সৌদি আরবকে সহায়তায় সামরিক প্রধানদের জরুরি বৈঠক করবে সৌদি, তুরস্ক ও পাকিস্তান

রিয়াদ,২৫ সেপ্টেম্বর- ইয়েমেনে হুতিদের সঙ্গে লড়াই এবং সৌদি আরবে একের পর এক হামলার ঘটনায় উত্তেজনা বাড়ার মধ্যে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান তাদের সামরিক প্রধানদের জরুরি বৈঠকের পরিকল্পনা করেছে।
মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির আওতায় সৌদি আরবকে কীভাবে সহায়তা করা যায়, বৈঠকে তা নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।
বৃহস্পতিবার নিউইয়র্কে তিন দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকের পর এ পরিকল্পনার কথা জানানো হয়।
সৌদি প্রেস এজেন্সির (এসপিএ) এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৈঠকে সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান আল সৌদ, পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার এবং তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান অংশ নেন।
তবে তিন দেশের সামরিক প্রধানরা ঠিক কবে বৈঠকে বসবেন এবং সৌদি আরবকে কী ধরনের সামরিক সহায়তা দেওয়া হতে পারে, সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি।
মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির আওতায় প্রস্তুতি
সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান গত ৭ আগস্ট ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ স্বাক্ষর করে। চুক্তির লক্ষ্য তিন দেশের সম্মিলিত প্রতিরোধ সক্ষমতা বাড়ানো এবং প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আরও বিস্তৃত করা।
চুক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধারা হলো, তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর হামলাকে তিন দেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
চুক্তি স্বাক্ষরের পর থেকেই এর আওতায় বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরির কাজ শুরু হয়েছে। গত ৩১ আগস্ট ইস্তাম্বুলে তিন দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী, প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও সামরিক প্রধানরা প্রথমবারের মতো কৌশলগত রাজনৈতিক ও প্রতিরক্ষা কমিটির বৈঠকে বসেন। ওই বৈঠকে সৌদি আরবে একটি সচিবালয় প্রতিষ্ঠা এবং সামরিক সহযোগিতা আরও গভীর করার সিদ্ধান্ত হয়।
এবার ইয়েমেনের পরিস্থিতির মধ্যে তিন দেশের সামরিক নেতৃত্বের সম্ভাব্য বৈঠককে সেই প্রতিরক্ষা কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সৌদি আরবে হামলা, হুতিদের পাল্টা দাবি
তিন দেশের কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু হয়েছে ইয়েমেন থেকে সৌদি আরবে নতুন করে হামলা বাড়ার মধ্যেই।
সৌদি আরব জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তাইফ ও ইয়ানবুর দিকে ছোড়া ছয়টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করেছে।
সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের মুখপাত্র মেজর জেনারেল তুর্কি আল-মালিকি বলেছেন, হুতিদের আরও হামলা বা উত্তেজনা সৃষ্টির প্রচেষ্টা ‘দৃঢ়ভাবে মোকাবিলা’ করা হবে।
এর আগে সৌদি সিভিল ডিফেন্স কর্তৃপক্ষ দেশটির কয়েকটি এলাকায় সতর্কতা জারি করেছিল। পরে জানানো হয়, তাৎক্ষণিক বিপদের আশঙ্কা কেটে গেছে।
অন্যদিকে, হুতিরা দাবি করেছে, তারা রিয়াদে একটি ‘গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তু’ এবং ইয়ানবুতে সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি সৌদি আরামকোর স্থাপনায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। তবে এসব হামলার ক্ষয়ক্ষতি বা হতাহতের বিষয়ে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
সৌদিকে প্রতিরক্ষায় সহায়তা দেবে ফ্রান্সও
সৌদি আরবের পাশে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে ফ্রান্সও। দেশটির প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ জানিয়েছেন, ইয়ানবু রক্ষায় ফ্রান্স সামরিক সরঞ্জাম ও জনবল পাঠাবে।
বৃহস্পতিবার টিএফ১ টেলিভিশনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ম্যাক্রোঁ বলেন, “আমরা সামরিক সক্ষমতা পাঠাতে যাচ্ছি—অর্থাৎ এই স্থাপনাটি সুরক্ষিত রাখতে সেনা, রাডার ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পাঠানো হবে।”
ফ্রান্সের এই পদক্ষেপের ফলে ইয়েমেন সংঘাতের প্রভাব যে শুধু সৌদি আরবের নিরাপত্তাতেই সীমাবদ্ধ থাকছে না, বরং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোও এতে আরও সরাসরি জড়িয়ে পড়ছে, তা স্পষ্ট হচ্ছে।
ইয়েমেনে তীব্র লড়াই, এক দিনে নিহত ১৫০
সৌদি সীমান্তে হামলার পাশাপাশি ইয়েমেনের ভেতরেও সাম্প্রতিক সময়ে লড়াই তীব্র হয়েছে। কয়েকটি ফ্রন্টে সংঘর্ষে গত ২৪ ঘণ্টায় অন্তত ১৫০ জন নিহত হয়েছে বলে বার্তা সংস্থা এএফপির হিসাব জানিয়েছে।
এএফপির তথ্যানুযায়ী, নিহতদের মধ্যে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারের পক্ষে লড়াই করা ৯৮ জন এবং হুতিদের ৫২ জন যোদ্ধা রয়েছেন।
কাহবুব পর্বতমালা এবং বাব আল-মানদেব প্রণালির দিকে লাহিজ ও তাইজের মধ্যবর্তী বিভিন্ন এলাকায় এসব সংঘর্ষ হয়েছে।
ইয়েমেনের যুদ্ধক্ষেত্রে সাম্প্রতিক এই তীব্রতা দেশটির দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতকে আরও জটিল করে তুলছে। একই সঙ্গে কৌশলগত বাব আল-মানদেব প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে উদ্বেগও বাড়ছে।
বাব আল-মানদেবে হুতিদের অবস্থান শক্তিশালী
হুতিরা ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলের বিস্তীর্ণ এলাকায় নিজেদের উপস্থিতি আরও বাড়িয়েছে। এর মধ্যে মোখা বন্দরনগরী ও কয়েকটি কৌশলগত দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার দাবিও রয়েছে।
এসব এলাকায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার ফলে বাব আল-মানদেব প্রণালির আশপাশে হুতিদের অবস্থান আরও শক্তিশালী হয়েছে।
বাব আল-মানদেব বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ। এ পথে স্বাভাবিক সময়ে বিশ্বের মোট বাণিজ্যের প্রায় ১২ শতাংশ চলাচল করে বলে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি) জানিয়েছে। ফলে প্রণালিটির নিরাপত্তা নিয়ে কোনো বড় ধরনের সংকট দেখা দিলে এর প্রভাব শুধু ইয়েমেন বা সৌদি আরবেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বৈশ্বিক বাণিজ্য ও সরবরাহ ব্যবস্থাতেও বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।
আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারও পরিস্থিতিতে আরও আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছে। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে দেশটির ভাইস প্রেসিডেন্ট আবদুল্লাহ আবদুলকাদের আল-আলিমি-বাওজার সতর্ক করে বলেছেন, প্রণালির আশপাশে হুতিদের নিয়ন্ত্রণ বৃহত্তর অর্থনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করছে।
তিনি অভিযোগ করেন, হুতিরা নৌ চলাচলের স্বাধীনতাকে চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে এবং তাদের কর্মকাণ্ড ‘পুরো বৈশ্বিক অর্থনীতিকে জিম্মি করে ফেলছে’।
সেপ্টেম্বরে ঘরছাড়া ২ লাখ ৩০ হাজারের বেশি
ইয়েমেনে নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ায় মানবিক পরিস্থিতিও দ্রুত অবনতির দিকে যাচ্ছে।
জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআর জানিয়েছে, সেপ্টেম্বরের শুরু থেকে নতুন করে ২ লাখ ৩০ হাজারের বেশি মানুষ নিজেদের ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছে। এর ফলে ইয়েমেনে অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা আরও বেড়েছে। দেশটিতে আগে থেকেই প্রায় ৫২ লাখ মানুষ অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত অবস্থায় রয়েছে।
ইউএনএইচসিআরের তথ্যানুযায়ী, হোদেইদা, তাইজ, লাহিজ, এডেন, আবিয়ান, মারিব, আল-দালেয়া ও শাবওয়াসহ বিভিন্ন প্রদেশে সংঘর্ষের কারণে পরিবারগুলো বাস্তুচ্যুত হয়েছে। অনেক পরিবারকে অল্প সময়ের নোটিসে ঘর ছাড়তে হয়েছে এবং তারা সামান্য কিছু জিনিসপত্র নিয়েই নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে বের হয়েছে।
বাস্তুচ্যুত মানুষের সবচেয়ে জরুরি প্রয়োজনের মধ্যে রয়েছে আশ্রয়, খাবার, বিশুদ্ধ পানি, চিকিৎসাসেবা ও নিরাপত্তা। একই সঙ্গে স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও আশ্রয়কেন্দ্রগুলোর ওপরও ক্রমবর্ধমান চাপ তৈরি হচ্ছে।
ফলে সৌদি আরবকে ঘিরে হুতিদের হামলা, ইয়েমেনের ভেতরে নতুন করে তীব্র লড়াই এবং বাব আল-মানদেবের কৌশলগত গুরুত্ব—সব মিলিয়ে সংঘাতটি এখন আরও বড় আঞ্চলিক সংকটের দিকে এগোচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির আওতায় সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের সামরিক নেতৃত্বের সম্ভাব্য বৈঠক মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা সমীকরণে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে।
এস এম/ ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬







