, কানাডার একটি প্রদেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় সীমান্তের ওপার থেকে কেউ ভূমিকা রাখছে কি না।
এই প্রশ্নটিই আরও জোরালো হয়ে ওঠে ৫ অক্টোবর Toronto Star-এ প্রকাশিত “Report linking Alberta separatists to Americans sparks alarm in Ottawa” শিরোনামের প্রতিবেদনে। প্রতিবেদনে দেখা যায়, বিষয়টি এতটাই গুরুত্ব পেয়েছে যে নিউ ডেমোক্রেটিক পার্টি হাউস অব কমন্সে এ নিয়ে জরুরি বিতর্কের আবেদন জানায়। তাদের প্রশ্ন ছিল, রিপাবলিকান পার্টির সঙ্গে যুক্ত মার্কিন রাজনৈতিক কর্মীরা যদি আলবার্টার বিচ্ছিন্নতাবাদীদের ভোটার সংগঠনে সহায়তা করেন, সেটিকে কি বিদেশি হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখা হবে?
ঘটনার সূত্র আরও গভীরে। The Globe and Mail-এর অনুসন্ধানে উঠে আসে, আলবার্টার বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত কয়েকজন নেতা গত বছর তিনবার ওয়াশিংটনে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। একই অনুসন্ধানে বলা হয়, চলতি বছরের জানুয়ারিতে মিশিগানের কয়েকজন রিপাবলিকান রাজনৈতিক কৌশলবিদ ক্যালগেরিতে এসে Alberta Prosperity Project-এর নেতাদের সঙ্গে বসেন। তাঁদের মধ্যে এমন লোকও ছিলেন, যারা ২০২৪ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের পক্ষে মিশিগানে কাজ করেছিলেন। বৈঠকে এমন প্রযুক্তি নিয়ে আলোচনা হয়, যার সাহায্যে সম্ভাব্য সমর্থকদের শনাক্ত করা এবং তাঁদের ভোটকেন্দ্রে নিয়ে আসার কাজ সংগঠিত করা যায়। Global News-ও Globe-এর অনুসন্ধানের এসব তথ্য তুলে ধরেছে।
এখানেই প্রশ্নটি রাজনৈতিক পরামর্শের সীমা ছাড়িয়ে যায়। কার স্বার্থে এই যোগাযোগ? কে কাকে খুঁজে বের করেছে? কে কাকে সাহায্য করতে চাইছে? এবং কেন? রহস্য আরও ঘনীভূত হয়েছে ওয়াশিংটনের বৈঠকগুলো নিয়ে প্রকাশিত তথ্যের কারণে। Globe and Mail-এর অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, স্বাধীন আলবার্টা হলে যুক্তরাষ্ট্র কী ধরনের সুবিধা পেতে পারে, সেই প্রসঙ্গও আলোচনায় এসেছিল। তেল, পানি ও অন্যান্য প্রাকৃতিক সম্পদের কথাও সেখানে উঠে আসে। অর্থাৎ আলোচনার পরিধি শুধু আলবার্টার স্বাধীনতার রাজনৈতিক ভবিষ্যতের মধ্যেই আটকে ছিল না, এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল স্বাধীনতার পর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্ভাব্য অর্থনৈতিক সম্পর্কের প্রশ্নও।
Alberta Prosperity Project-এর নেতা মিচ সিলভেস্টার স্বীকার করেছেন, ওয়াশিংটনে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে অন্তত একটি বৈঠকে তিনি উপস্থিত ছিলেন। আলবার্টার স্বাধীনতার পক্ষে সক্রিয় আরেক নেতা জেফ রাথও এর আগে প্রকাশ্যে বলেছেন, তিনি মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছেন। সেপ্টেম্বরে আলবার্টার বিচ্ছিন্নতার সম্ভাব্য অর্থনৈতিক খরচ নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশের পর রাথ জানান, সে কারণেই তাঁরা ওয়াশিংটনে গিয়েছিলেন এবং মার্কিন পক্ষের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ এখনও রয়েছে।
আলবার্টার বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সঙ্গে মার্কিন কর্মকর্তাদের ধারাবাহিক যোগাযোগ, ওয়াশিংটনে একাধিক বৈঠক, আবার ক্যালগেরিতে রিপাবলিকান রাজনৈতিক কৌশলবিদদের উপস্থিতি, সব মিলিয়ে জোরালো ইঙ্গিত মিলছে, কানাডার ভেতরের একটি বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনকে বাইরে থেকে ইন্ধন দেওয়া হচ্ছে। প্রশ্ন উঠেছে, একটি কানাডীয় প্রদেশের বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতাদের সঙ্গে মার্কিন কর্মকর্তাদের এত যোগাযোগের প্রয়োজন কেন?
এই প্রশ্নের একটি দিক থেকে উত্তর দিয়েছেন কানাডায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত পিট হুকস্ট্রা। তিনি বলেছেন, ট্রাম্প প্রশাসন আলবার্টার বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সঙ্গে কোনো কৌশল নির্ধারণ করছে না এবং স্বাধীন আলবার্টার জন্য আর্থিক সহায়তা নিয়েও আলোচনা হয়নি। তাঁর বক্তব্য সরাসরি মার্কিন প্রশাসনের সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করে। কিন্তু সেই অস্বীকৃতির পরও ক্যালগেরির বৈঠক, রিপাবলিকান কৌশলবিদদের উপস্থিতি এবং বিচ্ছিন্নতাবাদীদের ওয়াশিংটন সফর সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা ঘিরে রহস্য আরও গভীর হয়েছে।
কানাডা সরকারও বিষয়টি হালকাভাবে নিচ্ছে না। জননিরাপত্তামন্ত্রী গ্যারি আনন্দসাঙ্গারি এ নিয়ে ওঠা প্রশ্নের জবাব খুঁজতে কানাডার নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার ভূমিকার কথা সামনে এনেছেন। এরও আগে, ২২ সেপ্টেম্বর Foreign Influence Transparency Commissioner অ্যান্টন বোয়েগম্যান এক বিবৃতিতে জানান, আলবার্টার গণভোটকে ঘিরে সম্ভাব্য বিদেশি প্রভাবের বিষয়ে তাঁর দপ্তর অবগত এবং বিষয়টি নজরে রাখা হচ্ছে।
বিদেশি সরকার, প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি প্রকাশ্যে নিজেদের স্বার্থের কথা বলতে পারে। কিন্তু সেই কর্মকাণ্ড যদি গোপনে, প্রতারণামূলকভাবে বা কারও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত প্রভাবিত করার উদ্দেশ্যে পরিচালিত হয়, তখন বিষয়টি অন্য মাত্রা নেয়। তাই আলবার্টাকে ঘিরে এখন পর্যন্ত যেসব তথ্য সামনে এসেছে, সেগুলো উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
আলবার্টার প্রিমিয়ার ড্যানিয়েল স্মিথ নিজে বিচ্ছিন্নতার বিপক্ষে। তাঁর দপ্তর জানিয়েছে, ক্যালগেরিতে মার্কিন কৌশলবিদদের সঙ্গে বৈঠক সম্পর্কে তিনি জানতেন না এবং ওই কর্মকাণ্ডের সঙ্গে তাঁর কোনো সম্পর্ক নেই। একই সঙ্গে তাঁর সরকার বলছে, আলবার্টার ভবিষ্যৎ কানাডার মধ্যেই।
কিন্তু এখানেও একটি জটিল রাজনৈতিক বাস্তবতা রয়েছে। বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনটি পুরোপুরি কোনো বাইরের গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। স্মিথের নিজের দলের ভেতরেও এর সমর্থক রয়েছেন। ফলে বিষয়টি তাঁর জন্য একদিকে জাতীয় ঐক্যের প্রশ্ন, অন্যদিকে দলীয় রাজনীতিরও কঠিন পরীক্ষা।
১৯ অক্টোবরের ভোটটিও সরাসরি আলবার্টার স্বাধীনতার প্রশ্নে নয়। ভোটারদের সামনে দুটি পথ থাকবে। একদিকে আলবার্টাকে কানাডার প্রদেশ হিসেবেই রাখা, অন্যদিকে কানাডার সংবিধান অনুযায়ী এমন একটি আইনি প্রক্রিয়া শুরু করা, যার পরবর্তী ধাপে আলবার্টা কানাডা থেকে বিচ্ছিন্ন হবে কি না, সে বিষয়ে বাধ্যতামূলক গণভোট আয়োজন করা হবে। অর্থাৎ ১৯ অক্টোবরের ভোটে আলবার্টা আলাদা হয়ে যাচ্ছে না; ভোটাররা ঠিক করবেন, ভবিষ্যতে বিচ্ছিন্নতার প্রশ্নে চূড়ান্ত গণভোটের পথে যাওয়া হবে কি না।
জনমতের বর্তমান চিত্রে বিচ্ছিন্নতার পক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নেই। Angus Reid Institute-এর আগস্টে করা এক জরিপে ৬১ শতাংশ আলবার্টাবাসী কানাডায় থাকার পক্ষে মত দেন, আর ৩৩ শতাংশ ভবিষ্যতে বিচ্ছিন্নতা নিয়ে বাধ্যতামূলক গণভোটের প্রক্রিয়া শুরুর পক্ষে ছিলেন। ওই ৩৩ শতাংশের মধ্যে ৪১ শতাংশ আবার বলেছেন, তাঁদের সমর্থনের মূল উদ্দেশ্য অটোয়াকে একটি বার্তা দেওয়া।
সংখ্যাগুলো আপাতত স্বস্তি দিলেও সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো সতর্ক হওয়ার যথেষ্ট কারণ তৈরি করছে। বিচ্ছিন্নতাবাদ এক দিনে জন্ম নেয় না। দীর্ঘদিনের ক্ষোভ, অর্থনৈতিক দাবি, আঞ্চলিক পরিচয়, রাজনৈতিক প্রচার এবং বাইরের ইন্ধন মিলেই একটি আন্দোলন ধীরে ধীরে শক্তি পায়। আলবার্টার বর্তমান পরিস্থিতিতে এর কয়েকটি উপাদান একসঙ্গে দেখা যাচ্ছে।
কানাডা এর আগে কুইবেকের বিচ্ছিন্নতাবাদ দেখেছে। ১৯৯৫ সালে দেশ প্রায় দুই ভাগ হয়ে যাওয়ার কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত খুব অল্প ব্যবধানে কানাডা অখণ্ড থেকেছে। ইতিহাস তাই শেখায়, জাতীয় ঐক্যের প্রশ্নকে কখনও তুচ্ছ করে দেখার সুযোগ নেই।
আলবার্টার মানুষের ক্ষোভ থাকতে পারে। অটোয়ার নীতি নিয়ে কঠিন প্রশ্নও থাকতে পারে। সেই প্রশ্নের উত্তর রাজনৈতিক আলোচনায়, নির্বাচনে, পার্লামেন্টে এবং কানাডার সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যেই খুঁজে নেওয়া সম্ভব। কিন্তু ওয়াশিংটনে বৈঠক, ক্যালগেরিতে রিপাবলিকান কৌশলবিদদের উপস্থিতি এবং ভোটার সংগঠনের প্রযুক্তি নিয়ে আলোচনার মতো ঘটনা সামনে এলে কানাডার সার্বভৌমত্বের প্রশ্নও সামনে আসে।
১৯ অক্টোবরের ভোট আলবার্টাকে ঘিরে হলেও এর তাৎপর্য পুরো কানাডার জন্য। একটি প্রদেশ কানাডার সঙ্গে থাকবে কি না, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার কানাডিয়ানদেরই। সেখানে কোনো বিদেশি রাজনৈতিক শক্তি প্রভাব ফেলছে কি না, সেটিই এখন খতিয়ে দেখার বিষয়।
এনএন/ ০৬ অক্টোবর ২০২৬







