সম্পাদকের পাতা

মন্ট্রিয়লে ভিসা জালিয়াতি ও জাল পাসপোর্টের অভিযোগে আবুল কাসিমের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা

নজরুল মিন্টো

সম্প্রতি কানাডায় অভিবাসন জালিয়াতির বড় একটি ঘটনা উন্মোচিত হয়েছে। কানাডা বর্ডার সার্ভিসেস এজেন্সি বা সিবিএসএ মন্ট্রিয়লের ৪২ বছর বয়সী আবুল কাসিমের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ এনেছে। সংস্থাটির অভিযোগ, দুই বছরের কিছু বেশি সময়ে তিনি ৬৫ জনকে অস্থায়ী আবাসিক ভিসা ও আশ্রয়ের আবেদনে মিথ্যা তথ্য দিতে সহায়তা করেন। তাঁদের মধ্যে ৫৩ জন প্রতারণার মাধ্যমে নেওয়া অস্থায়ী আবাসিক ভিসা ব্যবহার করে কানাডায় প্রবেশ করেন। তদন্তে তাঁর বিরুদ্ধে জাল কানাডীয় পাসপোর্ট ব্যবহারের অভিযোগও উঠে এসেছে।

ঘটনাটি এখন আর শুধু তদন্তের মধ্যে নেই। আবুল কাসিমের বিরুদ্ধে পাঁচটি ফৌজদারি অভিযোগ আনা হয়েছে। মন্ট্রিয়ল আদালতে গত ২৮ জুলাই মামলার কার্যক্রম শুরু হয়েছে। কিন্তু যাঁকে ঘিরে এত অভিযোগ, তিনি এখন কানাডায় নেই। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, কাসিম ২০২৫ সালের জুনে কানাডা ছেড়ে যান এবং বর্তমানে দেশের বাইরে অবস্থান করছেন। আদালতে হাজির হওয়ার জন্য তাঁর হাতে সমন পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হয়নি। ফলে তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে।

ঘটনার শুরু অবশ্য বেশ আগে। ইমিগ্রেশন, রিফিউজি অ্যান্ড সিটিজেনশিপ কানাডা বা আইআরসিসি থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ২০২৪ সালে আবুল কাসিমকে ঘিরে তদন্ত শুরু করে সিবিএসএ। এর প্রায় এক বছর পর, ২০২৫ সালের ৮ মে তাঁর মন্ট্রিয়লের বাসায় তল্লাশি পরোয়ানা (search warrant) নিয়ে অভিযান চালান তদন্তকারীরা। সেই তল্লাশিতে পাওয়া তথ্য ও প্রমাণই পরে মামলার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হয়ে ওঠে।

তদন্তকারীদের অভিযোগ, ২০২২ সালের ১৩ জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ১৯ মার্চ পর্যন্ত আবুল কাসিম অন্তত ৬৫ জনকে অস্থায়ী আবাসিক ভিসা বা টিআরভি (Temporary Resident Visa বা TRV) এবং আশ্রয়ের আবেদনে (asylum claims) মিথ্যা তথ্য দিতে সহায়তা করেন। একই সময়ে প্রতারণার মাধ্যমে নেওয়া টিআরভি ব্যবহার করে ৫৩ জনকে কানাডায় প্রবেশের ব্যবস্থা করা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।

টিআরভি নিজে কাউকে কানাডার স্থায়ী বাসিন্দা বা পার্মানেন্ট রেসিডেন্টের মর্যাদা দেয় না। এটি সাময়িকভাবে কানাডায় প্রবেশের জন্য প্রয়োজনীয় একটি ভিসা। তবে তদন্তে সবচেয়ে বিস্ময়কর তথ্যটি উঠে এসেছে এসব ভিসার আবেদনের সঙ্গে জমা দেওয়া আমন্ত্রণপত্র ঘিরে।

কানাডায় ভিজিটর ভিসার আবেদনে অনেক সময় কানাডায় থাকা আত্মীয়, বন্ধু কিংবা পরিচিত কারও আমন্ত্রণপত্র জমা দেওয়া হয়। আইআরসিসি বলছে, এমন আমন্ত্রণপত্র ভিসা পাওয়ার নিশ্চয়তা নয়, তবে ভিসা কর্মকর্তা আবেদন যাচাইয়ের সময় সেটি বিবেচনা করতে পারেন। আমন্ত্রণপত্রে যিনি অতিথিকে ডাকছেন তাঁর পরিচয়, ঠিকানা, আবেদনকারীর সঙ্গে সম্পর্ক এবং সফরের উদ্দেশ্যসহ বিভিন্ন তথ্য থাকে।

সিবিএসএর অভিযোগ, আবুল কাসিম এই ব্যবস্থাকেই কাজে লাগিয়েছিলেন। টিআরভি আবেদনের সঙ্গে জমা দেওয়া আমন্ত্রণপত্রে কানাডায় অবস্থানকারী ‘হোস্ট’ হিসেবে পরিচয় দেখাতে তিনি চারটি জাল কানাডীয় পাসপোর্ট ব্যবহার করেন। অর্থাৎ যে ব্যক্তি আবেদনকারীকে কানাডায় আমন্ত্রণ জানিয়েছেন বলে কাগজে দেখানো হচ্ছিল, সেই পরিচয়ের পক্ষে জাল পাসপোর্ট ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।

কানাডায় অর্থের বিনিময়ে অভিবাসন বিষয়ে পরামর্শ বা প্রতিনিধিত্ব করার জন্য অনুমোদন থাকা বাধ্যতামূলক। আইআরসিসির নিয়ম অনুযায়ী, এ ধরনের সেবা দিতে হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে ইমিগ্রেশন কনসালটেন্টদের নিয়ন্ত্রক সংস্থা, কোনো প্রাদেশিক বা টেরিটোরিয়াল ল সোসাইটি অথবা কুইবেকের নোটারি সংস্থার অনুমোদিত সদস্য হতে হয়। আবুল কাসিম অনুমোদিত অভিবাসন পরামর্শক বা আরসিআইসি (RCIC) ছিলেন কি না, তদন্তকারীরা তা উল্লেখ করেননি। তবে তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি নিজেকে এমন একটি প্রতিষ্ঠানের অভিবাসন পরামর্শক হিসেবে পরিচয় দিতেন, যার কানাডা, ফ্রান্স ও বাংলাদেশে কার্যালয় রয়েছে।

আবুল কাসিমের বিরুদ্ধে পাঁচটি অভিযোগ আনা হয়েছে। প্রথম অভিযোগ, কানাডায় অবৈধভাবে মানুষ প্রবেশে ষড়যন্ত্র করা। দ্বিতীয় অভিযোগ, অবৈধভাবে মানুষকে কানাডায় প্রবেশে সহায়তা করা।

আইআরপিএর ১১৭ ধারায় জেনেশুনে বা পরিণতি সম্পর্কে বেপরোয়া থেকে কাউকে কানাডার অভিবাসন আইন ভেঙে দেশে প্রবেশের ব্যবস্থা করা, উৎসাহ দেওয়া বা সহায়তা করা অপরাধ। একই ঘটনায় ১০ জন বা তার বেশি মানুষের বিষয় জড়িত থাকলে আইনে সর্বোচ্চ ১০ লাখ কানাডীয় ডলার জরিমানা অথবা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড, কিংবা দুটোই দেওয়ার বিধান রয়েছে।

তৃতীয় অভিযোগটি হলো ভিসার আবেদনে মিথ্যা তথ্য দিতে পরামর্শ বা সহায়তা করা। আইআরপিএর ১২৬ ধারা অনুযায়ী, অভিবাসন আবেদনের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে এমন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মিথ্যা তথ্য দেওয়া বা তথ্য গোপন করতে কাউকে জেনেশুনে সহায়তা করাও অপরাধ। অভিযোগ প্রমাণিত হলে মামলার ধরন অনুযায়ী সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড এবং এক লাখ ডলার পর্যন্ত জরিমানার বিধান রয়েছে।

চতুর্থ অভিযোগ, জাল কানাডীয় পাসপোর্ট ব্যবহার। এ অভিযোগ প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ ১৪ বছরের কারাদণ্ড হতে পারে।

পঞ্চম অভিযোগটি এসেছে কানাডার ক্রিমিনাল কোড থেকে। জাল জেনেও পাসপোর্ট ব্যবহারের অভিযোগে সর্বোচ্চ ১৪ বছরের কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।

এই মামলার আরেকটি দিক ভবিষ্যৎ অভিবাসীদের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। কানাডার অভিবাসন কর্তৃপক্ষ বারবার মনে করিয়ে দেয়, কোনো প্রতিনিধি আবেদনপত্র তৈরি করলেও সেখানে দেওয়া তথ্যের দায় শেষ পর্যন্ত আবেদনকারীরই। অর্থাৎ কোনো পরামর্শক যদি বলেন, “এই তথ্যটি লিখে দিন, কোনো সমস্যা হবে না” কিংবা “কাগজটি আমরা তৈরি করে দেব”, তাতেও আবেদনকারীর দায় শেষ হয়ে যায় না।

আবুল কাসিমের মামলাটি সামনে আসার সময় কানাডায় অভিবাসন জালিয়াতি নিয়ে তদন্তও বেড়েছে। সিবিএসএর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১ এপ্রিল থেকে ২০২৬ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত শুধু ইমিগ্রেশন অ্যান্ড রিফিউজি প্রোটেকশন অ্যাক্টের অধীনে সন্দেহভাজন অপরাধ নিয়ে ১৬১টি ফৌজদারি তদন্ত শুরু করেছে সংস্থাটি।

কানাডার জননিরাপত্তামন্ত্রী গ্যারি আনন্দসাঙ্গারী এ মামলা সম্পর্কে বলেছেন, কানাডা ন্যায়সংগত ও বিশ্বাসযোগ্য অভিবাসন ব্যবস্থার মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানুষকে স্বাগত জানায়। তবে যারা নিয়ম পাশ কাটাতে বা ব্যবস্থার অপব্যবহার করতে চায়, তাদের গুরুতর পরিণতির মুখোমুখি হতে হবে।

তথ্যসূত্র:
Canada Border Services Agency
Immigration, Refugees and Citizenship Canada

Back to top button
🌐 Read in Your Language