
১৯৭৭ সালের শরতের এক সন্ধ্যা। বয়স ২৫। পেশায় আইন সচিব। টরন্টোর জনপ্রিয় Rooney’s-এ বন্ধুদের সঙ্গে মাঝেমধ্যেই যেতেন তরুণীটি। সেখানেই পরিচয় হয়েছিল তাঁর চেয়ে ২০ বছরের বড় এক ব্যবসায়ীর সঙ্গে। সেদিনও দেখা হলো। একসঙ্গে রাতের খাবার খেলেন। খাওয়া শেষে লোকটি বললেন, কাছেই তাঁর অ্যাপার্টমেন্ট। সেখানে যাওয়ার আমন্ত্রণ জানালেন। আগে থেকে চেনাজানা ছিল। সন্দেহ করার মতো কিছু তখনও ঘটেনি।
অ্যাপার্টমেন্টে ঢোকার কয়েক মিনিটের মধ্যেই সবকিছু পাল্টে গেল। আদালতে দেওয়া তরুণীর বর্ণনা অনুযায়ী, হঠাৎ পেছন থেকে তাঁকে ধাক্কা দিলেন লোকটি। সামনে থাকা একটি সোফার হাতলের ওপর উপুড় হয়ে পড়লেন তিনি। এরপর তাঁর স্কার্ট কোমরের ওপরের দিকে টেনে তুলে চেপে ধরলেন লোকটি। আতঙ্কগ্রস্ত তরুণী কোনোভাবে নিজেকে সামলে সেখান থেকে বেরিয়ে যান।
সেই রাতের পর ক্যালেন্ডারে ৪৯টি বছর যোগ হয়েছে। ২৫ বছরের সেই তরুণী এখন সত্তরের কোঠায়। আর যে ৪৫ বছর বয়সী লোকটির অ্যাপার্টমেন্টে ঘটনাটি ঘটেছিল, তিনি কানাডার শিল্পজগতের সবচেয়ে পরিচিত মুখগুলোর একজন। তাঁর নাম ফ্রাঙ্ক স্ট্রোনাচ।
অটো-পার্টস শিল্পে বিশাল সাম্রাজ্য গড়েছেন তিনি। কানাডার অন্যতম সফল অভিবাসীর গল্প হিসেবে একসময় তাঁর নাম উচ্চারিত হয়েছে। পেয়েছেন Order of Canada। ব্যবসা আর সম্পদের সাফল্যে তিনি হয়েছেন কানাডার বিলিয়নিয়ারদের একজন। কিন্তু ২০২৬ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর টরন্টোর আদালতে ৯৪ বছর বয়সী স্ট্রোনাচের সামনে পড়ে আছে তাঁর জীবনের সেই পুরোনো রাতটি।
১৯৭৭ সালের ওই ঘটনায় তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করেছেন অন্টারিও সুপিরিয়র কোর্টের বিচারক অ্যান মলয়। বৃহস্পতিবার সাজা নির্ধারণের শুনানিতে ক্রাউন প্রসিকিউশন তাঁর জন্য ছয় মাসের কারাদণ্ড চেয়েছিল। একই সঙ্গে ১০ বছরের জন্য যৌন অপরাধীদের নিবন্ধনে তাঁর নাম রাখার আবেদন জানানো হয়।
বৃহস্পতিবার আদালতে উপস্থিত ছিলেন সেই নারীও। বয়সের ভারে এখন তাঁকে হাঁটতে হয় সহায়ক যন্ত্র নিয়ে। আদালতের কর্মীরা তাঁকে ধরে সাক্ষ্যদানের আসনে বসতে সাহায্য করেন। তারপর বিচারকের সামনে তিনি বললেন, প্রায় অর্ধশতাব্দী আগের কয়েক মিনিট তাঁর জীবনে কী রেখে গেছে।
তিনি বলেন, সেদিন তিনি কিছু বুঝে ওঠার আগেই আক্রান্ত হয়েছিলেন। শক্তিতে পেরে ওঠেননি। নিজের শরীরের ওপর নিজের অধিকার মুহূর্তের মধ্যে কেড়ে নেওয়া হয়েছিল বলে তাঁর মনে হয়েছিল। ঘটনার পর তাঁর আত্মবিশ্বাসে আঘাত লাগে। নারীটি আদালতে বলেছেন, তিনি সবচেয়ে বেশি কষ্ট পেয়েছিলেন লোকটির আচরণে কোনো অনুশোচনা দেখতে না পেয়ে। এত বছর পরও একটি জিনিস তাঁকে কষ্ট দেয় যে এ ঘটনার জন্য স্ট্রোনাচ তাঁর কাছে কখনও দুঃখ প্রকাশ করেননি।
কয়েক ফুট দূরে আইনজীবী লিওরা শেমেশের পাশে বসে তাঁর কথা শুনছিলেন ফ্রাঙ্ক স্ট্রোনাচ। এই দৃশ্য পর্যন্ত পৌঁছাতে স্ট্রোনাচের জীবন ঘুরে এসেছে বহু দূর।
১৯৩২ সালে অস্ট্রিয়ার স্টাইরিয়ায় জন্ম তাঁর। পরিবারে প্রাচুর্য ছিল না। মাত্র ১৪ বছর বয়সে স্কুল ছেড়ে যন্ত্রপাতি তৈরির কাজ শেখার জন্য শিক্ষানবিশ হন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী ইউরোপ তখনও ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। আর তরুণ স্ট্রোনাচের চোখ আটলান্টিকের ওপারে।
১৯৫৪ সালে ২১ বছর বয়সে একটি জাহাজে চড়ে কানাডার উদ্দেশে রওনা দেন তিনি। সঙ্গে একটি স্যুটকেস, কয়েকশ ডলার আর নতুন জীবন শুরু করার ইচ্ছা। পরে নিজের আত্মজীবনীতে তিনি লিখেছেন, প্রথম দিকে কানাডায় তাঁর জীবন মোটেও ব্যবসায়িক সাফল্যের ছিল না।
প্রথম চাকরি হয়েছিল একটি হাসপাতালের রান্নাঘরে। কাজ ছিল থালা-বাসন ধোয়া, আলু আর গাজর পরিষ্কার করা। সকাল ছয়টা থেকে সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত কাজ করে মাসে পেতেন ৮০ ডলার, সঙ্গে থাকা-খাওয়া।
তারপর যন্ত্র তৈরির কারখানায় কাজ। কখনো চাকরি মিলেছে, আবার ছাঁটাইও হয়েছেন। একসময় টরন্টোর একটি ছোট tool-and-die shop-এ কাজ করতে করতে নিজের ব্যবসা করার সাহস জন্মায় তাঁর।
১৯৫৭ সালে সেই সাহসের পরীক্ষা শুরু হলো। টরন্টোর একটি পুরোনো ভবনের ভেতর চারটি গাড়ি রাখার মতো ছোট জায়গা ভাড়া নিলেন। কিছু ব্যবহৃত মেশিন কিনলেন। প্রতিষ্ঠানের নাম দিলেন Multimatic Investments Ltd. কর্মচারী বলতে তিনি নিজেই।
দিনে ১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করতেন। অনেক রাতে বাড়ি যাওয়ারও প্রয়োজন মনে করতেন না। মেশিনের পাশেই রাখা ভাঁজ করা ছোট খাটে ঘুমাতেন। আবার সকালে উঠে কাজ।
দুই বছরের মধ্যে সেই ছোট দোকানে কর্মীর সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ২০ জনে। ১৯৫৯ সালে আসে বড় সুযোগ। General Motors-এর Oshawa কারখানার জন্য গাড়ির sun visor-এর ধাতব bracket তৈরির অর্ডার পায় Multimatic। সেখান থেকেই সামনে খুলতে থাকে বড় শিল্পের দরজা। পরবর্তী দশকে ব্যবসাটি বড় হতে হতে অন্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে একীভূত হয়। নাম বদলায়। জন্ম নেয় Magna International।
যে মানুষটি কয়েক বছর আগে হাসপাতালের বেসমেন্টে থালা ধুতেন, তাঁর প্রতিষ্ঠিত কোম্পানি হয়ে ওঠে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অটোমোবাইল যন্ত্রাংশ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান। Magna-র নিজস্ব হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে কোম্পানিটির বার্ষিক ব্যবসা প্রায় ৪২ বিলিয়ন ডলার এবং কর্মী প্রায় এক লাখ ৫৫ হাজার।
ব্যবসায়িক কৃতিত্বের স্বীকৃতিও আসে। ১৯৯৯ সালে কানাডা সরকার তাঁকে Order of Canada-র সদস্য করে। গ্যারেজের ছোট ব্যবসাকে বিশ্বমানের অটো-পার্টস প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার কাহিনি তখন তাঁকে কানাডার সফল অভিবাসীদের অন্যতম পরিচিত মুখে পরিণত করেছে। অর্থ, প্রভাব আর পুরস্কারে ঘেরা সেই উত্থানের আড়ালেই অবশ্য আরেকটি গল্প বহু বছর জনসমক্ষে আসেনি।
২০২৪ সালে স্ট্রোনাচের বিরুদ্ধে একের পর এক যৌন অপরাধের অভিযোগ সামনে আসতে শুরু করে। Peel Regional Police-এর তদন্তে শেষ পর্যন্ত ১২ জন নারীর অভিযোগের সঙ্গে সম্পর্কিত ১৮টি অভিযোগ আনা হয়। বিভিন্ন সময়ের ঘটনাগুলো আলাদা করে বিচারের সিদ্ধান্ত হয়। টরন্টোয় প্রথম মামলায় সাত নারীর অভিযোগের ভিত্তিতে তাঁর বিরুদ্ধে ১২টি অভিযোগ নিয়ে বিচার শুরু হয় ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে।
আদালতে কয়েক মাস ধরে সাক্ষ্য চলে। সব অভিযোগ অবশ্য শেষ পর্যন্ত টেকেনি। একটি অভিযোগ প্রত্যাহার করে নেয় ক্রাউন। আরও চারটিতে স্ট্রোনাচকে দোষী সাব্যস্ত করা উচিত নয় বলে সম্মত হয় প্রসিকিউশন। আরেক অভিযোগকারীর সাক্ষ্য বিশ্বাসযোগ্য মনে না হওয়ায় তাঁর সঙ্গে সম্পর্কিত দুটি অভিযোগেও দোষী সাব্যস্ত করেননি বিচারক। শেষে তিন নারীর পাঁচটি অভিযোগ বিচারকের সামনে রয়ে যায়।
১৯ জুন বিচারক অ্যান মলয় দুটি অভিযোগে স্ট্রোনাচকে দোষী সাব্যস্ত করেন। একটি ছিল ১৯৭৭ সালের ২৫ বছর বয়সী সেই নারীর ঘটনায় indecent assault। অন্যটি আশির দশকের আরেক নারীর ঘটনায় sexual assault। বাকি অভিযোগগুলোতে তিনি দোষী সাব্যস্ত হননি। কিন্তু আদালতের নাটক তখনও শেষ হয়নি।
দ্বিতীয় নারীকে ঘিরে sexual assault-এর যে অভিযোগে স্ট্রোনাচ দোষী হয়েছিলেন, কয়েক সপ্তাহ পর সেই মামলায় নতুন মোড় আসে। ওই নারীর একটি পৃথক দেওয়ানি মামলার আইনজীবীর কিছু ই-মেইল আদালতের সামনে আনে প্রতিরক্ষা পক্ষ। স্ট্রোনাচের আইনজীবীদের দাবি ছিল, সেখানে ঘটনার যে বর্ণনা পাওয়া যাচ্ছে, তার সঙ্গে ফৌজদারি মামলায় নারীর সাক্ষ্যের গুরুত্বপূর্ণ অমিল রয়েছে।
১৭ জুলাই বিচারক মলয় ওই conviction-এর ক্ষেত্রে mistrial ঘোষণা করেন। দোষী সাব্যস্ত করার পর এ ধরনের সিদ্ধান্ত খুবই বিরল। ক্রাউন সেই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে Ontario Court of Appeal-এ গেছে। তাদের আবেদন, sexual assault-এর দোষী রায়টি ফিরিয়ে আনা হোক এবং সাজা নির্ধারণের জন্য মামলাটি আবার সুপিরিয়র কোর্টে পাঠানো হোক।
ফলে বৃহস্পতিবারের সাজা শুনানির বিষয় ছিল একটিই অপরাধ, ১৯৭৭ সালের indecent assault। অপরাধটি প্রায় ৪৯ বছর আগের বলে সাজাও নির্ধারিত হচ্ছে সে সময়কার আইন বিবেচনায় রেখে। তখন এই অপরাধের সর্বোচ্চ শাস্তি ছিল পাঁচ বছরের কারাদণ্ড।
ক্রাউন অ্যাটর্নি জেলেনা ভ্লাসিক বিচারককে বলেছেন, সেদিন তরুণীকে এমন অবস্থায় ফেলা হয়েছিল যেখানে তিনি শারীরিকভাবে অসহায় হয়ে পড়েছিলেন। তাঁদের বয়সের ব্যবধান ছিল ২০ বছর। নারীটি ছিলেন এমন একটি বাসায়, যেখানে তাঁকে স্ট্রোনাচই নিয়ে গিয়েছিলেন। ঘটনার প্রভাবও তাঁর জীবনে দীর্ঘদিন থেকে গেছে। এসব বিবেচনায় ছয় মাসের কারাদণ্ড চেয়েছিল ক্রাউন।
শেষ পর্যন্ত বিচারক অ্যান মলয় জানিয়ে দেন, ৯৪ বছর বয়সী স্ট্রোনাচকে এই অপরাধের জন্য কারাগারে পাঠানো হবে না। তবে তাঁর সাজা কী হবে, সেই সিদ্ধান্তের জন্য অপেক্ষা করতে হবে ১১ ডিসেম্বর পর্যন্ত।
দোষী রায়ের পর এরই মধ্যে তাঁর নামও মুছে যেতে শুরু করেছে কিছু জায়গা থেকে। Aurora একটি recreation complex থেকে Stronach নাম সরানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। Newmarket-এ তাঁর নামে থাকা একটি পার্কের নামও বদলে দেওয়া হয়েছে।
আইনি লড়াইও এখানেই থামছে না। ২০২৭ সালের মে মাসে Newmarket-এ তাঁর বিরুদ্ধে আরও ছয় নারীর অভিযোগ নিয়ে পৃথক যৌন নিপীড়ন মামলার বিচার হওয়ার কথা রয়েছে। বর্তমান মামলার দ্বিতীয় conviction ফিরিয়ে আনার জন্য ক্রাউনের আপিলও চলবে। এখন অপেক্ষা ১১ ডিসেম্বরের। সেদিনই জানা যাবে, ১৯৭৭ সালের সেই অপরাধের জন্য আদালত শেষ পর্যন্ত কী সাজা নির্ধারণ করে।
তথ্যসূত্র:
Toronto Star
The Canadian Press/CityNews







