জাতীয়

অর্থনীতিতে বড় স্বস্তি! মুডি’সের পূর্বাভাসে ঘুরল বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ঋণমান

ঢাকা, ১৫ সেপ্টেম্বর – রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও বাহ্যিক অর্থনৈতিক চাপ সাফল্যের সাথে সামলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বড় ধরনের স্বস্তির সংকেত পেল বাংলাদেশ। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে গতি ফেরা এবং প্রবাসী আয়ের (রেমিট্যান্স) রেকর্ড প্রবাহের ওপর ভর করে নিউইয়র্কভিত্তিক বৈশ্বিক ঋণমান যাচাইকারী সংস্থা মুডি’স বাংলাদেশের অর্থনীতির পূর্বাভাসের রেটিং ‘নেগেটিভ’ (নেতিবাচক) থেকে বাড়িয়ে ‘স্থিতিশীল’ (Stable) নির্ধারণ করেছে।

মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬) প্রকাশিত সর্বশেষ মূল্যায়নে সংস্থাটি দীর্ঘমেয়াদি ইস্যুয়ার রেটিং ‘বি২’ অপরিবর্তিত রেখে এই নতুন ইতিবাচক পূর্বাভাস ঘোষণা করে।

প্রবৃদ্ধি ও রিজার্ভে মুডি’সের চমকপ্রদ তথ্য

মুডি’সের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির মূল সূচকগুলোতে স্পষ্ট উন্নতির চিত্র ফুটে উঠেছে:

রিজার্ভে বড় লাফ: ২০২৪ সালের শেষে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ২১.৪ বিলিয়ন ডলার থাকলেও ২০২৬ সালের মাঝামাঝিতে তা লাফিয়ে **৩২.৯ বিলিয়ন ডলারে** পৌঁছেছে, যা দিয়ে ৪ মাসের বেশি সময়ের আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব।

জিডিপি প্রবৃদ্ধির ঊর্ধ্বগতি: ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩.৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৪.১ শতাংশ এবং ২০২৬-২৭ অর্থবছরে **৪.৩ শতাংশে** পৌঁছাবে বলে প্রাক্কলন করা হয়েছে।

মূল্যস্ফীতি পরিস্থিতি: মূল্যস্ফীতি ধীরে ধীরে কমে আসার আগে আপাতত ৯ শতাংশের কাছাকাছি অবস্থান করবে।

অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ানোর ৪টি প্রধান কারণ

রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা হ্রাস: নির্বাচন-উত্তর সময়ে শক্তিশালী গণরায়ের ভিত্তিতে সরকার গঠিত হওয়ায় সংস্কার প্রক্রিয়া ব্যাহত হওয়ার রাজনৈতিক ঝুঁকি অনেকটাই কমেছে।

রেকর্ড রেমিট্যান্স ও নমনীয় বিনিময় হার: রেকর্ড পরিমাণ প্রবাসী আয় এবং নমনীয় মুদ্রা বিনিময় ব্যবস্থার কারণে বাহ্যিক অর্থনৈতিক ভিত্তি শক্তিশালী হয়েছে, যা জ্বালানি আমদানির বাড়তি খরচ সামাল দিতে সাহায্য করেছে।

আন্তর্জাতিক সংস্থার সহায়তা: আইএমএফসহ (IMF) বিভিন্ন বৈশ্বিক উন্নয়ন সহযোগীদের সাথে সরকারের ধারাবাহিক সম্পৃক্ততা অর্থায়নের বড় ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে।

ঝুঁকি সুষম হওয়া: ‘বি২’ রেটিং লেভেলে বাংলাদেশের অর্থনীতির আগের ঝুঁকিগুলো এখন অনেকটাই ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থায় চলে এসেছে।

উদ্বেগের প্রধান ক্ষেত্র: খেলাপি ঋণ ও সংকুচিত রাজস্ব

পূর্বাভাসে উন্নতি হলেও দেশের অর্থনীতির দুটি বড় অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা বা ঝুঁকির কথা স্পষ্ট করে দিয়েছে মুডি’স:

  • ব্যাংকিং খাতের ভঙ্গুরতা: সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক সংস্কারের ফলে পুরো ব্যাংকিং খাতে প্রায় ৩২.৮ শতাংশ খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে এসেছে। মূলধন পুনর্গঠনে ব্যাংকগুলোতে জিডিপির প্রায় ১০ শতাংশ অর্থের প্রয়োজন হতে পারে, যা বাজেটে বাড়তি চাপ ফেলবে।
  • রাজস্ব ভিত্তি ও সুদের চাপ: অর্জিত সরকারি রাজস্বের প্রায় ৩০ শতাংশই চলে যাচ্ছে ঋণের সুদ পরিশোধে। ফলে মোট ঋণ জিডিপির প্রায় ৪০ শতাংশের সহনীয় পর্যায়ে থাকলেও সংকুচিত রাজস্ব আদায়ের কারণে বাজেটের নমনীয়তা কমে গেছে।

অর্থনীতিবিদ ও বাজারে প্রতিক্রিয়া

আন্তর্জাতিক ঋণমানের পূর্বাভাসে এই অগ্রগতি দেশের বাণিজ্য ও নতুন বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণে বড় অবদান রাখবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা:

মুডি’স কর্তৃক ঋণমানের পূর্বাভাস ‘স্থিতিশীল’ করা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্থিতিস্থাপকতার বড় প্রমাণ। তবে ব্যাংকিং খাতের খেলাপি ঋণ কমানো এবং রাজস্ব আদায় বাড়ানোর মতো চ্যালেঞ্জগুলোতে এখন কঠোর নজর দেওয়া জরুরি।” — অর্থনীতি বিশ্লেষক

এনএন/ ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

Back to top button
🌐 Read in Your Language