
কানাডা দ্রুত নিজের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত মানচিত্র বদলে নিচ্ছে। কয়েক দশক ধরে যে যুক্তরাষ্ট্র ছিল কানাডার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য বাণিজ্য অংশীদার, ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কনীতি ও একের পর এক হুমকির পর সেই নির্ভরতার বিকল্প খুঁজতে এখন ইউরোপের দিকে আরও দৃঢ়ভাবে হাত বাড়াচ্ছে অটোয়া।
ব্লুমবার্গের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কানাডা ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাণিজ্য, নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষাকে একসঙ্গে নিয়ে বিস্তৃত একটি নতুন জোট গড়ে তোলার প্রস্তুতি নিচ্ছে। লক্ষ্য শুধু দুই পক্ষের ব্যবসা বাড়ানো নয়। বদলে যাওয়া বিশ্বব্যবস্থায় নিজেদের জন্য আলাদা ও শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করাও এর অন্যতম উদ্দেশ্য।
এই পরিকল্পনার বিস্তারিত আগামী ১৬ সেপ্টেম্বর স্ট্রাসবুর্গে ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লেয়েন তাঁর ‘স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন’ ভাষণে তুলে ধরতে পারেন। এর পরদিন ইউরোপীয় পার্লামেন্টে বক্তব্য দেওয়ার কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির। একটি অ-ইউরোপীয় দেশের প্রধানমন্ত্রীর এভাবে ইউরোপীয় আইনপ্রণেতাদের সামনে উপস্থিত হওয়াটিও দুই পক্ষের দ্রুত ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠার বড় রাজনৈতিক বার্তা।
কানাডা কতটা কাছে যেতে পারে, এখন সেই সীমাটিই খুঁজছেন দুই পক্ষের কর্মকর্তারা। পূর্ণ সদস্য না হয়েও ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাণিজ্য, প্রতিরক্ষা, প্রযুক্তি, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার কাঠামোর সঙ্গে কানাডাকে আরও গভীরভাবে কীভাবে যুক্ত করা যায়, তা নিয়ে কাজ চলছে।
এরই মধ্যে বড় একটি দরজা খুলে গেছে। কানাডা প্রথম অ-ইউরোপীয় দেশ হিসেবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ১৫০ বিলিয়ন ইউরোর SAFE প্রতিরক্ষা অর্থায়ন ও যৌথ ক্রয় কর্মসূচিতে যুক্ত হয়েছে। ফলে কানাডিয়ান প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য ইউরোপের যৌথ প্রতিরক্ষা প্রকল্প ও ক্রয়াদেশে অংশ নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। কানাডা ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা অংশীদারত্বে সাইবার নিরাপত্তা, সামরিক চলাচল, প্রতিরক্ষা শিল্প, নতুন প্রযুক্তি এবং ইউক্রেনকে সহায়তার মতো বিষয়ও রয়েছে।
অর্থাৎ সম্পর্কটি শুধু নতুন বাজার খোঁজার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। কানাডা ধীরে ধীরে এমন একটি বিকল্প অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা বলয় তৈরি করছে, যেখানে কোনো একটি দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভর করতে হবে না। আগামী ২৯ ও ৩০ অক্টোবর কানাডায় অনুষ্ঠেয় কানাডা-ইইউ শীর্ষ সম্মেলনে এই সম্পর্কের পরবর্তী ধাপ আরও আনুষ্ঠানিক রূপ পাওয়ার কথা রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি গত কয়েক মাস ধরে ‘মধ্যম শক্তিধর’ দেশগুলোর মধ্যে নতুন সহযোগিতার যে কথা বলে আসছেন, এই উদ্যোগ তারই বড় উদাহরণ। তাঁর যুক্তি হচ্ছে, পুরোনো মার্কিন নেতৃত্বাধীন বিশ্বব্যবস্থা বদলে যাচ্ছে। এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে কানাডাকে নিজের বাজার, সরবরাহ ব্যবস্থা, প্রতিরক্ষা সক্ষমতা ও কূটনৈতিক সম্পর্ক বহুমুখী করতে হবে। ইউরোপের সঙ্গে দ্রুত বাড়তে থাকা সম্পর্ক দেখাচ্ছে, অটোয়া এখন সেই কথাকে নীতিতে পরিণত করছে।
সর্বশেষ ট্রাম্প হুমকি দিয়েছেন, কানাডিয়ান বিমান নির্মাতা Bombardier যুক্তরাষ্ট্রে তাদের বিমান তৈরি না করলে কোম্পানিটির বিমান মার্কিন বাজারে বিক্রি করতে দেওয়া হবে না। কিন্তু ঘোষণাটি আসার পর অস্বস্তি তৈরি হয়েছে তাঁর নিজের দেশেই।
সবচেয়ে জোরালো প্রতিক্রিয়া এসেছে রিপাবলিকান-নিয়ন্ত্রিত কানসাস থেকে। Bombardier-এর মার্কিন সদর দপ্তর উইচিটায়। সেখানে কোম্পানিটির ১,৫০০-এর বেশি কর্মী রয়েছেন। রিপাবলিকান সিনেটর জেরি মরান জানিয়েছেন, Bombardier শুধু উইচিটার কর্মসংস্থানের জন্য নয়, যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারোস্পেস শিল্পের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। আরেক রিপাবলিকান সিনেটর রজার মার্শাল বলেছেন, ওই চাকরিগুলো রক্ষায় তিনি লড়বেন। প্রতিষ্ঠানটির যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে প্রায় ৩,৫০০ কর্মী রয়েছে। এছাড়া ৪৭টি অঙ্গরাজ্যে প্রায় ২,৮০০ মার্কিন সরবরাহকারীর সঙ্গে Bombardier ব্যবসা করে।
ফলে Bombardier-কে শাস্তি দিতে গিয়ে ট্রাম্প আসলে যুক্তরাষ্ট্রেরই শ্রমিক, সরবরাহকারী ও অ্যারোস্পেস শিল্পকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছেন। এ কারণেই ট্রাম্পের ঘোষণার বিরোধিতায় তাঁর নিজের দলের রাজনীতিকদেরও সামনে আসতে হচ্ছে।
বাস্তবতার সঙ্গে এখানেই ট্রাম্পের ঘোষণার বড় সংঘাত। আমেরিকায় উৎপাদন বাড়ানোর কথা বলে এমন একটি কোম্পানিকে বাজার থেকে বের করে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হচ্ছে, যে কোম্পানি ইতোমধ্যেই হাজার হাজার আমেরিকানকে চাকরি দিয়েছে এবং হাজার হাজার মার্কিন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ব্যবসা করছে। ফলে সিদ্ধান্তটি কানাডার ওপর চাপ সৃষ্টি করার চেয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নিজের শিল্প ও কর্মসংস্থানকেই অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলেছে। সে বিবেচনায় ট্রাম্পের এই হুমকি শুধু অপরিণামদর্শী নয়, যুক্তরাষ্ট্রের নিজের শিল্প ও কর্মসংস্থানের জন্যও আত্মঘাতী।
এ হুমকি শেষ পর্যন্ত কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়েও প্রশ্ন আছে। গত জানুয়ারিতেও ট্রাম্প কানাডায় তৈরি বিমান যুক্তরাষ্ট্রে চলতে না দেওয়া এবং সেগুলোর ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত সেই হুমকির কোনোটিই বাস্তবায়িত হয়নি। আগের নজির ও বর্তমান পরিস্থিতি বলছে, এই হুমকিও শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়নের মুখ দেখবে না।
ইউরোপের সঙ্গে কানাডার নতুন জোট তাই কেবল আরেকটি আন্তর্জাতিক চুক্তির গল্প নয়। এটি বদলে যাওয়া কানাডার গল্পও। যে কানাডা একসময় প্রায় স্বাভাবিক নিয়মেই দক্ষিণের প্রতিবেশীর দিকে তাকিয়ে থাকত, সেই কানাডা এখন আটলান্টিকের ওপারে নতুন বাজার, নতুন প্রতিরক্ষা অংশীদার এবং নতুন কৌশলগত সম্পর্ক গড়ে তুলছে। যুক্তরাষ্ট্রের চাপ কানাডাকে দুর্বল করেনি; বরং বিকল্প অর্থনৈতিক ও কৌশলগত পথ খোঁজার গতি আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
তথ্যসূত্র:
Bloomberg
Global Affairs Canada
FAQ
১. কানাডা কেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়াচ্ছে?
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য অনিশ্চয়তা বাড়ার পাশাপাশি কানাডা নতুন বাজার, বিনিয়োগ, সরবরাহ ব্যবস্থা এবং প্রতিরক্ষা অংশীদারত্ব তৈরি করতে চাইছে। ইউরোপকে এই বহুমুখীকরণ কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
২. কানাডা কি EU-এর SAFE প্রতিরক্ষা কর্মসূচিতে যোগ দিয়েছে?
হ্যাঁ। ২০২৬ সালের জুনে EU Council কানাডার সঙ্গে SAFE-সংক্রান্ত চুক্তি আনুষ্ঠানিকভাবে সম্পন্ন করে। কানাডা এই কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া প্রথম অ-ইউরোপীয় দেশ।
৩. SAFE কর্মসূচির পরিমাণ কত?
SAFE-এর মাধ্যমে ইউরোপীয় প্রতিরক্ষা বিনিয়োগের জন্য সর্বোচ্চ ১৫০ বিলিয়ন ইউরোর ঋণ সহায়তার ব্যবস্থা রয়েছে।
৪. Bombardier নিয়ে ট্রাম্প কী হুমকি দিয়েছেন?
ট্রাম্প বলেছেন, Bombardier যুক্তরাষ্ট্রে বিমান বিক্রি করতে চাইলে তাদের যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে উৎপাদন করতে হবে। হুমকিটি কীভাবে কার্যকর করা হবে, সে বিষয়ে এখনও নির্দিষ্ট আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া প্রকাশ্যে আসেনি।
৫. Bombardier-এর যুক্তরাষ্ট্রে কত কর্মী রয়েছে?
Bombardier-এর যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ৩,৫০০ কর্মী রয়েছে। কানসাসের উইচিটায় কোম্পানিটির ১,২০০-র বেশি কর্মী রয়েছে বলে সাম্প্রতিক মার্কিন রিপোর্টে বলা হয়েছে।
৬. মার্ক কার্নি কবে ইউরোপীয় পার্লামেন্টে বক্তব্য দেবেন?
বর্তমান কর্মসূচি অনুযায়ী, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ইউরোপীয় পার্লামেন্টে তাঁর বক্তব্য দেওয়ার কথা। এর আগের দিন ১৬ সেপ্টেম্বর স্ট্রাসবুর্গে উরসুলা ফন ডার লেয়েনের ‘স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন’ ভাষণে তাঁর উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে।







