
প্রেমে পড়লে মানুষ সাধারণত হিসাবের খাতা খুলে বসে না। ফুলের তোড়ার রসিদ যত্ন করে রেখে দেওয়া হয় না, জন্মদিনের উপহার কিংবা একসঙ্গে বেড়ানোর খরচের পাশেও লেখা থাকে না ‘ফেরতযোগ্য’। কিন্তু প্রেম ফুরিয়ে গেলে পুরোনো অনেক ঘটনার অর্থও বদলে যেতে পারে। যে খরচ একদিন ছিল ভালোবাসার প্রকাশ, বিচ্ছেদের পর সেটিই কখনো কারও চোখে হয়ে ওঠে পাওনা।
সিঙ্গাপুরে এমনই এক প্রেমের গল্প শেষ পর্যন্ত গিয়ে পৌঁছেছে হাইকোর্টে। প্রশ্নটি ছিল বেশ সরল: প্রেমিকার জন্য একজন মানুষ যে বিপুল অর্থ ব্যয় করেছিলেন, সেগুলো কি ভালোবাসার উপহার, নাকি ফেরত দেওয়ার শর্তে দেওয়া ঋণ?
প্রেম যত দিন ছিল, সঙ্গে ছিল প্রথম শ্রেণির বিমানভ্রমণ, বিলাসবহুল কেনাকাটা, দামি হোটেল, জীবনবিমার প্রিমিয়াম এমনকি উচ্চশিক্ষার খরচও। প্রেম ভাঙার পর সেই খরচের হিসাব নিয়েই আদালতে হাজির হলেন আগরওয়াল। তাঁর দাবি, এগুলো উপহার নয়, ঋণ। সব মিলিয়ে তিনি ফেরত চাইলেন ৪ লাখ ৬৮ হাজার ৯০ সিঙ্গাপুর ডলার।
এই প্রেমিকের নাম চন্দর আগরওয়াল। তিনি ভারতের শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত পরিবহন ও লজিস্টিকস প্রতিষ্ঠান TCI Express-এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা। আর প্রেমিকা ফেলিশিয়া লি একসময় বিমানের কেবিন ক্রু হিসেবে কাজ করতেন।
দুজনের প্রথম দেখা হয়েছিল ২০১৯ সালে, একটি ফ্লাইটে। সেই পরিচয়ের পর আগরওয়াল ফেসবুকে ফেলিশিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। দেখা-সাক্ষাৎ শুরু হয়। তবে প্রেম শুরু হতে আরও কয়েক বছর লেগেছিল। ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে তাঁরা প্রেমের সম্পর্কে জড়ান। সম্পর্ক টিকে ছিল ২০২৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত।
মজার ব্যাপার হলো, আনুষ্ঠানিকভাবে প্রেম শুরু হওয়ার আগেই ফেলিশিয়ার জন্য আগরওয়ালের হাত বেশ খোলা ছিল। কখনো লুই ভিটনের ব্যাগ, কখনো অ্যাপল ওয়াচ। ইউরোপ সফরে নিয়ে গিয়ে বার্সেলোনা, লিসবন ও লন্ডন ঘুরিয়েছেন। কিনে দিয়েছেন নামী ব্র্যান্ডের নানা পণ্য। সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্সের বিলাসবহুল স্যুট ক্লাসের টিকিটও ছিল সেই তালিকায়। একসময় এত উপহার পেয়ে ফেলিশিয়া নিজেই জানতে চেয়েছিলেন, এসবের প্রতিদান তিনি কীভাবে দেবেন।
আগরওয়ালের জবাব ছিল ছোট্ট, কিন্তু পরে মামলায় এই একটি বাক্যই তাঁর বিপক্ষে বড় হয়ে দাঁড়ায়: “No need. I am not a money lender.” অর্থাৎ, দরকার নেই, আমি তো মহাজন নই। তখন কে জানত, কয়েক বছর পর তাঁদের বিরোধের কেন্দ্রেই থাকবে এই প্রশ্ন: কোনটা উপহার, আর কোনটা ঋণ।
প্রেম শুরু হওয়ার পর খরচের পরিমাণ আরও বাড়ে। আগরওয়ালের দাবির তালিকায় ছিল ফেলিশিয়ার ব্যক্তিগত ক্রেডিট কার্ডের খরচ, প্রায় ২০ হাজার সিঙ্গাপুর ডলারের জীবনবিমার প্রিমিয়াম, বাসার সাজসজ্জা ও বিন্যাস নিয়ে পরামর্শের জন্য প্রায় ১৭ হাজার ডলার এবং পড়াশোনার জন্য প্রায় ৩০ হাজার ডলার। এর বাইরে ছিল যুক্তরাষ্ট্র ও হংকং সফর, প্রথম শ্রেণির বিমান টিকিট ও কেনাকাটা।
যুক্তরাষ্ট্র সফরের হিসাবটি ছিল চোখে পড়ার মতো। আগরওয়ালের দাবি, প্রথম শ্রেণির বিমান টিকিটে প্রায় ৫০ হাজার এবং ফেলিশিয়ার কেনাকাটায় আরও ৬৪ হাজার ৫০৪ সিঙ্গাপুর ডলার খরচ হয়েছিল। কিন্তু পরে তাঁর কাগজপত্রে টিকিট বাবদ প্রায় ৩৪ হাজার ২৬৪ এবং কেনাকাটায় প্রায় ৬০ হাজার ৮৭১ ডলারের হিসাবই পাওয়া যায়।
হংকং সফরেও গল্পটা কম রঙিন ছিল না। ফেলিশিয়ার সঙ্গে যাচ্ছিলেন তাঁর এক বান্ধবী। ভ্রমণের আগে আগরওয়াল নিজেই দুজনের কেনাকাটার বাজেট নিয়ে আলোচনা করেন। এক পর্যায়ে ফেলিশিয়ার জন্য ৩,৫০০ এবং তাঁর বান্ধবীর জন্য ১,৫০০ মার্কিন ডলার প্রস্তাব করেন; পরে বলেন, চাইলে সেটি ৪,০০০ ও ১,০০০ করা যেতে পারে। এসব কথাবার্তাই পরে তাঁর ঋণের দাবিকে দুর্বল করে দেয়। কারণ সেখানে টাকা ফেরত দেওয়ার কথা নয়, বরং কে কতটা খরচ করতে পারবেন, সেটিই ঠিক করা হচ্ছিল।
পড়াশোনার খরচ নিয়েও বিপাকে পড়েন আগরওয়াল। ফেলিশিয়ার Stanford-NUS কর্মসূচির জন্য অর্থ দেওয়ার কথা জানিয়ে তিনি নিজেই এক বার্তায় সেটিকে ‘grant’ বলেছিলেন। পরে আদালতে দাবি করেন, ভারতে ‘grant’ শব্দটি ঋণ অর্থেও ব্যবহৃত হয়। কিন্তু সেই ব্যাখ্যার পক্ষে কোনো প্রমাণ তিনি দিতে পারেননি। উল্টো বার্তাগুলোতে দেখা যায়, পড়াশোনার অর্থ দেওয়ার প্রস্তাবটিও তাঁর দিক থেকেই এসেছিল।
এরই মধ্যে সম্পর্কে সন্দেহ ঢুকে পড়ে। আগরওয়ালের অভিযোগ, ২০২৩ সালের এপ্রিল থেকে ফেলিশিয়া আরেক ব্যক্তির সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়েছিলেন। ডিসেম্বরের দিকে তাঁদের সম্পর্ক ভেঙে যায় এবং ২০২৪ সালের মার্চে আগরওয়াল মামলা করেন। তাঁর দাবি ছিল, ফেলিশিয়া তাঁকে বিশ্বাস করিয়েছিলেন যে তাঁদের সম্পর্ক আন্তরিক ও একান্ত, আর নেওয়া অর্থ তিনি পরে ফেরত দেবেন।
কিন্তু আদালতে এসে প্রেমের পুরোনো কথোপকথনই যেন আগরওয়ালের সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়ায়। এত বড় অঙ্কের কথিত ঋণ, অথচ অসংখ্য WhatsApp বার্তার কোথাও তিনি এমন পরিষ্কার প্রমাণ দেখাতে পারেননি যে ফেলিশিয়া টাকা ধার নিয়েছিলেন বা তা ফেরত দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। সম্পর্কজুড়ে খরচ নিয়ে এত কথা হয়েছে, কিন্তু ঋণের কথা নেই।
আগরওয়াল একটি হাতে লেখা কাগজও আদালতে হাজির করেন। তাঁর দাবি, সেটিই প্রমাণ করে অর্থগুলো ঋণ। কিন্তু ফেলিশিয়া সেখানে নিজের স্বাক্ষর দেওয়ার কথা অস্বীকার করেন। স্বাক্ষরের নমুনা দেখে বিচারকও নিশ্চিত হতে পারেননি সেটি তাঁর। এরপর সামনে আসে আরেকটি নোট, যা আগরওয়ালের অবস্থানকে আরও দুর্বল করে দেয়।
২০২৩ সালের ২৬ মে তারিখের সেই নোটে আগরওয়াল নিজেই লিখেছিলেন, সদিচ্ছা ও উদারতা থেকে ফেলিশিয়াকে দেওয়া গাড়ি বা অন্য কোনো জিনিস তিনি ফেরত চাইবেন না। স্বাভাবিকভাবেই এই লেখার পর আগের কাগজে থাকা ঋণের দাবির জোর অনেকটাই কমে যায়।
শেষ পর্যন্ত বিচারক লি সিউ কিনের সিদ্ধান্ত ছিল পরিষ্কার। আগরওয়াল ফেলিশিয়ার জন্য উদার হাতে খরচ করেছেন, দামি উপহার দিয়েছেন। সম্পর্ক তিক্তভাবে শেষ হওয়ার পর তিনি সেই অর্থ ফেরত চাইছিলেন। কিন্তু প্রেমের সময় স্বেচ্ছায় দেওয়া অর্থ শুধু বিচ্ছেদ হয়েছে বলেই পরে ঋণে পরিণত হয় না।
৯ সেপ্টেম্বর সিঙ্গাপুর হাইকোর্ট আগরওয়ালের সব দাবি খারিজ করে দেয়। একই সঙ্গে মামলার খরচও তাঁকে বহনের নির্দেশ দেওয়া হয়।
এই মামলার সবচেয়ে মজার দিক সম্ভবত টাকার অঙ্ক নয়। প্রেমে থাকা অবস্থায় মানুষ যে ভাষায় কথা বলে, সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পর সেই একই কথার অর্থ কতটা বদলে যেতে পারে, সেটিই এখানে বড় হয়ে উঠেছে। শেষ পর্যন্ত হিসাবটা দাঁড়াল খুব সহজ জায়গায়: ভালোবাসার সময়ে স্বেচ্ছায় দেওয়া উপহার, বিচ্ছেদের পর শুধু মন বদলে গেছে বলে ঋণে বদলে যায় না।
তথ্যসূত্র:
The Business Times
The Straits Times







