মধ্যপ্রাচ্য

মারিব ও তাইজে হুতিদের অগ্রযাত্রা, সংঘাত ছড়িয়ে পড়ছে ইয়েমেনে

মারিব ও তাইজে হুতিদের অগ্রযাত্রা

সানা, ১৬ সেপ্তে ইয়েমেনে হুতি বিদ্রোহীদের সঙ্গে সরকারি বাহিনীর সংঘাত আবারও তীব্র হয়ে উঠেছে। ইরান-সমর্থিত হুতিদের অগ্রযাত্রা ঠেকাতে সরকারি বাহিনী বিমান হামলা চালাচ্ছে। গত এক সপ্তাহে সরকারি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে থাকা বেশ কয়েকটি এলাকায় নিজেদের অবস্থান আরও বিস্তৃত করেছে হুতিরা।

বর্তমানে ইয়েমেনের মারিব অঞ্চলকে ঘিরেই সংঘাতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লড়াই চলছে। উত্তরাঞ্চলের এই এলাকাটি দেশটির সরকারি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে থাকা সর্বশেষ বড় ঘাঁটি। একই সঙ্গে ইয়েম সংঘাত জোরালো হয়েছে। গত সপ্তাহে তাইজের পশ্চিমাঞ্চলের কয়েকটি এলাকার নিয়ন্ত্রণ নেয় হুতিরা। সৌদি আরব-সমর্থিত সরকারি বাহিনী এখন ওই এলাকাগুলো পুনেনের গুরুত্বপূর্ণ তেল ও গ্যাসসম্পদের বড় একটি অংশও মারিবে রয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, মারিবের নিয়ন্ত্রণ হুতিদের হাতে চলে গেলে ইয়েমেনের যুদ্ধের ভারসাম্যে বড় পরিবর্তন আসতে পারে। এর প্রভাব ইরানকে ঘিরে চলমান যুদ্ধের ওপরও পড়তে পারে।

মারিবের পাশাপাশি পশ্চিম ইয়েমেনের তাইজেও সংঘাত জোরালো হয়েছে। গত সপ্তাহে তাইজের পশ্চিমাঞ্চলের কয়েকটি এলাকার নিয়ন্ত্রণ নেয় হুতিরা। সৌদি আরব-সমর্থিত সরকারি বাহিনী এখন ওই এলাকাগুলো পুনর্দখলে পাল্টা অভিযান চালাচ্ছে।

সোমবার ইয়েমেনের সেনাবাহিনী একটি ভিডিও প্রকাশ করে। তাদের দাবি, এতে হুতিদের অবস্থান ও যানবাহনে বিমান হামলার দৃশ্য দেখা যাচ্ছে।

সংঘাতের কারণে বিভিন্ন এলাকায় হাজারো বেসামরিক মানুষ আটকা পড়েছেন। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) জানিয়েছে, সেপ্টেম্বরের শুরু থেকে ইয়েমেনে ৮৫ হাজারের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে দুই হাজারের বেশি মানুষ জিবুতির উত্তর উপকূলে আশ্রয় নিয়েছেন।

মারিবের গুরুত্ব কোথায়

উত্তর ইয়েমেনে হুতিবিরোধী বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে থাকা সর্বশেষ বড় ঘাঁটি মারিব। এলাকাটিতে হুতিদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হলে সরকারি বাহিনীর উপস্থিতি বড় ধরনের হুমকির মুখে পড়বে। একই সঙ্গে উত্তরাঞ্চলে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের প্রভাবও আরও কমে যেতে পারে।

তবে সামরিক গুরুত্বের পাশাপাশি মারিবের অর্থনৈতিক গুরুত্বও বড়। ইয়েমেনের সবচেয়ে বড় তেল ও গ্যাসক্ষেত্রগুলোর বেশ কয়েকটি এই অঞ্চলে অবস্থিত। ফলে মারিবের নিয়ন্ত্রণ যে পক্ষের হাতে থাকবে, তারা গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামোর পাশাপাশি সম্ভাব্য বড় রাজস্ব উৎসের ওপরও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারবে।

ইয়েমেনের রাজনৈতিক বিশ্লেষক সাদ্দাম আল-হুরাইবি আল-জাজিরাকে বলেন, এক দশকেরও বেশি সময় ধরে মারিবের তেল ও গ্যাসসম্পদের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করে আসছে হুতিরা। সেখানে বড় ধরনের পরাজয়ের মুখে না পড়া পর্যন্ত গোষ্ঠীটি এ লক্ষ্য থেকে সরে আসবে না।

মারিব দখল করতে পারলে ভবিষ্যতে যেকোনো মধ্যস্থতা বা রাজনৈতিক আলোচনায় নিজেদের পক্ষে শর্ত আদায়ের ক্ষেত্রে হুতিরা বাড়তি প্রভাব বিস্তারের সুযোগ পেতে পারে।

গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘নিউ আমেরিকা’র ‘ফিউচার সিকিউরিটি প্রোগ্রাম’-এর ফেলো অ্যাডাম ব্যারনের ভাষায়, মারিব হুতিদের নিয়ন্ত্রণে গেলে ইয়েমেনের রাজনৈতিক ও সামরিক পরিস্থিতিতে তা হবে একটি ‘গুরুত্বপূর্ণ মোড়’।

তবে মারিব দখলের লড়াই সহজ হবে না বলে মনে করেন ব্যারন। তাঁর মতে, সরকারি বাহিনী এই সংঘাতকে নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই হিসেবে বিবেচনা করবে। মারিব হাতছাড়া হলে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারের অনুগত বাহিনীর জন্য তা হবে ‘চরম পরাজয়’।

ভৌগোলিক অবস্থানের কারণেও মারিব গুরুত্বপূর্ণ। উত্তর ইয়েমেন থেকে দক্ষিণের শাবওয়া প্রশাসনিক অঞ্চল এবং আল-মাহরা প্রদেশে যাওয়ার সহজতম সড়কটি মারিবের মধ্য দিয়ে গেছে। শাবওয়ার একদিকে রয়েছে এডেন উপসাগর ও আরব সাগরের উপকূল।

ইয়েমেনি লেখক ও মানবাধিকারকর্মী নাবিল হেতারির মতে, মারিবে জয় হুতিদের জন্য প্রচারের ক্ষেত্রেও বড় সুবিধা এনে দিতে পারে। এর মাধ্যমে ইয়েমেনের জনগণের একটি অংশের কাছে নিজেদের সামরিক সাফল্যের বার্তা তুলে ধরে ভবিষ্যতে আরও বড় বিজয়ের সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে গোষ্ঠীটি।

মারিবের মানবিক গুরুত্বও কম নয়। ২০১৪ সালে হুতিরা রাজধানী সানা দখল করার পর সেখান থেকে বাস্তুচ্যুত বহু মানুষ বছরের পর বছর মারিব শহরে আশ্রয় নিয়েছেন। আইওএমের ২০২৩ সালের তথ্য অনুযায়ী, ইয়েমেনে দেশের ভেতরেই বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা প্রায় ২৮ লাখ। তাঁদের ৫৮ শতাংশের বেশি মারিবে অবস্থান করছেন।

নাবিল হেতারি বলেন, ইয়েমেনের সংঘাতের পরিণতি নির্ধারণে মারিব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এ কারণেই সংঘাতে জড়িত সব পক্ষের নজর এখন এই অঞ্চলের দিকে।

তাইজের কৌশলগত গুরুত্ব

তাইজের গুরুত্বের অন্যতম কারণ এর ভৌগোলিক অবস্থান। অঞ্চলটি হুতিদের নিয়ন্ত্রণাধীন উত্তরাঞ্চল, সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকা দক্ষিণাঞ্চল এবং লোহিত সাগরের উপকূলের মধ্যে সংযোগ তৈরি করেছে। ফলে তাইজের নিয়ন্ত্রণ যে পক্ষের হাতে থাকবে, তারা দেশের অভ্যন্তর থেকে দক্ষিণের বন্দরনগরী এডেনে অস্ত্র ও রসদ পাঠানোর ক্ষেত্রে কৌশলগত সুবিধা পাবে।

রাজনৈতিক দিক থেকেও তাইজ গুরুত্বপূর্ণ। এটি ইয়েমেনের অন্যতম জনবহুল অঞ্চল। ২০১৪ সালে হুতিরা সানা দখল করার পর তাইজ নগরী তাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের অন্যতম প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়

এরপর কয়েক বছর ধরে তাইজে সংঘাত অব্যাহত ছিল। শহরটিতে প্রবেশের ক্ষেত্রেও বিভিন্ন সময়ে বিধিনিষেধ ছিল। ফলে তাইজে হুতিদের বড় ধরনের অগ্রগতি হলে তার সামরিক প্রভাবের পাশাপাশি প্রতীকী গুরুত্বও থাকবে।

তাইজের পশ্চিম উপকূল লোহিত সাগরের তীর ধরে ইয়েমেনের বন্দরনগরী মোখা পর্যন্ত বিস্তৃত। ঐতিহাসিক এই শহরটি গত সপ্তাহে হুতিরা দখল করে নেয়। ওই উপকূল আরও দক্ষিণে বাব আল-মানদেব প্রণালি পর্যন্ত বিস্তৃত। সংকীর্ণ এই জলপথ লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে।

বাব আল-মানদেব বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথগুলোর একটি। প্রায় ২০ কিলোমিটার বা ১২ মাইল প্রশস্ত এই প্রণালি ইয়েমেন ও জিবুতির মাঝখানে অবস্থিত এবং ইউরোপের সঙ্গে এশিয়ার সমুদ্রপথের যোগাযোগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সংঘাত নতুন করে শুরুর আগে বিশ্বের মোট বাণিজ্যের প্রায় ১২ শতাংশ এই নৌপথ দিয়ে পরিচালিত হতো।

সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলের বড় একটি অংশ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে হুতিরা। এর মধ্যে বাব আল-মানদেব প্রণালির ভেতরে অবস্থিত ময়ুন বা পেরিম দ্বীপও রয়েছে। গত শুক্রবার দ্বীপটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর বাব আল-মানদেব দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দেয় হুতিরা।

ইয়েমেনি বিশ্লেষক ও লেখক ফুয়াদ মুসেদের মতে, গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথের কাছাকাছি নিজেদের অবস্থান আরও শক্ত করতে চায় হুতিরা। এর মাধ্যমে সমুদ্রপথে চলাচলকারী জাহাজগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি করার সক্ষমতা অর্জন করতে চায় তারা।

মুসেদের ভাষ্য, হুতিরা হরমুজ প্রণালি ও বাব আল-মানদেবকে ইরানের প্রভাবাধীন রাখার পাশাপাশি আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর ওপর চাপ তৈরির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে চায়। তাঁর মতে, তেহরানও বছরের পর বছর ধরে এমন কৌশল অনুসরণ করে আসছে।

বাব আল-মানদেবের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া এবং ইয়েমেনের বিভিন্ন এলাকায় হুতিদের অগ্রযাত্রা সৌদি আরবের জন্যও বড় উদ্বেগের কারণ। কারণ, হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে তেল রপ্তানির ক্ষেত্রে সৌদি আরব লোহিত সাগরের সমুদ্রপথের ওপর নির্ভরশীল।

এস এম/ ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

 

Back to top button
🌐 Read in Your Language